এইমাত্র পাওয়া

সহজ হচ্ছে এমপিও নীতিমালা!

এমপিও নীতিমালার একটিতে রয়েছে, কোনো প্রতিষ্ঠান এমপিও’র যোগ্যতা অর্জন করতে হলে ওই প্রতিষ্ঠানের পাসের হার ৭০ শতাংশ থাকতে হবে। কিন্তু ভৌগলিক অবস্থা চিন্তা করলে শহর আর গ্রামের পাসের হার একই হওয়াটাকে বেমানান মনে করছেন অনেকে। এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি বলেন, এ বিষয়ে চিন্তাভাবনা করা হবে, পরবর্তী সময়ে এমপিওভুক্তিতে সকল প্রতিষ্ঠান আরো যথাযথভাবে যাচাই বাছাই করা হবে।

সদ্য ঘোষিত ২৭৩০ প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তির বিষয়ে নানা অসঙ্গতি এবং জনমনে বিভিন্ন ধরণের প্রশ্ন দানা বাঁধায় রোববার গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। বিকাল ৪টায় ব্যানবেইস সম্মেলন কক্ষে এমপিও নিয়ে উত্থাপিত বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন শিক্ষামন্ত্রী।

শিক্ষকের আর্থিক নিরাপত্তা ছাড়া মানসম্পন্ন শিক্ষা সম্ভব নয় মন্তব্য করে দীপু মনি বলেন, মানসম্পন্ন শিক্ষা শুধু একটি বিষয়ের সঙ্গে জড়িত নয়। অনেক বিষয়ের উপর জড়িত। ধরেন আমি শিক্ষার অবকাঠামো দিলাম, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিলাম সবই করলাম তাহলে কি শিক্ষা মানসম্পন্ন হবে? সবকিছুর সঙ্গে শিক্ষকের আর্থিক নিরাপত্তাও জড়িত। আবার মনে করেন শিক্ষকের আর্থিক নিরাপত্তা দিলাম কিন্তু অবকাঠামো দিলাম না বা অবকাঠামো দিলাম না, তাহলেও মানসম্পন্ন শিক্ষা সম্ভব নয়।

অনেক স্কুলের শিক্ষার্থী নেই পাসের হার নেই এগুলো কিভাবে এমপিওভুক্ত হলো এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ভুল তথ্য দিয়ে এমপিও হওয়া স্কুলগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যেসব কর্মকর্তারা এসব তথ্য দিয়েছেন সেসব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে আমাদের যাচাই বাছাইয়ে সেগুলোর কোনো ভুল নেই। তারপরও ফের যাচাই করে দেখবো। এ বিষয়ে সবার স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি সহ সবার সহযোগিতা চান শিক্ষামন্ত্রী।

দীপু মনি বলেন, ‘এখন থেকে প্রতিবছরই এমপিওভুক্ত করা হবে। বছরের নির্দিষ্ট একটা সময়ে আবেদন করার আহ্বান করা হবে। আর যেগুলো এখন এমপিওভুক্ত হলো এবং আগেও যে ২৫ হাজার প্রতিষ্ঠান রয়েছে তাদের প্রতিও মন্ত্রণালয়ের সজাগ দৃষ্টি থাকবে। যদি কোনোক্রমে নীতিমালার মানদণ্ড বজায় রাখতে না পারে তাহলে এমপি স্থগিত করা হবে।’

যুদ্ধাপরাধী ও বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নামে স্কুল এমপিওভুক্তির বিষয়ে তিনি বলেন, যেসব যুদ্ধাপরাধী নামের স্কুলের নাম এসেছে তারা দেশের লোকের কাছে তেমন পরিচিত কেউ নন। হয়তো স্থানীয়ভাবে পরিচিত আছে। তবে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে খবর নেওয়া হবে। আর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটা কার্যক্রম চলমান আছে সেটা হলো বিতর্কিত নাম বাদ দিতে হবে। সেক্ষেত্রে এরকম প্রমাণ হলে কর্তৃপক্ষ থেকে আবেদনের মাধ্যমে নাম পরিবর্তন করা হবে। রাজনৈতিক বিতর্কিত ব্যক্তিদের ব্যাপারেও একই নিয়ম থাকবে।

ভাড়া বাড়িতে থাকা প্রতিষ্ঠান এমপিও শর্ত ভঙ্গ করেনি বলেও মনে করি শিক্ষামন্ত্রী। এমপিও পেয়ে ভবন নির্মাণের বিষয়ে তিনি বলেন, এগুলো আগেই টেন্ডার করা ছিল। এমপিও পাওয়ার কথা শুনে তারা তড়িঘড়ি করে কাজ শুরু করেছেন। এটা কোনো নীতিভঙ্গ নয়।

একটি আগে এমপিও পাওয়া স্কুল এমপিওভুক্ত হওয়ার প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ওই স্কুলটি আসলে উচ্চ মাধ্যমিকের জন্য আবেদন করে ছিলো মনে হয়। এটা ইনপুট দেয়ার সময় হয়তো ভুলটা হয়েছে। তারপরও আমার কাছে মনে হয়, আমরা যদি আগের ২৫ হাজারের তালিকাটা দেখে করতে পারলাম আরো ভালো হতো। এরকম ভুল হতো না। একই ভাবে শাহজালাল সরকারি কলেজের ক্ষেত্রেও একই ভুল হয়েছে। কারণ জাতীয়করণ আর এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়াটা ভিন্ন। তারপরও জাতীয়করণের তালিকাটা দেখে করলে ভালো হতো।

এমপিওভুক্তির কার্যক্রম এবং সরকারিকরণের কার্যক্রম দুটি বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ থেকে সম্পাদিত হয়েছেে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, একটি প্রতিষ্ঠানের একটি স্তর সরকারিকরণের পরেও এমপিওভুক্ত হয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি সরকারিকরণ হয়। তার আগেই এমপিওভুক্তির জন্য আবেদন করা হয় এবং চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়। এ বিষয়ে কেউ রিপোর্ট না করায় এই বিভ্রান্তি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, এটা এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম নয়। সরকারিকরণের কারণে স্বাভাবিকভাবেই প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির কোন প্রয়োজন না থাকায় এ আদেশ উক্ত প্রতিষ্ঠান জন্য স্বাভাবিকভাবেই কার্যকর হবে না।

অন্যদিকে পূর্বে এমপিওভুক্ত হওয়া প্রতিষ্ঠানের একটি স্তর আবারো এমপিওভুক্ত হয়েছে বলে যে সংবাদ পরিবেশিত তার ব্যাখ্যায় শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের যে স্তর ইতিমধ্যে এমপিওভুক্ত হয়েছে সে স্তরের জন্য তাদের পুনরায় আবেদন করার কথা নয়। সম্ভবত তারা ভুলক্রমে এমপিওভুক্ত স্তরের জন্যই পুনরায় আবেদন করেছে। প্রকৃত অর্থেই তারা এই ভুল করেছে কিনা তা যাচাই করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এটি হয়ে থাকলে এমপিওভুক্তির কার্যক্রমের ক্ষেত্রে এটি অনিয়মের মধ্যে পড়ে না বলেও দাবি করেন তিনি।

এমপিওভুক্তির আদেশ জারির পরে একটি প্রতিষ্ঠান রাতারাতি ভবন নির্মাণ করেছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, বিষয়টি পরিপূর্ণভাবে জানার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এমপিওভুক্তির প্রদত্ত শর্ত অনুযায়ী যেসব তথ্যাদির ভিত্তিতে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে সেসব তথ্য ভুল বা অসত্য প্রমাণ হলে তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। শতভাগ নিয়মকানুন অনুযায়ী যোগ্য প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্ভাব্য সকল কার্যক্রম গ্রহণ করেছে বলেও জানান তিনি।

এমপিওভুক্তির জন্য স্বীকৃতি একটি অন্যতম শর্ত উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, কোন কোন ক্ষেত্রে নিজস্ব ভবন না থাকলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শিক্ষাক্রম নিজস্ব ভবনের মধ্যে পরিচালনা করা হবে বলে শর্ত আরোপ করা হয়। কেউ যদি এই শর্ত পালন না করে থাকে এবং এ আদেশে এমপিওভুক্ত হয়ে থাকে, তাহলে পরবর্তীতে পরীক্ষাকালে উল্লেখিত শর্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

জানা যায়, নতুন এমপিওভুক্তির জন্য গত বছরের আগস্টে আবেদন করে নয় হাজার ৬১৫ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এগুলোর মধ্যে দুই হাজার ৭৩০টি প্রতিষ্ঠানকে ২৩ অক্টোবর এমপিওভুক্তির ঘোষণা দেয়া হয়। এরমধ্যে ২০৪টি প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ বিবেচনায় এমপিও দেয়া হয়েছে। সেই হিসাবে সাত হাজার ১৫টি প্রতিষ্ঠানই অযোগ্য। তার মানে তথ্য যাচাইয়ের জন্য সময় পেয়েছে এক বছরেরও বেশি। যাচাই-বাছাই কমিটির প্রধান ছিলেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. জাবেদ আহমেদ।

নীতিমালা অনুযায়ী চার শর্ত পূরণকারী প্রতিষ্ঠানকে এমপিও দেয়া হয়েছে। শর্তগুলো হলো- প্রতিষ্ঠানের বয়স বা স্বীকৃতির মেয়াদ, শিক্ষার্থীর সংখ্যা, পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ও পাসের হার। প্রতিটি পয়েন্টে ২৫ করে নম্বর থাকে। কাম্য শিক্ষার্থী ও পরীক্ষার্থীর সংখ্যা এবং স্বীকৃতির বয়স পূরণ করলে শতভাগ নম্বর দেয়া হয়। সর্বনিম্ন ৭০ নম্বর পাওয়া প্রতিষ্ঠানও এমপিওভুক্তির জন্য বিবেচিত হয়েছে। এবার আবেদন করা প্রায় ৭২ শতাংশ প্রতিষ্ঠান যোগ্যতা ও শর্তপূরণ করতে না পারায় এমপিও পায়নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই অনলাইনে তথ্য দিয়েছে। কিন্তু এমপিও তালিকা প্রকাশে দেখা গেছে, তথ্য যাচাই হয়নি। এ কারণে প্রায় অর্ধশত অযোগ্য অথবা প্রায় অস্তিত্বহীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবার এমপিওভুক্ত হয়েছে। ভাড়া বাড়িতে পরিচালিত, শিক্ষার্থী নেই, পাস নেই, স্কুল ঘর নেই এবং সরকারি হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানও এমপিও পেয়েছে। এতে বোঝা যায় তালিকা যাচাই-বাছাই কতটা উদাসীনভাবে হয়েছে।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.