।। ড. মোঃ কামরুজ্জামান।।
স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘ ৫০ বছর যাবত বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকাভূক্ত ছিল। ২৬ ফেব্রæয়ারী ২০২১ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে এসেছে। জাতিসংঘের উন্নয়ন বিষয়ক কমিটি (সিডিপি) বাংলাদেশ সম্পর্কে এতদসংক্রান্ত এক সুপারিশ করেছে।
এ সুপারিশের মাধ্যমে দেশটি এখন উন্নয়নশীল বিশে^ প্রবেশ করেছে। আর আগামী ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ পুরোপুরি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে গণ্য হবে। উন্নয়শীল দেশে নাম লিখাতে যেকোনো দেশের তিনটি সূচক অর্জন করতে হয়। এ তিনটি সূচক হলো, মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন। যেকোনো দেশকে উন্নয়শীল হতে সিডিপি সাধারণত এ তিনটি সূচককে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। ২০২০ সালে বাংলাদেশ উল্লেখিত তিনটি মানদন্ডই পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে। তারই প্রেক্ষিতে ২৬ ফেব্রæয়ারী ২০২১ সালে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি লাভ করেছে। বাংলাদেশের এ অর্জন নি:সন্দেহে উন্নয়নযাত্রার এক বিরাট মাইলফলক তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
জাতিসংঘ কর্তৃক এ স্বীকৃতি পেতে বাংলাদেশকে অনেক চড়াই উৎরাই পার হতে হয়েছে। এক সময় বাংলাদেশকে যারা তলাবিহীন ঝুড়ি বলে আখ্যা দিয়েছিল তারাই আজ বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রশংসা করছে। দীর্ঘ দুই যুগ পাকিস্তানীরা এ দশেটিকে শোষণের যাতাকলে নিস্পেষণ চালিয়েছিল। বিধায় বাংলার জনগন উন্নয়নের স্বাদ থেকে বঞ্চিত ছিল। নিপীড়িত জনতাকে মুক্তি দিতে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।
নির্যাতিত জনতার অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে তিনি সংগঠিত করেছিলেন। তাঁরই উদাত্ত আহবানে সাড়া দিয়ে বাঙ্গালী বীর জনতা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। বীর বাঙ্গালী দীর্ঘ ৯ মাস হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিল। আর এ সংগ্রামের মাধ্যমেই অর্জিত হয়েছিল আমাদের মহান স্বাধীনতা। ফলে বিশ^ মানচিত্রে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ভূমি হিসেবে স্থান করে নিয়েছিল। ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনময়ে অর্জিত হয়েছিল আমাদের গৌরবময় স্বাধীনতা।
সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশটি তখন একটি বিধ্বস্ত জনপদ। বঙ্গবন্ধু এ বিধ্বস্ত জনপদকে ‘মানব ইতিহাসের জঘন্য ধ্বংসযজ্ঞ’ বলে অভিহিত করেছিলেন। এ অবস্থা থেকে দেশটিকে এগিয়ে নিতে বঙ্গবন্ধু কান্ডারির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। ভঙ্গুর দেশটির পুনর্গঠনে তিনি পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছুটলেন। বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে তিনি বিশ^নেতাদের আহŸান জানালেন।
বিদেশী সাহায্য ও দেশীয় উৎপাদনে দেশটি হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগিয়ে যেতে লাগলো। ৫২ বছরের দীর্ঘ পরিক্রমায় ভঙ্গুর সেই বাংলাদেশটি আজ বিশ^ দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। ধ্বংসযজ্ঞ সেই জনপদ আজ বিস্ময়কর জনপদে রুপান্তরিত হয়েছে। গত ২০ বছরে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। প্রায় সকল সেক্টরেই দেশটি উন্নয়নের স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞেদের মতে, দেশীয় যেকোনো উন্নয়ন টেকসই করতে প্রয়োজন টেকসই শিক্ষাব্যবস্থা। কারণ সব উন্নয়নের মূলে রয়েছে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের জ্ঞান। সংশ্লিষ্ট বিষয়ের জ্ঞান না থাকলে দেশটিকে অন্য দেশের জ্ঞানীদের কাছে ধরনা দিতে হবে। ফলে দেশ থেকে অনেক টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাবে। আমরা সবাই জানি, শিক্ষা হলো জাতির মেরুদন্ড। সেই মেরুদন্ড যদি দুর্বল হয় তাহলে দেশ ও জাতি কখনও সবল হবে না।
আর সেদেশের উন্নয়নও টেকসই হবে না। সুতরাং উন্নয়ন টেকসই করতে টেকসই শিক্ষা ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা পরিস্কার করা যেতে পারে। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখ বিদেশী শ্রমিক কর্মরত রয়েছে।
তারা সকলেই তাদের শিক্ষা ও কর্মদক্ষতা অনুসারে বেতন পেয়ে থাকে। পত্রিকায় প্রকাশ, কর্মরত শ্রমিকদের মধ্যে সর্ব নি¤œ বেতনধারী হলো ২ লাখ টাকা! এসব বিদেশী শ্রমিক সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অনেক যোগ্য ও দক্ষ। এসব শ্রমিক বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পের কর্মী হিসেবে নিয়োজিত আছে বছরের পর বছর ধরে। দেশের পদ্মাসেতু, মেট্রোরেল, রুপপুর পারমানবিক কেন্দ্র ইত্যাদি নানা মেগা প্রকল্পে নিয়োগ পাওয়া জনশক্তির অধিকাংশই বিদেশী। এসব প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পাওয়া বিশেষজ্ঞদের অধিকাংশই বিদেশী।
সূত্রে প্রকাশ, আমাদের দেশের প্রকৌশলীগণ এ সমস্ত বিশেষজ্ঞদের এসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করে! এমতাবস্থায় প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক যে, আমাদের বুয়েট, কুয়েট, চুয়েট, রুয়েটসহ অন্যান্য বিশ^বিদ্যালয়ে কী শিখানো হয়? বিভিন্ন মিডিয়া সূত্রে প্রকাশ, বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ৪ কোটি! তারা সকলেই কাজ চায়। তাদেরকে ৩০ হাজার টাকা বেতন দেয়া হলে তারা ১৫ ঘন্টা কাজ করতেও প্রস্তুত।
তারা দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতিতে শরীক হতে চায়। কিন্তু তারা কাজ না পেয়ে পরিবার, সমাজ ও দেশের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমতাবস্থায় প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে, আমাদের ৫৮টি পাবলিক বিশ^বিদ্যালয় থেকে আমরা কী প্রডাক্ট পাচ্ছি? পাশাপাশি এটাও প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, আমাদের উন্নয়নের ভবিষ্যৎটাই বা কী ? এ উন্নয়ন কতটুকুই বা টেকসই?
একথা সত্য যে, দেশে শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়েছে। জিপিএ-৫ সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ^বিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেগুলোর মান বৃদ্ধি ঘটেনি। বিধায় শিক্ষিত হয়েও তারা দেশের সম্পদ হতে পারেনি। দেশে সরকারী মেডিকেল কলেজের সংখ্যা ৩৯টি। বেসরকারী মেডিকেল কলেজের সংখ্যা ৭০টি। এসব মেডিকেল কলেজের শিক্ষার মান নিয়েও যথেষ্ট প্রশ্ন উঠেছে।
হাসপাতালগুলোর সেবার মান মোটেই সন্তোষজনক নয়। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ হলো, চিকিৎসার জন্য দেশ নায়কদের প্রায়ই বিদেশ গমন! দেশের কর্তাব্যক্তিরা স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য প্রায়ই বিদেশ গমন করেন। চোখের সামান্য পরীক্ষা করতে হলেও সিঙ্গাপুর, ইংল্যান্ড অথবা দিল্লীতে পাড়ি জমান।
এটা দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার দৈন্যেরই বহি:প্রকাশ। এটি দেশের জন্য অত্যন্ত লজ্জাকর একটি ব্যাপার! সামগ্রিক বিষয় বিবেচনা করে বলা যায় যে, শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড হলেও আমাদের দেশে সেটি এখন মৃত্যুদন্ডে পরিণত হয়েছে। এটা সর্বজন স্বীকৃত যে, রাষ্ট্র পরিচালনার সকল ক্ষেত্রে মেধার আবেদন অপরিহার্র্য। বিশেষত শিক্ষা ক্ষেত্রে এর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য ও শিরোধার্য।
কিন্তু আমাদের দেশে মেধাবীরা এ পেশায় আসতে আগ্রহী নয়। মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে চায় না। একটা উদাহরণ দিলেই বিষয়টি পরিস্কার হয়ে যাবে। দেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থী ক্যারিয়ার অপশন হিসেবে বিসিএসকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়। উক্ত বিসিএসে ক্যাডার হওয়ার ধাপ আছে ২৮টি।
অধিকাংশ শিক্ষার্থীই ক্যাডার হতে প্রশাসন, পুলিশ, ফরেইন এফেয়ার্স ইত্যাদি পদকেই প্রধানত চয়েস দেয়। চয়েস নির্বাচনে প্রায় সকল প্রার্থীই ‘শিক্ষা ক্যাডার পদটি’কে সর্বশেষ চয়েস দিয়ে থাকে। তার মানে সকলেই বড়ো লোক হতে ক্ষমতা ও টাকাওয়ালা পদটিকে বেছে নেয়। যেহেতু শিক্ষকতা পেশায় টাকা কিংবা ক্ষমতা-কোনোটিই নেই। বিধায় এপদটিকে সকলেই এড়িয়ে চলে। এটি একটি দেশের উন্নতি ও অগ্রগতির প্রধান অন্তরায়।
শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক দৈন্যের কারণে আমাদের দেশের শিক্ষার মান দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনি¤েœ। আন্তর্জাতিক স্কুলের মানদন্ড অনুযায়ী বাংলাদেশের শিক্ষার মান ২.৮ ভাগ। বিপরীতে ভারত ও শ্রীলংকার শিক্ষার মান ২০.৮ ভাগ। দক্ষিণ এশিয়ায় অকার্যকর দেশটির নাম হলো হলো পাকিস্তান। অথচ সে দেশের শিক্ষার মান আমাদের থেকে অনেক এগিয়ে। সর্বশেষ জরিপে দেখা যায়, এশিয়াতে সে দেশের শিক্ষার মান ১১.৩ ভাগ। এ সমীক্ষা এটাই প্রমাণ করে যে, আমাদের দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা অতি ক্রটিপূর্ণ।
যেকোনো দেশে শিক্ষার ভিত রচিত হয় প্রাইমারী থেকে। দেশে প্রাইমারী স্কুলের সংখ্যা ৬৬ হাজারের কাছাকাছি। এখানে চাকুরীরত শিক্ষকের সংখ্যা ৪ লাখ। জাতি গড়ার ভিত্তিই হলো এ ৪ লাখ শিক্ষক। তারা প্রায় সারাটা দিন স্কুলে সময় দেন। মাস শেষে তারা সর্বসাকুল্যে বেতন পান ১৭ হাজার টাকা। তাঁরা প্রত্যেকে মাসিক টিফিন ভাতা পান মাত্র ২০০ টাকা! তার মানে তাদের প্রতিদিনের টিফিন ভাতা ৬ টাকা ৬৬ পয়সা! এসব শিক্ষকের মর্যাদা সচিবালয়ের একজন পিয়নের মর্যাদার চেয়েও নিচে! এসব কারণে পাবলিক বিশ^বিদ্যালয় থেকে পাশকরা ভালো রিজাল্টধারী একজন গ্রাজুয়েট এখানে চাকরি করতে চান না।
দেশে মাধ্যমিক স্তরের ৯৭ ভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই বেসরকারী। দেশে বেসরকারী এমপিওভূক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২৬ হাজার। এখানে কর্মরত শিক্ষক সংখ্যা ৫ লাখ। নিয়োগ পেয়ে এন্ট্রি লেভেলে তারা বেতন পান ১২ হাজার ৫০০ টাকা। তাদের মাসিক চিকিৎসা ভাতা ৫০০ টাকা। অথচ একজন ভালো ডাক্তারের একবারের ফি ১ হাজার টাকা! এসব শিক্ষক বাড়ী ভাড়া বাবদ পান মাত্র ১ হাজার টাকা। যা দিয়ে বস্তিতে একটি কক্ষও ভাড়া পাওয়া যায় না। যুগ যুগ ধরে সরকার কৃর্তক নির্ধারিত এ ভাতা শিক্ষকরা পেয়ে আসছেন! এটা একজন শিক্ষকের সাথে পরিহাস ছাড়া আর কী হতে পারে! এখানে নেই টিফিন ফি, নেই পদোন্নতি, নেই বদলী।
বর্তমান বাজারে এ সামান্য বেতনে তাদের ১০ দিনও চলেনা। তারা পাঠদানে মনোযোগী হতে পারেন না। সংসারের ঘানি টানতে তারা বেছে নেন নানান পেশা। কেউবা টিউশনি করেন, কেউবা গরু পালন করেন। আবার কেউ কেউ কলা চাষে বাধ্য হন। এরপর রয়েছে উচ্চ মাধ্যমিক লেভেল। এ পর্যায়ে কলেজগুলো এমপিওভূক্তির কঠিন বেড়াজালে বন্দি। এখানেও পদোন্নতি বা বদলি-কোনোটিই নেই। একজন শিক্ষক ৩০ বছর যাবত প্রভাষকই রয়ে যান! প্রভাষক পদে যোগদান করে প্রভাষক হিসেবেই অবসরে যান!
এরপর আসা যাক উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রসঙ্গে। বিশ^বিদ্যালয় হলো যেকোনো দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ। কিন্তু বাংলাদেশে সেটা আজ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এখানে প্রমোশন থাকলেও একাডেমিক মোটিভেশন নেই। গবেষণা থাকলেও আন্তর্জাতিক মান নেই।
বর্তমানে এখানে শিক্ষক নিয়োগের প্রধান যোগ্যতা হলো ক্ষমতাসীন দলের অন্ধ কর্মী হওয়া। এখানে নিয়োগ পাবার সাথে আরো রয়েছে টাকা ও আতœীয়তার সম্পর্ক। এসব যোগ্যতা নিয়ে নিয়োগ পাবার পর একজন শিক্ষক একাডেমিক মনোভাব পোষণ করেন না। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মনোভাবই পোষণ করেন। এসব কারণে আন্তর্জাতিক র্যাংকিং-এ বাংলাদেশের একটি বিশ^বিদ্যালয়েরও স্থান হয়নি।
আমাদের শিক্ষার্থীরা এমন শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে, তারা না শিখছে নৈতিক শিক্ষা, না শিখছে বিজ্ঞান শিক্ষা আর না শিখছে প্রযুক্তির শিক্ষা। ফলে তারা দক্ষ নাগরিক হয়ে বড়ো হচ্ছে না। এই শিক্ষায় শিক্ষার্থীগণ দেশপ্রেমিক হয়েও গড়ে উঠছে না। দেশে এ শিক্ষা তাই ধনীক শ্রেণীর অনৈতিক বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। আর এ বাণিজ্যের মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী লোভী, টাকা উপার্জনকারী ও দেশবৈরী নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠছে! শেষ অবধি সে লুটেরাদের কাতারে শামিল হচ্ছে!
অতি মেধাবীরা ঘটনাক্রমে শিক্ষাকতা পেশায় আসলেও অনেক ক্ষেত্রে তাদেরকে ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ এ পেশায় যেহেতু আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধা নেই তাই এখানে তাদের আকর্ষণও নেই। আবহমানকাল থেকেই দেখে আসছি, আমাদের দেশের শিক্ষকদের আর্থসামাজিক অবস্থা খুবই নিম্নমানের ! বর্তমানে যারা এ পেশায় নিয়োজিত আছেন তারা সামাজিকভাবে একেবারেই উপেক্ষিত। তাদের অর্থনৈতিক সলভেন্সি নেই। সামাজিক মর্যাদা নেই। আর ক্ষমতাতো নেইই। পূর্বেই বলা হয়েছে, এদেশে শিক্ষকের মর্যাদা সচিবালয়ের একজন পিয়নের মর্যাদার সমানও নয়। আমাদের দেশ মূলত আমলাশাসিত দেশ।
বৃটিশ আমল থেকে চলে আসা আমলাতান্ত্রিক শাসন দেশে আজ অবধি চলমান রয়েছে। আমলানিয়ন্ত্রিত দেশে একজন সরকারী বড়ো কর্মচারীর আর্থসামাজিক অবস্থা আকাশচুম্বী। তাদের অর্থনৈতিক সলভেন্সি, সামজিক মর্যাদা ও প্রশাসনিক ক্ষমতা সীমাহীন। অথচ আমলা তৈরীর কারিগরেরা সমাজে আমলাদের দ্বারাই অবহেলিত-ক্ষতিগ্রস্ত! একটি উদাহরণের মাধ্যমে একজন আমলা ও একজন শিক্ষকের সামাজিক অবস্থান স্পষ্ঠ করা যেতে পারে।
আমলাগণ এ দেশের সর্বোচ্চ সরকারী সুবিধাভোগী নাগরিক। তারা তাদের নির্ধারিত বেতনের বাইরে নানাবিধ অর্থনৈতিক সুবিধা পেয়ে থাকেন। শুধু বাবুর্চি এলাউন্স বাবদ তারা মাসে ১৬ হাজার টাকা ভাতা পান! বাসভবনে নিরাপত্তা এলাউন্স বাবদ তারা ভাতা পান ১৬ হাজার টাকা! প্রতি মাসে না হলেও একজন আমলা বছরে অন্তত ২/১ বার বিদেশ ভ্রমণে যান।
এ উপলক্ষ্যে টিএ/ডিএ বাবদ পান কমপক্ষে ২ থেকে ৩ লক্ষ টাকা! একজন আমলা বিনা সুদে গাড়ী ক্রয়ের সুবিধা পেয়ে থাকেন। যার মূল্য পদ ভেদে ৫০ লাখ থেকে কোটি টাকা! গাড়ির জ¦ালানী খরচ বাবদ প্রতি মাসে তিনি পান ২০ হাজার টাকা। এছাড়া আবাসিক টেলিফোন ভাতা, সেলফোন ভাতা, ইন্টারনেট মডেম ভাতা, আপ্যায়ন ভাতা, ডোমেস্টিক ভাতা, হেয়ারকাটিং ভাতাসহ নানা ভাতাদি পেয়ে থাকেন! চাকরী শেষে একবারেই একজন আমলা বস্তা ভর্তি টাকা পান। অবসরকালীন পেনশনতো আছেই। চাকরী শেষে একজন আমলা নিরাপদ জীবনের গ্যারান্টি পান।
তাদের সন্তানদের মানুষ করার গ্যারান্টি পান। তারাই দেশের শিক্ষাব্যবস্থার নির্মাতা ও পরিচালক। তাদের হাতে গড়া বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা অতিশয় ক্ষয়িষ্ণু ও দুর্বল। তাদের সন্তানরা তাই এদেশে পড়েনা। সন্তানদেরকে বিদেশ পাঠিয়ে তারা সুশিক্ষা নিশ্চিত করেন। সন্তানদের উজ্জল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করেন। তারা দেশের সকল আয়-রোজগার বিদেশে ইনভেস্ট করেন। সামাজিক অস্থিরতায় ভরা এ দেশ তার আর ভালো লাগেনা। এক সময় তিনিও বিদেশে পাড়ি জমান। বিদেশের মাটিতে নিশ্চিত ও সুন্দর আগামী গড়েন।
বিপরীতে আমাদের দেশের একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের হাল হকিকত সবারই জানা। জীর্ণকায় শরীরে অপুষ্টিতে ভোগা একজন চুলপাকা বুড়ো মানুষই হলো বাংলাদেশের অবসরপ্রাপ্ত একজন শিক্ষক। যার কপালের প্রতিটি ভাঁজে দারিদ্র্যের কষাঘাতের ঘাম ভরপুর। তার সন্তানদের ভবিষ্যৎ একেবারেই অনিশ্চিত। অথচ দেশ এবং জাতির উন্নয়ন নির্ভর করছে এ সমস্ত শিক্ষকদের উপর। জাতি গড়ার এ কারিগরগণ অর্ধাহারে-অনাহারে দারিদ্র্যক্লিষ্ট জীবন যাপন করেন। তাদের জীবন মানের উন্নয়ন ছাড়া দেশের কোনো উন্নয়নই টেকসই হবে না।
লেখক: অধ্যাপক- দা’ওয়াহ এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১৫/০৫/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তা’য়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
