এইমাত্র পাওয়া

থানায় দুই ছাত্রলীগ নেতা নির্যাতনে ১২ পুলিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

শাহবাগ থানার ভেতর ছাত্রলীগের দুই নেতাকে মারধরের ঘটনায় অন্তত ১২ পুলিশ সদস্য জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হওয়া আনোয়ার হোসেন নাঈমের ভাষ্য, এডিসি হারুনের নেতৃত্বে ওই ১২ পুলিশ সদস্য মুখে কাপড় বেঁধে এবং বুকের নেমপ্লেট খুলে মারধর করেন। এ ঘটনায় গতকাল এডিসি হারুন অর রশিদকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ। ছাত্রলীগ জানিয়েছে, এ ঘটনায় তারা মামলা করতে চায় না।

এদিকে দুই ছাত্রলীগ নেতাকে নির্যাতনের ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। এ ব্যাপারে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এডিসি হারুনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও তার নির্যাতনের সহযোগী অন্যান্য পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকা মেট্রোপলিটান পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক বলেন, ‘ঘটনার তদন্তে আমরা একটি কমিটি করেছি। তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন দিলে তার ভিত্তিতে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ঘটনার রাতে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের বিজ্ঞানবিষয়ক সম্পাদক ও ঢাবির শহীদুল্লাহ হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শরীফ আহমেদ মুনিম শাহবাগ থানায় নির্যাতনের শিকার হন। মারধরে অংশ নেওয়া পুলিশ সদস্যদের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘ঘটনা ঘটেছে শাহবাগ থানার পরিদর্শক তদন্তের কক্ষে। তিনি কক্ষেই ছিলেন। এডিসি হারুনের সঙ্গে মারধরে যোগ দেন পরিদর্শক মোস্তফা, এসআই আব্বাসসহ সাত থেকে আটজন এসআই ও কনস্টেবল। পরিচয় আড়াল করতে তারা সবাই নেমপ্লেট খুলে রেখেছিলৃ। মারধর শুরুর পাঁচ থেকে সাত মিনিটের মাথায় নাঈম সেখানে গেলে তাকেও মেঝেতে ফেলে পেটাতে থাকে। এডিসি হারুনের পর বেশি মারমুখী ছিলেন পরিদর্শক মোস্তফা।’

পুলিশের মারধরে গুরুতর আহত ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন নাঈম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। ঘটনার বর্ণনায় তিনি বলেন, ‘থানায় প্রবেশের সময় আমাদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়।

ডিএমপি রমনা বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) হারুন অর রশিদসহ শাহবাগ থানার ওসির (তদন্ত) কক্ষে অন্তত ১২ জন পুলিশ সদস্য মারধর করেন। তাদের সবার মুখে কাপড় বাঁধা ও ইউনিফর্ম থেকে নেমপ্লেট খোলা ছিল। হারুনের পর শাহবাগ থানার পরিদর্শক মোস্তফা অনেক মারধর করেন। মারতে মারতে অজ্ঞান করে ফেলেন। নিচে পড়ে যাওয়ার পর অস্ত্রের বাট দিয়ে ঠোঁট ও মুখ থেঁতলে দেওয়া হয়। শাহবাগ থানার ওসি (তদন্ত) মুখে কাপড় বেঁধে আমাকে মারতে থাকেন। এক পর্যায়ে হাত দিয়ে তার মুখের কাপড় খুলে ফেললে চিনতে পারি। মুখে কাপড় বাঁধা ও নেমপ্লেট খোলা থাকায় বাকিদের চিনতে পারিনি।’

নাঈমের মা নাজমুন নাহার বলেন, ‘ছেলেকে মেরে ফেলার জন্যই এভাবে মারধর করেছে পুলিশ। আমার ছেলে যন্ত্রণায় কথা বলতে পারছে না, কিছু খেতে পারছে না। আমি মা হিসেবে এ কষ্ট সহ্য করতে পারছি না।’

নাঈমের বন্ধু রেদোয়ান হাসান রনি গতকাল বলেন, তার উপরের ঠোঁটে সাতটি ও নিচের ঠোঁটে একটি সেলাই দেওয়া হয়েছে। পিস্তলের বাঁটের আঘাতে একটি দাঁত পড়ে গেছে। অনেকগুলো দাত মারাত্মক জখম হয়েছে। নাক বাঁকা হয়ে গেছে।

নাঈমের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে বিএসএমএমইউর চিকিৎসক ডা. নুজহাত  বলেন, ‘তার কার্ডিয়াক সমস্যা হতে পারে। সেরকম লক্ষণও আছে। আমরা ইসিজি করতে দিয়েছি। ইলেকট্রলাইট টেস্ট করতে পাঠিয়েছি। ঘাড়ের একটি এক্সরে করতে দেওয়া হয়েছে। ওভারঅল অবস্থা ভালো বলা যাবে না। ভেতরে অনেক আঘাত আছে। রিপোর্টগুলো পেলে আমরা নিশ্চিত হতে পারব।’

এ ঘটনায় মামলার বিষয়ে নাঈমের স্বজনরা বলছেন, আগে সুস্থ হোক। তারপর মামলার ব্যাপারটা দেখবেন। তবে সরকার এরই মধ্যে এডিসি হারুনের বিষয়ে যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তাতে তারা সন্তষ্ট।

জানা গেছে, গত শনিবার রাতে এক নারী পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে বারডেম হাসপাতালে আড্ডা দিচ্ছিলেন এডিসি হারুন। ওই সময় নারী কর্মকর্তার স্বামী কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের দুই নেতাকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে গেলে হারুনের সঙ্গে বাকবিত-া হয়। নারী কর্মকর্তার স্বামীও একজন সরকারি কর্মকর্তা। পরে এডিসি হারুন দুই কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতাকে শাহবাগ থানায় নিয়ে নির্যাতন চালান।

সাময়িক বরখাস্ত হারুন:

ছাত্রলীগ নেতাদের মারধরের ঘটনায় এডিসি হারুনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। গতকাল বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘যেহেতু ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি) হারুন-অর-রশীদকে জনস্বার্থে সরকারি কাজ থেকে হতে বিরত রাখা আবশ্যক ও সমীচীন, সেহেতু হারুন-অর-রশীদকে সরকারি চাকরি আইন অনুযায়ী সোমবার থেকে সরকারি চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো। সাময়িক বরখাস্তকালীন তিনি পুলিশ অধিদপ্তরে সংযুক্ত থাকবেন এবং বিধি অনুযায়ী খোরপোষ ভাতা প্রাপ্য হবেন।’

ছাত্রলীগ নেতাদের মারধরের ঘটনায় গত রবিবার হারুনকে প্রথমে পিওএম এবং পরে এপিবিএনে বদলি করা হয়।

মামলা করবে না ছাত্রলীগ:

গতকাল দুপুরে ডিএমপি কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুকের সঙ্গে বৈঠক করেন ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন। পরে ডিএমপি কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, দুই নেতাকে মারধরের ঘটনায় ছাত্রলীগ মামলা করবে না। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, তারা আপাতত ডিএমপির বিভাগীয় তদন্তে আস্থা রাখছেন।

সাদ্দাম বলেন, ‘যে অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে, তাতে বাংলাদেশের সব শ্রেণির নেতাকর্মীদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে। আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে দেখা করেছি। ডিএমপি কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করেছি। ডিএমপি কমিশনার আমাদের আশ্বস্ত করেছেন, বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে সর্বোচ্চ আইনানুগ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।’

পরিবার মামলা করতে চাচ্ছে কিন্তু ছাত্রলীগ মামলা করতে দিচ্ছে না- সাংবাদিকের এমন এক প্রশ্নের জবাবে ছাত্রলীগ সভাপতি বলেন, আমরা বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছি। দ্রুত সময়ের মধ্যে যেন তদন্ত শেষ করা হয়, আইনানুগভাবে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হয়, সে দাবি জানিয়েছি। ডিএমপি কমিশনার আমাদের আশ্বস্ত করেছেন।

হারুনের গ্রেপ্তার দাবিতে মানববন্ধন:

এডিসি হারুনকে স্থায়ী বহিষ্কার ও গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে গাজীপুর জেলা ছাত্রকল্যাণ সমিতি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। গতকাল সোমবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এক মানববন্ধনে তারা এ দাবি জানান। মানববন্ধন কর্মসূচিতে ছাত্রলীগের বর্তমান ও সাবেক নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, এডিসি হারুন ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, ছাত্রঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মী কাউকেই ছাড় দেয় না। সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনেও তিনি হামলা করেন। এডিসি হারুন পরকীয়ায় আসক্ত বিকারগ্রস্ত একজন পুলিশ কর্মকর্তা। তার পরকীয়া ফাঁস হয়ে যাওয়ায় নিজের ব্যক্তিগত ক্রোধকে কাজে লাগিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন শিক্ষার্থীর ওপর হামলা চালিয়েছেন।

হাসপাতালে এনামুল হক শামীম:

আনোয়ার হোসেন নাঈমকে দেখতে গতকাল রাতে বিএসএমএমইউতে যান ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও পানিসম্পদ উপমন্ত্রী কেএম এনামুল হক শামীম। তিনি নাঈম ও তার মায়ের সঙ্গে কথা বলেন এবং চিকিৎসার খোঁজখবর নেন।

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১২/০৯/২০২৩     

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.