নিজস্ব প্রতিবেদক।।
কড়াকড়ি আরোপ করাসহ নানা কারণে সঞ্চয়পত্রের বিক্রিতে ধস নেমেছে। গত অর্থবছরের শেষ মাসেও যে পরিমাণ সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে, তার চেয়ে প্রায় ২৬৭ কোটি টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র ভাঙা পড়েছে। আর পুরো অর্থবছরে (২০২২-২৩) যে টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে, ভাঙা পড়েছে তার চেয়ে তিন হাজার ২৯৫ কোটি টাকা বেশি। অর্থাৎ পুরো অর্থবছরে মোট বিক্রি তিন হাজার ২৯৫ কোটি টাকা ঋণাত্মক ধারায় রয়েছে। বলা যায়, পুরো অর্থবছরে এই খাত থেকে সরকার এক টাকারও ঋণ পায়নি।
এদিকে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ না পাওয়ার কারণে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন ব্যয় মেটাতে গত অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে রেকর্ড পরিমাণ ঋণ নিতে হয়েছে সরকারকে। এ অর্থের সিংহভাগই কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকা ছাপিয়ে সরকারকে জোগান দেওয়ায় মূল্যস্ফীতি আরও বেড়েছে।
নিম্ন মধ্যবিত্ত, সীমিত আয়ের মানুষ, নারী, প্রতিবন্ধী ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সঞ্চয়পত্রের বিভিন্ন প্রকল্প চালু রয়েছে। সামাজিক সুরক্ষার কথা বিবেচনায় নিয়ে সঞ্চয়পত্রে তুলনামূলক বেশি মুনাফা (সুদ) দেয় সরকার। বিশ্লেষকরা বলছেন, পণ্য ও সেবার দামে লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে জীবনযাপনের খরচ বেড়ে গেছে মানুষের, যার প্রভাব পড়ছে সঞ্চয়ে।
বিশেষ করে নির্দিষ্ট আয়ে যাদের সংসার চলে, তাদের অনেকেই এখন সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছেন। ফলে নির্দিষ্ট মেয়াদপূর্তির আগে অনেকে সঞ্চয়পত্র ভেঙে সংসার চালাচ্ছেন। কেউ মেয়াদপূর্তির পর পুনরায় বিনিয়োগ না করে টাকা তুলে নিচ্ছেন। আবার যাদের কাছে টাকা আছে, তারাও কড়াকড়ির কারণে সঞ্চয়পত্রে খাঁটাতে আগ্রহী হচ্ছেন না। এতে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে ধস নেমেছে।
গত অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৫ হাজার কোটি টাকা। তবে বিক্রি কমতে থাকায় সংশোধিত বাজেটে এই লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ধরা হয় ৩২ হাজার কোটি টাকা।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের প্রতিবেদন বলছে, সর্বশেষ জুন মাসে সঞ্চয়পত্রের মোট বিক্রির (বিনিয়োগ) পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা। একই সময়ে ভাঙানোর পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৪০৬ কোটি টাকা। ফলে ওই মাসে নিট বিক্রির পরিমাণ নেমে গেছে ঋণাত্মক ২৬৭ কোটি টাকা। অন্যদিকে গত অর্থবছরের পুরো সময়ে সঞ্চয়পত্রের মোট বিক্রি হয় ৮০ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকা। একই সময়ে সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর পরিমাণ ছিল ৮৪ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা। ফলে পুরো
অর্থবছরে নিট বিক্রি দাঁড়ায় ঋণাত্মক ৩ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা। প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত সেপ্টেম্বর থেকে সঞ্চয়পত্র বিক্রির চেয়ে বেশি ভাঙানোর প্রবণতা বাড়তে থাকে।
২০২১-২২ অর্থবছরেও সঞ্চয়পত্র থেকে তুলনামূলক কম ঋণ পায় সরকার। পুরো অর্থবছরে ৩২ হাজার কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ঋণ আসে ১৯ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। অথচ করোনার পরও ২০২০-২১ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ হয় প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা। এটি তার আগের অর্থবছরে ছিল ১৪ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা।
গত অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে রেকর্ড পরিমাণ ঋণ নিতে হয়েছে সরকারকে। গত অর্থবছরের পুরো সময়ে সরকারের ব্যাংকঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা। অথচ গত অর্থবছরের মূল বাজেটে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ব্যাংকঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা।
তবে সংশোধিত বাজেটে এই লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ১ লাখ ১৫ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এদিকে চলতি অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা ঋণ করার পরিকল্পনা করেছে সরকারের। এর মধ্যে ব্যাংকব্যবস্থা থেকেই নেওয়া হবে ১ লাখ ৩২ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা। আর সঞ্চয়পত্র থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
