মো. আরফাতুর রহমানঃ শিক্ষার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তোলার শক্তিশালী ও কার্যকর এবং প্রয়োগযোগ্য সুষ্ঠু, সবল শিক্ষা সম্পর্কীয় পরিকল্পনা হলো শিক্ষাক্রম। শিক্ষাকে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের পাথেয় হিসেবে ব্যবহার করে বিশাল জনগোষ্ঠীকে জনসম্পদে পরিণত করার জন্য অপরিহার্য হাতিয়ার হলো শিক্ষাক্রম। নতুন শিক্ষাক্রমে তৃতীয় শ্রেণি এবং ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত কোনো পরীক্ষা থাকবে না- এই সিদ্ধান্তে ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়েছে, কতটুকু যুক্তিযুক্ত।
শিশুদের পরীক্ষার মতো প্রতিযোগিতামূলক আসর থেকে সরিয়ে রাখার সৎ ইচ্ছাকে সাধুবাদ জানাই। তবে সমস্যা হচ্ছে, বিষয়টি চমৎকার ও সময়োপযোগী হলেও কার্যকারিতার দিক থেকে হয়তো আমাদের দেশের অন্যসব প্রকল্পের মতোই হতে যাচ্ছে। আরো সহজ কথায় যদি বলতে হয়, ধরা যাক চমৎকার পলিসি তৈরি করা হলো যেখানে বাংলাদেশের সব শিশুশিক্ষার্থী চিন্তাশীল হবে। পলিসি তৈরি করলেই কি হয়ে যাবে? পরিকল্পনা আসলে কোনো কাজেই আসবে না, যদি এর জন্য ভালো রিসোর্স না থাকে। এর অর্থ, ভালো পলিসি ততক্ষণ পর্যন্ত সমাজের জন্য সুফল বয়ে আনে না, যতক্ষণ পর্যন্ত ওই ভালো পলিসি মানার জন্য শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরি না হয়।
প্রশ্নের ধরন এখনো ঠিক না হওয়ায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা অস্পষ্টতার মধ্যে আছেন। আবার শিক্ষার্থীরাও অনেকটা অন্ধকারে আছে। পরীক্ষার একেবারে আগমুহূর্তে প্রশ্নের ধরন জানালে প্রস্তুতির সময় থাকবে না। তাছাড়া শিক্ষার্থীরা বাসায় গিয়ে বই স্পর্শ করা থেকে অনেক দূরে সরে যাচ্ছে। অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের পড়ার কথা বললেই তারা উত্তর দিচ্ছে- পরীক্ষা নেই, তাহলে পড়ব কেন। প্রথাগত পরীক্ষার চেয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিক মূল্যায়ন (শিখনকালীন) বেশি হওয়ার কথা ছিল। তবে দেখা যাচ্ছে এর উল্টোটা ঘটছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় পাওয়া যাচ্ছে মূল্যায়নের উত্তর, বাজারে ইতোমধ্যে বের হয়ে গিয়েছে গাইড বই। যা নতুন শিক্ষাক্রমের প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়াবে। তাহাড়া শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না দেয়ার কারণে তারা বুঝে উঠতে পারছে না, মূল্যায়নের বিষয়টি। নতুন শিক্ষাক্রমে অস্পষ্টতার কারণে শিক্ষার্থীরা আগের থেকে বেশি প্রাইভেটকেন্দ্রিক হতে দেখা যাচ্ছে, যা নতুন শিক্ষাক্রমের উদ্দেশ্যকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে অভিভাবকদের ধারণা।
কিন্তু নতুন শিক্ষাক্রমে বলা হচ্ছে, চারটি ধাপ অনুসরণ করে শিক্ষক পাঠদানের কাজটি করবেন। প্রথম ধাপে তিনি কোনো একটি বিষয় নিয়ে শিক্ষার্থীদের মতামত যাচাই করবেন। এ ক্ষেত্রে তিনি শিক্ষার্থীদের একক কাজ দিতে পারেন, দলগতভাবেও কাজ করার সুযোগ দিতে পারেন। এর মধ্য দিয়ে শিক্ষক তাদের জ্ঞানের স্তর সম্পর্কে ধারণা পাবেন এবং দুর্বল শিক্ষার্থীকে শনাক্ত করতে পারবেন। দ্বিতীয় ধাপে শিক্ষক প্রত্যেকের বা প্রতিটি দলের মতামতের ভিত্তিতে অন্য শিক্ষার্থীদের অভিমত বা প্রতিক্রিয়া লক্ষ করবেন। আদ্য কি তা বাস্তবে অনুসরণ করে পাঠ দান করানো হচ্ছে কি না তা দেখা জরুরি। পাঠদান প্রক্রিয়ার মতো মূল্যায়ন পদ্ধতিও আগের মতো থাকছে না। মূল্যায়নের কাজটি চলবে মূলত বছরজুড়ে।
শ্রেণিকক্ষের বিভিন্ন কাজের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত যোগ্যতাগুলো অর্জন করার চেষ্টা করবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী কতটুকু যোগ্যতা অর্জন করেছে, বা কতটুকু পারছে, শিক্ষক সেটুকু অ্যাপসে বা এক্সেল শিটে চিহ্নিত করে রাখবেন। এখনো কি এগুলো বাস্তবায়িত হচ্ছে? নাকি মুখে মুখেই বলা হচ্ছে। শিক্ষা কোনো পণ্যসামগ্রী নয়। এটা অর্জনের বিষয়। তাই শিক্ষার্থীকেই শ্রেণিকক্ষ ও শ্রেণিকক্ষের বাইরে জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী হতে হবে। তাই উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে জাতির সৃজনশীলতার বিকাশ দক্ষ ও মেধাসম্পন্ন সমাজ গঠনে শিক্ষাব্যবস্থার ওপর সমধিক গুরুত্বারোপ করা হয়।
নতুন শিক্ষাক্রমের পাঠদান পদ্ধতি ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া যথাযথভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব। তাছাড়া মূল্যায়নের সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড অতি দ্রুত শিক্ষকদের কাছে পৌঁছাতে হবে, নতুবা চলতি বছরে শিক্ষার্থীরা শিখন ঘাটতিতে পড়বে, যা তাদের ক্ষতির দিকে নিয়ে যাবে। তবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় নানা সংকট ও অসঙ্গতি থাকা সত্ত্বেও এর যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থাকে পরিশুদ্ধ স্বচ্ছ করতে শিক্ষা খাতের বিভিন্ন সমস্যা অতি দ্রুত দূর করতে হবে। শিক্ষার নানামুখী সংস্কারের পাশাপাশি সরকারকে শিক্ষা জাতীয়করণের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
মো. আরফাতুর রহমান : শিক্ষক, মিল্লাত উচ্চ বিদ্যালয়, বংশাল, ঢাকা।
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০৩/০৪/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
