এইমাত্র পাওয়া

শিক্ষক আন্দোলনকে আমলে নিতে হবে

ড. জোবাইদা নাসরীন।।

বাংলাদেশে সব সময়ই জারি থাকা আন্দোলনগুলোর একটি হলো বেসরকারি শিক্ষকদের আন্দোলন। এর আগেও আমরা শহীদ মিনার, শাহবাগ চত্বর এবং প্রেসকাবের সামনে শিক্ষকদের লাগাতার আন্দোলন দেখেছি। সেসব আন্দোলন ঠেকাতেও পুলিশি হামলা হয়েছে। আন্দোলনে আক্রমণ চালানো হয়েছে। তবে এবারের আন্দোলনের দাবি ছিল একটাই আর তা হলো মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণ। এই দাবিটিও পূরণ করতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছে বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি (বিটিএ)। দাবি পূরণ করার জন্য সারাদেশের মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছিলেন তারা।

আন্দোলনকারীরা যে যুক্তিকে সামনে এনেছিলেন তা হলো, বর্তমানে বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে বিরাজমান সরকারি ও বেসরকারি বৈষম্য রয়েছে। এই বৈষম্য দূর করা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি তারা জানিয়েছেন, এ দেশে ধনী-গরিবের শিক্ষার সুযোগ সমান নয়। তাই সবার জন্য শিক্ষার সমসুযোগ নিশ্চিত করতে মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণ করার জন্য তাদের এই আন্দোলন। তবে এই আন্দোলনের পথ অনেকটাই বন্ধুর। এই আন্দোলনে অনেক চড়াই-উতরাই পার করছেন শিক্ষকরা। আন্দোলন দমানোর জন্য ইতোমধ্যে দুদফা পুলিশি আক্রমণের শিকার হয়েছেন তারা। বিশেষ করে আন্দোলনের সাত নম্বর দিনে পুলিশের লাঠিচার্জে অনেক শিক্ষক আহত হন। একজন মারা যান।

শিক্ষকরা যতই আন্দোলন করুন না কেন, এই আন্দোলন নিয়ে সরকার খুব বেশি বিচলিত নয়। কারণ এই আন্দোলন এবং সমস্যা সমাধান অর্থাৎ মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণ নিয়ে কোনো ধরনের অবস্থান নেওয়া সরকারের পক্ষে যে সম্ভব নয় সে বিষয়ে পষ্টাপষ্টিভাবে জানিয়ে দিয়েছিলেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি। শুধু তা-ই নয়, জাতীয়করণের দাবির কোনো যৌক্তিকতা আছে কিনা সেটি খতিয়ে দেখার কথা বলেছিলেন তিনি। এর পাশাপাশি শিক্ষা, শিক্ষকদের সার্বিক মানোন্নয়নকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে দুটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছিল।

সরকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, এই দুই কমিটির প্রতিবেদন উপস্থাপন করার পর এ বিষয়ে পরবর্তী সময়ে করণীয় নির্ধারণ করা হবে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের আশ্বাসে অনশন স্থগিত করেছেন শিক্ষকরা। গত বুধবার থেকে তারা ক্লাসে ফিরে গেছেন। গত মঙ্গলবার শিক্ষা উপমন্ত্রীর সঙ্গে সভায় সরকারি-বেসরকারি স্কুলের বৈষম্য দূর করার বিষয়ে সবাই একমত পোষণ করেছেন। জাতীয়করণের দাবির বিষয়ে সরকার যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে দুটি কমিটি করা হয়েছে সেখানে শিক্ষক প্রতিনিধিদের রাখার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

এ কথা আমাদের স্বীকার করতে হবে যে, এ দেশের বেশির ভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই এমপিওভুক্ত। তার মানে হলো এই যে, এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হয় বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী দ্বারা। কিন্তু তাদের বেতন-ভাতার সঙ্গে সরকারি শিক্ষকদের পার্থক্য ব্যাপক। বিশেষ করে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা বাড়ি ভাড়া বাবদ পান মাত্র ১০০০ টাকা। এই টাকায় যে কোথাও কোনো বাড়ি ভাড়া পাওয়া যায় না সেটি সবাই বোঝেন। এখানে শেষ নয়। আরও বৈষম্য আছে। তারা উৎসব-ভাতা পান মূল বেতনের পঁচিশ শতাংশ এবং চিকিৎসা-ভাতা পান মাত্র পাঁচশ টাকা।

কিন্তু বিষয় হলো সরকারি এবং বেসরকারি শিক্ষকদের কার্যপরিধি এক এবং অনেক ক্ষেত্রেই বেশি। তারা একই কারিকুলাম অনুসরণ করেন, একই সিলেবাস পড়ান। এমনকি তাদের একাডেমিক সময়সূচিও এক। প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও উত্তরপত্র মূল্যায়নের কাজও একই ধরনের। কিন্তু আর্থিক পাওনার ক্ষেত্রে বেসরকারি আর সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের রয়েছে যোজন যোজন পার্থক্য। আসলে এটিকে পার্থক্য বলা যায় না। এটি মূলত বৈষম্য।

বৈষম্যের চিত্র আরও আছে। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের বেতন স্কেল সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের বেতন স্কেলের সমান নয়, বরং এক ধাপ নিচে। অসন্তোষের বীজ আরও রয়েছে। বেসরকারি বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে সহকারী প্রধান শিক্ষকদের উচ্চতর স্কেল না দেওয়ার কারণে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উচ্চতর স্কেলপ্রাপ্ত সিনিয়র শিক্ষকদের বেতন স্কেল ও সহকারী প্রধান শিক্ষকদের বেতন স্কেল সমান হয়ে গেছে। এসব কারণে এই বিষয়গুলো নিয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষকদের মধ্যে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ রয়েছে।

চাকরি শেষ হয়ে যাওয়ার পরও ভোগান্তি রয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ভোগান্তি নেই এ কথা বলা যাবে না। তবে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের বেলায় তা আরেকটু বেশি। বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসরে যাওয়ার পর হেনস্তা আরও বেশি। অবসরগ্রহণের পর অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয় এবং এমনও হয়েছে যে, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি টাকাই তুলতে পারেননি। ফলে অনেক শিক্ষক-কর্মচারী অবসরের ভাতা পাওয়ার আগেই টাকার অভাবে বিনা চিকিৎসায় মারা যান।

তার পরও কথা আছে। কয়েক বছর ধরে কোনো প্রকার আর্থিক সুবিধা না দিয়েই অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্ট খাতে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন থেকে অতিরিক্ত চার শতাংশ কাটা হচ্ছে, যা হয়তো কোনোভাবেই অবসর-পরবর্তী জীবনের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। এই অতিরিক্ত চার শতাংশ কাটার প্রতিবাদে তারা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিলসহ অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্ট অফিস ঘেরাও করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এসব অসন্তোষ ক্ষোভে পরিণত হয়েই এই আন্দোলন। কিন্তু অদ্যাবধি কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি।

শিক্ষাক্ষেত্রে সব প্রতিষ্ঠানে একই রকম সুযোগ-সুবিধা নেই। সরকারি-বেসরকারি স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা, কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষক-কর্মচারীদের সমযোগ্যতা ও সমঅভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও সরকারি স্কুল ও বেসরকারি স্কুলের প্রধান শিক্ষকদের বেতন স্কেলে পার্থক্য অনেক দিনের। এসব বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন, আলাপচারিতা হলেও বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ভূমিকা নেওয়া হয়নি। অবশেষে ঘোষণা এলো।

এই আন্দোলন আসলে কী কী ক্ষতি করছে? শিক্ষকরা সব স্কুল বন্ধ করে আন্দোলনে ছিলেন। এসব আন্দোলনে আসলে মূলত ক্ষতিগ্রস্ত হন শিক্ষার্থীরা। তারা স্কুলে যেতে পারছে না, কারণ শিক্ষকরা আন্দোলনে। এত সব সমস্যা কিন্তু হঠাৎ করেই হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে চলছিল।

এই শিক্ষার্থীরা কোথায় যাবে? তাদের পড়াশোনার কী হবে এবং দীর্ঘদিন স্কুলে না গেলে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের কী অবস্থা হবে সে বিষয়গুলো আমলে নিয়েই শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তে এসেছে সরকার। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বিষয়টি শুধু যে পড়াশোনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ তা নয়, এটি তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলছে।

আমাদের একটি বিষয় খুব জোরালোভাবে বিশ্বাস করতে হবে যে, শিক্ষক আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলনেরই অংশ। শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে হলেও এই বিষয়টির দ্রুত সমাধানের কথা সরকারকে ভাবতে হবে এবং সম্ভব হলে জাতীয় নির্বাচনের আগেই এই সমস্যার সমাধান হওয়া প্রয়োজন। কারণ আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীরা যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন।

সেটিই রক্ষা করা সরকারের প্রধান দায়িত্ব। তবে শিক্ষকদেরও দায় হয়তো থাকে। শিক্ষকদেরও পরবর্তী সময় আন্দোলনে গেলে সেটাও একটু বিবেচনায় রাখবেন। কারণ আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, শিক্ষার্থীরাই একজন শিক্ষক তৈরি করে। কারণ শিক্ষকতা নিছক কোনো পেশা নয়। এটি একটি দায়িত্ব এবং এই দায়িত্ব শিক্ষকদের পালন করতেই হবে।

এই ধরনের অবস্থা বেশিদিন জিইয়ে না রেখে সরকার একটি সমাধানের পথ করে দিয়েছে সেটি ইতিবাচক। কারণ আমাদের মূল জায়গা শিক্ষার্থীদের জীবন এবং এর মধ্য দিয়েই আসলে শিক্ষা খাতের অগ্রগতি সম্ভব।

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.