ফাইল ছবি

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিসাবব্যবস্থা

    • মো: জিয়াউল হকঃ

বহু প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ নিজ প্রয়োজনে হিসাব রেখে আসছে। শুরুতে তা হয়তো এতটা গোছানো ছিল না। পাহাড়ের গায়ে দাগ কেটে, লতায় গিঁট দিয়ে, গুহার প্রবেশদ্বারে পাতার রঙ দিয়ে আঁচড় টেনে তারা প্রয়োজনীয় হিসাব রাখত। হিসাব রাখার ধরন যেমনি হোক উদ্দেশ্য কিন্তু ছিল একই, তা হলো প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ। কালের আবর্তন ও যুগের চাহিদায় মানুষ এখন তার ব্যক্তিগত, পারিবারিক ব্যবসায় এমনকি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনারও বিজ্ঞানসম্মতভাবে হিসাব রাখছে।

একটি নির্দিষ্ট সময় শেষে সঠিক তথ্য সংগ্রহ ও ফলাফল নিরূপণে ব্যক্তি, পরিবার, ব্যবসায় ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় বিজ্ঞানসম্মত হিসাবব্যবস্থার বিকল্প নেই। ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি অব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের (শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, মসজিদ, সরকারি বিভিন্ন সেবাদানকারী সংস্থা) হিসাব রাখাও জরুরি। বরং অব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান নিজেদের সফলতা যাচাই, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির কারণে আরো বেশি তৎপর হয় এবং হিসাব সংরক্ষণে যতশীল হয়। অব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যদিও মুনাফা অর্জন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান উদ্দেশ্য নয় তথাপি বার্ষিক আয়-ব্যয়, প্রাপ্তি-প্রদান ও বছর শেষে সম্পদ-দায় নিরূপণে যথাযথ হিসাবব্যবস্থার বিকল্প নেই।

মালিকানা ও পরিচালনার ভিত্তিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিভিন্ন রকম হলেও এদের উদ্দেশ্য, আয়-ব্যয়ের ধরন, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা কিন্তু প্রায় এক।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয় নিয়ে আগে সরকার ততটা খোঁজখবর না রাখলেও বর্তমানে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেই সরকারকে বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব দিতে হয়। ২০১৫ সালের ১০ জুন তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ নায়েম অডিটোরিয়ামে এক জাতীয় কর্মশালায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সঠিক আয়-ব্যয়ের হিসাব সরকারকে দিতে হবে বলে জানান। তিনি বলেন, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিভিন্ন উৎস থেকে আয় ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্থ ব্যয় করে থাকেন। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানে সরকারের কোনো প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ না থাকায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। যদিও সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের টাকা নেয় না তবুও সরকার চায় সমাজ ও দেশের স্বার্থে এর আয়-ব্যয়ের মধ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকুক। তার পর থেকেই দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারের কাছে জবাবদিহি ও সামাজিক দায়বদ্ধতার কারণে যথাযথ হিসাব সংরক্ষণ করে থাকেন।

সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য এক হলেও আয়-ব্যয় ও হিসাব সংরক্ষণে ব্যক্তিমালিকানাধীন, এমপিও ও সরকারি প্রতিষ্ঠান মধ্যে তারতম্য দেখা যায়। দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যক্তিমালিকানাধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের হিসাবরক্ষণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আমাদের আজকের আলোচ্য।

প্রাইভেট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আয়ের বিভিন্ন উৎস রয়েছে, যা থেকে বছরে কোটি কোটি টাকা অর্জিত হয়। এসব আয়ের খাত অনুযায়ী সঠিক বণ্টন ও লিপিবদ্ধকরণের ওপর প্রতিষ্ঠানের সফলতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হয়।

যেসব উৎস থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আয় করে থাকে:
১) প্রতি বছর ছাত্রছাত্রীদের ভর্তি ফি।
২) ভর্তিকালীন ছাত্রছাত্রীদের দেয়া অনুদান।
৩) বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহীত জাকাত প্রতিষ্ঠানের আয় বৃদ্ধি করে।
৪) ছাত্রছাত্রী থেকে সংগৃহীত বিভিন্ন খাতে অর্থ আদায়- যেমন ছাত্রকল্যাণ তহবিল, শিক্ষক কল্যাণ তহবিল, সহশিক্ষা কার্যক্রম, বিনোদন ইত্যাদি।
৫) প্রতিষ্ঠানে আসা রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিবর্গের দেয়া অনুদানও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আয়ের উৎস।
৬) প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন স্থায়ী সম্পদ- যেমন দোকান ভাড়া, মাছ বিক্রয়, জমি-জিরাতের ফসল বিক্রয় ইত্যাদি থেকে প্রচুর অর্থ আয় হয়ে থাকে।

উপরিউক্ত আয় ছাড়াও প্রতি বছর নিয়মিত ও অনিয়মিত আরো বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাইভেট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রচুর অর্থের সংস্থান হয়ে থাকে।

ব্যক্তিমালিকানাধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণে থাকলেও তাদের আয়-ব্যয়, হিসাব সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও নীতিমালা প্রায় সবই নিজস্ব চিন্তাধারা অনুযায়ী পরিচালিত। প্রাইভেট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আয়ের যেমন বিভিন্ন উৎস রয়েছে তেমনি তাদের ব্যয়ের খাতও নিছক কম নয়। যেসব উল্লেখযোগ্য খাতে প্রাইভেট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের অর্জিত আয় বণ্টন বা ব্যয় করে তা নিম্নরূপ:

১) শিক্ষকদের মাসিক বেতন ও বার্ষিক বোনাস।
২) প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত উন্নয়ন।
৩) মাসিক, পর্ব ও চূড়ান্ত পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, পরীক্ষা গ্রহণ ও মূল্যায়ন।
৪) জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইভেন্টে অংশগ্রহণ।
৫) শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের রেজাল্টের ভিত্তিতে প্রণোদনা, দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তি প্রদান।
৬) কর্মচারী কল্যাণ তহবিল গঠন ও আপৎকালীন সহায়তা প্রদান।
৭) ডিজিটাল ক্লাসরুম, পরিবহন সেবা, ক্যান্টিন সুবিধা, মেডিক্যাল ক্যাম্প ইত্যাদিতেও প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান প্রচুর অর্থ ব্যয় করে থাকে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণে বিভিন্ন রকমের সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়, যাতে যথাসময়ে দ্রুত ও নির্ভুল হিসাব সংরক্ষণ ও তথ্য সরবরাহ করা যায়।

এসব সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের হিসাব অপেক্ষাকৃত কম সময় ও সহজে করা যায়। মাত্র একটি ক্লিকের মাধ্যমে সফটওয়্যারে ইনপুট দেয়া ডাটা বিভিন্ন ভাগে অটোমেটিক বিভাজন হয়ে যায়।

প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত সফটওয়ারে যেসব সুবিধা পাওয়া যায়:
১) খুব দ্রুত হিসাব লিপিবদ্ধকরণ ও দীর্ঘ সময়ের জন্য তা সংরক্ষণ।
২) প্রতিদিন, মাস ও বার্ষিক ভিত্তিতে নিট আয় নির্ণয়।
৩) প্রতিটি শিক্ষার্থী থেকে সংগৃহীত তথ্য আলাদা আলাদাভাবে সংরক্ষণ, এতে প্রত্যকের দায়দেনা সম্পর্কে আলাদা আলাদাভাবে জানা যায়।
৪) শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনভাতাসংক্রান্ত সফটওয়্যার তাদের মোট বেতন, নিট বেতন, ইনক্রিমেন্ট ইত্যাদি লিপিবদ্ধকরণ ও প্রদর্শন সহজ হয়।
৫) প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সংগৃহীত অর্থ বিভিন্ন খাত অনুযায়ী সহজে বিভাজন করা যায়।

এসব প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে বছরান্তে সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন অডিট ফার্মগুলো অডিট করে থাকে। অডিটর বিগত সময়ে হিসাবগুলো যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করে থাকেন। ভুলত্রুটি বা জাল আর্থিক অনিয়ম উদঘাটিত হলে তবে তার বিরুদ্ধে রিপোর্ট করে থাকে। কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান তাদের অভ্যন্তরীণ হিসাব সংরক্ষণের জন্য উচ্চপদস্থ হিসাব কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়ে থাকেন, এমনকি অভ্যন্তরীণভাবে তারা হিসাব নিরীক্ষক নিয়োগ দিয়ে থাকেন যাতে প্রতিষ্ঠানের হিসাবের ভুল ত্রুটিগুলো উদঘাটন করে সংশোধন করা যায়, এতে সরকারিভাবে অডিট হলেও নির্ভুল তথ্য সরবরাহ করা যায়।

সবশেষে বলা যায়, মুনাফা অর্জন বা আর্থিক লেনদেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান উদ্দেশ্য না হলেও সামাজিক দায়বদ্ধতা, সরকারি জবাবদিহিতা, আর্থিক অনিয়ম রোধ বা অর্থ আত্মসাৎ রোধ ও একটি নির্দিষ্ট সময় শেষে প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়, প্রাপ্তি-প্রদান ও আর্থিক অবস্থার বিবরণীর নির্ভুল ও সহজ উপস্থাপনায় সঠিক হিসাব সংরক্ষণের বিকল্প নেই।

লেখক : প্রভাষক, হিসাববিজ্ঞান।

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১০/০৫/২০২৩

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তা’য়র


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.