রাশেদুজ্জামান কাননঃ গত শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত বিশ্বের অন্যতম গরিব, যুদ্ধবিধ্বস্ত, অশিক্ষিত, নিরক্ষর মানুষের দেশ দক্ষিণ কোরিয়া এখন এশিয়ার সুপার পাওয়ার। প্রযুক্তিতে বর্তমান বিশ্বে এক বিস্ময়ের নাম দক্ষিণ কোরিয়া। তাদের এই মিরাকলের মূল জিয়নকাঠি উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা। বিংশ শতাব্দীতে এসে দেশটির শিক্ষাব্যবস্থা বিশ্বসেরা হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে। এর কারণ শিক্ষা খাতে দেশটির বিনিয়োগ। আরও সরলীকরণ করলে বলা যেতে পারে প্রাথমিক শিক্ষায় এবং শিক্ষকের ওপর তাদের বিনিয়োগ।
শিশু ভর্তি, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী হার, ঝরে পড়ার হার, সর্বোপরি মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার সূচকসহ সব ধরনের সূচকে দক্ষিণ কোরিয়া প্রাথমিক শিক্ষায় অভাবনীয় সাফল্য অর্জন অব্যাহত রেখেছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যের চেয়েও তাদের সাফল্যের হার অনেক বেশি। আর এত সব সাফল্যে পর্দার পেছন থেকে চাবিকাঠি নাড়ছেন সে দেশের দক্ষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, উচ্চতর ডিগ্রিধারী শিক্ষকেরা।
উচ্চ বেতন, উন্নত জীবনযাপনের নিশ্চয়তা, সামাজিক মর্যাদা পেয়ে সে দেশের সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীরা শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন। দেশ তাঁদের দিয়েছে উন্নত জীবনমান আর শিক্ষকেরা উপহার দিচ্ছেন উন্নত জাতি। দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান বা মালয়েশিয়ায় শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা অন্য পেশাজীবীদের চেয়ে অনেক ওপরে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে শিক্ষকদের উচ্চতর স্বতন্ত্র বেতন স্কেল প্রদান করা হয়। আর আমাদের দেশের চিত্র উল্টো। শুধু উল্টো বললে ভুল হবে, আমাদের দেশের শিক্ষকদের অবস্থান অন্য পেশাজীবীদের চেয়ে শুধু নিচেই নয়, অপমানজনকও বটে।
বাংলাদেশে একজন প্রাথমিক শিক্ষকের শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক সমমান (দ্বিতীয় বিভাগ)। বেতন পান ১৩তম গ্রেডে। সর্বসাকল্যে যা দাঁড়ায় ১৭ হাজার ৬৫০ টাকা। দৈনিক হিসাবে ৫৮৮ টাকা। পাঁচ থেকে ছয়জনের একটি সংসারে বর্তমান বাজারমূল্যে এই কয়টা টাকা দিয়ে কীভাবে সংসার চলে, তা রীতিমতো বিস্ময়ের বিষয়।
শিক্ষককে বঞ্চিত করে উন্নত রাষ্ট্রের চিন্তা করা বোধ হয় খুব একটা বাস্তবসম্মত হবে না। তাতে দেশ ও জাতিই বরং বঞ্চিত হবে। তাই এখনই সময় প্রাথমিকসহ সব শিক্ষকের উন্নত জীবনমান নিশ্চিত করা। উচ্চশিক্ষিত ও মেধাবীদের প্রাথমিক শিক্ষায় সংশ্লিষ্ট করতে চাইলে এর বিকল্প নেই।
অন্যদিকে, কম কিংবা সমপরিমাণ যোগ্যতা নিয়েও পুলিশের উপপরিদর্শক বেতন পান দশম গ্রেডে। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার নিয়োগের যোগ্যতা ৪ বছর মেয়াদি কৃষি ডিপ্লোমা, বেতন গ্রেড দশম; ইউনিয়ন পরিষদ সচিবের নিয়োগের যোগ্যতা স্নাতক, বেতন গ্রেড দশম। না, অন্য পেশাজীবীদের সঙ্গে শিক্ষকদের নিশ্চয়ই কোনো বিরোধ নেই। কিন্তু যোগ্যতার বিচারেই যদি একজন শিক্ষক উচ্চতর হন, তবে কেন তিনি তাঁর প্রাপ্য বেতন–ভাতা থেকে বঞ্চিত হবেন!
যে দেশে উচ্চশিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও কম বেতনে নিম্ন জীবন যাপন করতে হয়, সে দেশের সর্বোচ্চ মেধাবীরা কেন আসবেন শিক্ষকতা পেশায়? প্রাথমিকের শিক্ষকেরা দশম গ্রেডের জন্য রাস্তায় নেমেছেন। মানববন্ধন করছেন। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে তাঁদের প্রাপ্য আরও বেশি হলেও তাঁরা দশম গ্রেডেই সন্তুষ্ট থাকতে চান। অথচ তাঁদের সেই সামান্য দাবিতেও কর্ণপাতে নারাজ কর্তাব্যক্তিরা।
রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘আনন্দময় পরিবেশে পড়ালেখা ভালো হয়।’ দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে যখন সম্মানের সঙ্গে টিকে থাকতে প্রতিনিয়ত হিসাব–নিকাশ কষে একটি একটি করে প্রয়োজন বাদ দিয়ে মৌলিক চাহিদা মেটাতে হয়, সেখানে মনে আনন্দ থাকবে কী করে? শিক্ষকের নিজের মনেই যদি আনন্দ না থাকে, তবে শ্রেণিকক্ষে আনন্দময় পরিবেশের সৃষ্টি হবেইবা কী করে?
১৩তম গ্রেডের কর্মচারী–শিক্ষকদের বর্তমান অবস্থা সেই ‘বাঁশি’ কবিতার হরিপদ কেরানির মতোই তথৈবচ। হরিপদ কেরানি পালিয়ে বেঁচে গিয়েছিলেন। কিন্তু প্রাথমিকের চার লাখ শিক্ষকেরা পালানোর জায়গাটাও তো নেই।
আমরা ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত রাষ্ট্রের কাতারে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছি। অবকাঠামোগত উন্নতও হচ্ছে ঢের। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমাদের আছে ঈর্ষণীয় সাফল্য। আমাদের দেশকে আমরা রাতারাতি সিঙ্গাপুর বানাতে উঠেপড়ে লেগেছি, কিন্তু সেই অবকাঠামোগত উন্নয়নের ভীতটাকে শক্তিশালী করতে হলে যে ফিরে আসতে হবে সেই প্রাথমিক বিদ্যালয়েই। সে উপলব্ধি কবে হবে আমাদের?
শিক্ষককে বঞ্চিত করে উন্নত রাষ্ট্রের চিন্তা করা বোধ হয় খুব একটা বাস্তবসম্মত হবে না। তাতে দেশ ও জাতিই বরং বঞ্চিত হবে। তাই এখনই সময় প্রাথমিকসহ সব শিক্ষকের উন্নত জীবনমান নিশ্চিত করা। উচ্চশিক্ষিত ও মেধাবীদের প্রাথমিক শিক্ষায় সংশ্লিষ্ট করতে চাইলে এর বিকল্প নেই।
লেখকঃ শিক্ষক ও গল্পকার
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২১/০৫/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তা’য়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
