ঢাকাঃ নওয়াব হাবিবুল্লাহ মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রায় ১২ বছর ধরে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছেন মো. শাহিনুর মিয়া। কিন্তু তাঁর এই পদে চাকরির বৈধতা নেই। তাঁর বিরুদ্ধে কিছু অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করেও সত্যতা পাওয়া গেছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২২ জুন শাহিনুর মিয়াকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে মাউশি। মাউশির তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি স্কুল থেকে কলেজ পর্যায়ে উন্নীত হওয়ার সময় শাহিনুর মিয়া প্রধান শিক্ষক ছিলেন। নিয়মানুযায়ী প্রধান শিক্ষকের পদ থেকে পদত্যাগ করে অধ্যক্ষ হওয়ার জন্য নিয়োগ পরীক্ষা দেন তিনি। কিন্তু নিয়োগ পরীক্ষায় ‘যোগ্য প্রার্থী পাওয়া যায়নি’ মর্মে লিখিত রেজল্যুশন পাস করে নিয়োগ কমিটি।
২০১১ সালের ২৭ আগস্ট এই পরীক্ষা হয়। ২৮ আগস্ট শাহিনুর মিয়া ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হন। মাউশির তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমানে ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক বা অধ্যক্ষ হিসেবে শাহিনুর মিয়ার অবস্থান সম্পূর্ণ অবৈধ। তিনি প্রধান শিক্ষকও নন, অধ্যক্ষও নন।
অধ্যক্ষ হওয়ার ন্যূনতম যোগ্যতা না থাকায় এই নিয়োগ সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী বৈধ না। তদন্তে দেখা গেছে, শাহিনুর মিয়া কলেজের গ্রুপ ক্যাপ্টেন আইয়ুব আলী পিএসসি ভবনের পঞ্চম তলায় পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। ২০১০ সাল থেকে দুটি শ্রেণিকক্ষ মিলে এই আবাসিক কোয়ার্টার তৈরি করে বসবাস করছেন তিনি। কলেজের বিদ্যুৎ খরচে সেখানে তিনটি এসি চলে। অফিস সহায়কদের তাঁর বাসায় কাজ করতে হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসংলগ্ন ১৭টি দোকান, সাতটি এটিএম বুথ, তিনটি ব্যাংক ও দুটি অফিস ভাড়ার অগ্রিম বাবদ প্রায় কোটি টাকা নেওয়া হয়। এর সঙ্গে আছে এসব প্রতিষ্ঠানের মাসিক ভাড়া। কিন্তু এর বেশির ভাগ অর্থের হিসাব পায়নি মাউশি। এর বাইরে বিদ্যালয়ের এমপিও (সরকারি অংশের বেতন-ভাতা), প্রতিষ্ঠানের তহবিল থেকে নগর ও অন্যান্য ভাতাসহ ৭০ হাজার টাকা, শিফটিং ভাতা ৫০ হাজার ও কারিগরি ভাতা বাবদ ২০ হাজার টাকাসহ প্রতি মাসে এক লাখ ৪০ হাজার টাকা উত্তোলন করেন তিনি। আর কলেজ শাখার স্বীকৃতি আনার নামে শিক্ষকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকাও নিয়েছেন তিনি।
প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক মো. হারুনুর রশিদ তদন্ত কমিটিকে জানান, কলেজ শাখার অনুমোদনের জন্য প্রভাষক মো. উসমান গনি ও মো. সাজ্জাদ হোসেনকে নিয়ে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে তিন লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরাও বিষয়টি স্বীকার করেন। ২০১৬ সালে দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে শাহিনুর মিয়াকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। পরে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর বিষয়টি তদন্ত করে ২০১৮ সালে প্রতিবেদন দেয়। ওই তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি অধ্যক্ষ পদের যে বেতন-ভাতা গ্রহণ করেছেন তা কার্যত আত্মসাৎ এবং এই অঙ্ক অনেক বড়। ওই অতিরিক্ত অর্থ ফেরত দেওয়ার নির্দেশনা দেয় পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিষ্ঠানটির একাধিক শিক্ষক জানান, ২০১১ সাল থেকে এ পর্যন্ত কমপক্ষে ছয় কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—অধ্যক্ষ স্কেলে বেতন-ভাতা বাবদ চার কোটি ৩৯ লাখ টাকা, অ্যাডহক কমিটির মাধ্যমে দুই লাখ টাকা হারে ৬০ জন শিক্ষক নিয়োগে এক কোটি ২০ লাখ, বাসাভাড়া বাবদ ২১ লাখ ও ইউটিলিটি বিল বাবদ ১৪ লাখ ৪৪ হাজার টাকা।
২০১১ সালে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড থেকে প্রতিষ্ঠানটির গভর্নিং বডি (কলেজের জন্য প্রযোজ্য) গঠন ও নির্বাচন দেওয়ার নির্দেশনা দেয়। কিন্তু শাহিনুর মিয়া অ্যাডহক কমিটি (স্কুলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য) গঠন করেছেন। কলেজ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, এই অ্যাডহক কমিটি শাহিনুর মিয়ার সব অনিয়মের হাতিয়ার।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শাহিনুর মিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে গভর্নিং বডির নির্বাচন দেননি। চাকরি স্থায়ীকরণ বা নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অর্থ লেনদেনের দালিলিক প্রমাণ পাওয়া না গেলেও বিধি ভঙ্গ করে ছয় শিক্ষক-কর্মচারীকে সুবিধা দেওয়ার প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি।
শিক্ষকদের অভিযোগ, তাঁদের নিয়ন্ত্রণ করার কৌশল হিসেবে বিগত ১৮ বছরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত করার কার্যকর উদ্যোগ নেননি শাহিনুর মিয়া। ফলে অনেক শিক্ষক প্রাপ্যতা থাকা সত্ত্বেও এমপিওভুক্ত হতে পারেননি। আবার জ্যেষ্ঠ শিক্ষক মাহমুদা খাতুনের এমপিওভুক্তির ফাইল বাদ দিয়ে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে সহকারী শিক্ষক আরেফা বিল্লাহর ফাইল সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠিয়েছেন। মাহমুদা খাতুন এর প্রতিবাদ করলে ২২ মাস তাঁর বেতন-ভাতা বন্ধ রাখা হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শাহিনুর মিয়া বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী অধ্যক্ষদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা দেওয়া হয়। আমি প্রায় ২০ বছর এই বাসায় আছি। সেখানে কখনো শ্রেণিকক্ষ ছিল না।’ তিনি বলেন, ‘এই প্রতিষ্ঠানে আসার পর আমি প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও ভোকেশনাল স্তরের পাঠদান চালু করেছি। কখনো কোনো ভাতা পাইনি। শেষ বয়সে এসে এই তিন স্তরের ভাতা মোট ৪৮ হাজার নির্ধারণ করা হয়েছে। স্কুল আগে এক শিফটের মাধ্যমিক বিদ্যালয় হয়েছে। আমি এসে দুই শিফট করেছি, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকি। তাহলে অধ্যক্ষ হিসেবে আমার বেতন খুব বেশি হয়েছে কি?’
এমপিওভুক্তির কথা বলে টাকা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে শাহিনুর মিয়া বলেন, ‘এসব আমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত।’
মাউশির তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে শাহিনুর মিয়া বলেন, ‘এ বিষয়ে হাইকোর্টে মামলা চলমান আছে। এমন অবস্থায় কিভাবে তদন্ত কার্যক্রম চালানো যায়? তাই এটি একপেশে প্রতিবেদন।’
মাউশির বেসরকারি কলেজ শাখার সহকারী পরিচালক তপন কুমার দাস বলেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তদন্ত করে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। জবাব পাওয়ার পর তা বিবেচনায় নিয়ে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০৩/০৭/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
