সম্প্রীতির যে শিক্ষা উপস্থাপন করেছেন বিশ্বনবী

মাহমুদ আহমদঃ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উগ্রতা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ প্রতিটি ধর্মই শান্তি, সম্প্রীতি আর ভালোবাসার শিক্ষা দেয়। কোনো ধর্মই অশান্তির শিক্ষা দেয় না। বিশেষ করে ইসলাম এমন একটি শান্তিপ্রিয় ধর্ম, যেখানে সবার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। ইসলাম ধর্মে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের কোনো স্থান নেই। সামাজিক পরিমণ্ডলে যারা বিশৃংখলা পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে, রক্তপাত ঘটায়, ধ্বংসযজ্ঞ এবং নৈতিকতা বর্জিত কর্মকাণ্ড চালায়, তারা কখনো শান্তিপ্রিয় এ ধর্মের অনুসারী হতে পারে না।

পবিত্র কুরআনের সুরা আল বাকারার ২৫৬ নং আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘ধর্মের ব্যাপারে কোনো বল প্রয়োগ নেই। কারণ সৎ পথ ও ভ্রান্তি উভয়ের মধ্যে পার্থক্য সুস্পষ্ট হয়ে গেছে; সুতরাং যে ব্যক্তি তাগুতকে (পুণ্যের পথে বাধা সৃষ্টিকারী বিদ্রোহী শক্তিকে) অস্বীকার করে এবং আল্লাহর ওপর ঈমান আনে, সে নিশ্চয়ই এমন এক সুদৃঢ় হাতল ধরেছে, যা কখনো ভাঙবার নয়।’

ধর্ম কখনো অশান্তি ও রক্তপাতের উদ্দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কেউ কোনো ধর্ম গ্রহণ বা বর্জন করলে এর জন্য দুনিয়াতে কোনো মানুষকে শাস্তি প্রদানের সুযোগ নেই। শাস্তি দেয়ার মালিক হচ্ছেন একমাত্র আল্লাহ তায়ালা। হজরত নূহ (আ.) তার সমসাময়িক লোকদেরকে ধর্ম ও পুণ্যের দিকে আহ্বান করেন। তিনি কখনো কারও প্রতি অত্যাচার করেন নাই। নূহের বাণী শুনে লোকজন বলেছিল, ‘হে নূহ! যদি তুমি এই ধর্ম হতে বিরত না হও এবং তোমার চালচলন পরিবর্তন না করো, তবে নিশ্চয়ই তোমাকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করা হবে’ (সূরা শোয়ারা: রুকু ৬)।

হজরত ইব্রাহীম (আ.) শান্তি, প্রেম, সহানুভূতি ও গাম্ভীর্যের সাথে মানুষজনকে সত্যের পথে আহ্বান করেন। তার হাতে তো কোনো তরবারি ছিল না, ছিল না জুলুম করার কোনো উপকরণ। তার জাতির লোকজন তাকে বললো, ‘যদি তুমি তোমার বিশ্বাস ও প্রচার পরিত্যাগ করো, তাহলে ভালো কথা, নচেৎ তোমাকে আমরা প্রস্তরাঘাতে হত্যা করে ফেলবো’ (সূরা মারইয়াম: রুকু ৩)। অনুরূপ, হজরত লুত (আ.) ও হজরত শোয়েব (আ.) এর প্রতিও তাদের বিরুদ্ধবাদীগণ একই নীতি অবলম্বন করেছিল। লক্ষ্যণীয় নবীগণের একজনও বিরুদ্ধবাদীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি।

শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য রাসুল করিম (সা.) মুহাজের, আনসার ও ইহুদীদের মধ্যে চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন এবং সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন যেন বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। মুসলমানদেরকে পরস্পর ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ করার পর রাসুল করিম (সা.) মদিনাবাসী সবার মধ্যেই একটি চুক্তি সম্পাদন করলেন। তিনি ইহুদি ও আরব নেতাদেরকে সমবেত করলেন এবং তাদেরকে বললেন, ‘এখানে তো এর আগে মাত্র দু’টি জনগোষ্ঠী ছিল, কিন্তু এখন হয়েছে তিনটি। অর্থাৎ, এখানে ইতোপূর্বে ইহুদি ও মদিনার আরবরা বাস করতো। কিন্তু এখন ইহুদি, মদিনার আরব এবং মক্কা থেকে আগত মুহাজের, এই তিনটি জনগোষ্ঠী বাস করছে। এ জন্য সবার মধ্যে একটি শান্তি চুক্তি থাকা আবশ্যক হয়ে পড়েছে’। কাজেই সেই লক্ষ্যে পরস্পর সমঝোতার মাধ্যমে একটি চুক্তিপত্র তৈরি করা হলো।’

এই চুক্তিপত্রে বার বার যে বিষয়ে জোর দেয়া হয়েছে তা হচ্ছে, বিশ্বস্ততা ও সততাকে কিছুতেই হস্তচ্যুত হতে দেয়া যাবে না এবং জালেম তার নিজের জুলুমের দায়িত্ব নিজেই বহন করবে। এই চুক্তি থেকে এটা পরিস্কার হয়ে উঠেছে যে, রাসুল করিম (সা.) এর পক্ষ থেকে এই ফয়সালা হয়েছে যে, ইহুদিদের এবং মদীনার অমুসলিম অধিবাসীদের সঙ্গে সম্প্রীতি ও সহমর্মিতা সৃষ্টি হবে এবং তাদেরকে নিজ ভাইয়ের মতই রাখা হবে। কাজেই পরবতীর্কালে ইহুদিদের সাথে যেসব কলহবিবাদ হয়েছিল, তার দায়দায়িত্ব এককভাবে ইহুদিদেরই ছিল।

এই চুক্তির মাধ্যমে মহানবী (সা.) প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় দেন। ধমীর্য় ও সামাজিক জীবনে এর প্রভাবও কম ছিল না। হিজরতের পর দ্বিধাবিভক্ত মদিনাবাসীদের আত্মকলহে তিনি ব্যথিত হন এবং জরাজীর্ণ সমাজকে নতুন আদর্শে গঠন করার জন্য এই সনদ জারি করেন। এই চুক্তির প্রয়োজনীয়তা ছিল বিবিধ। প্রথমত, শতধা বিভক্ত মদিনাবাদীদের গৃহযুদ্ধ বন্ধ করে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা, দ্বিতীয়ত, জাতি-ধর্ম-বর্ণ, নির্বিশেষে সব মুসলমান ও ইহুদি নাগরিকদের সমান অধিকার ও কর্তব্য নির্ধারণ করা। তৃতীয়ত, স্বদেশত্যাগী মোহাজেরীনদের মদীনায় বাসস্থান ও জীবিকা উপার্জনের ব্যবস্থা করা। চতুর্থত, মুসলমান ও অমুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে মৈত্রী, সদ্ভাব ও পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে বন্ধুত্ব ও প্রীতিময় সম্পর্ক গড়ে তোলা। পঞ্চমত, মদিনায় ইসলামের ধমীর্য় ক্ষমতা বৃদ্ধি করে সার্বজনীন ধর্মপ্রচারের ব্যবস্থা করা।

বিশ্বাসের স্বাধীনতা হচ্ছে সব মানুষের মৌলিক অধিকার। ইসলাম ধর্মের বিধান মতে ‘ধর্ম’ হচ্ছে নিজ, পছন্দের একটি বিষয়। এটি এক সুস্পষ্ট ধর্ম। এ ধর্ম গ্রহণের পরও চাইলে কেউ এটা ত্যাগ করতে পারে। তাতে কোনো বাধা নেই। তবে এর বিচার সর্বশক্তিমান আল্লাহ নিজ হাতেই করেন। ধর্মে যদি বল প্রয়োগের বিধান থাকতো, তাহলে মক্কা বিজয়ের পর হজরত রাসুল করিম (সা.) অমুসলমানদেরকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করতেন এবং মক্কায় বসবাসে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতেন। কিন্তু তিনি তা করেন নাই! এতে প্রমাণিত হয় যে, ধর্মের খাতিরে বল প্রয়োগ ইসলামের কোনো শিক্ষা নয়।

ইসলাম সব ধর্ম এবং সব ধমীর্য় উপাসনালয়কে শ্রদ্ধা ও সম্মানের সাথে দেখার নির্দেশ দেয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘আল্লাহ যদি এই সব মানুষের একদলকে অন্যদল দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তাহলে সাধুসান্নাসীগণের মঠ, গীর্জা, ইহুদিদের উপাসনালয় এবং মসজিদ সমূহ, যেখানে আল্লাহর নাম অধিক স্মরণ করা হয়, তা অবশ্যই ধ্বংস করে দেয়া হতো’ (সূরা হজ্জ, আয়াত: ৩৯)। হাদিসে উল্লেখ আছে, হজরত নবী করিম (সা.) বলেছেন ‘যে ব্যক্তি বিধর্মী কোনো জিম্মিকে হত্যা করে, সে জান্নাতের ঘ্রাণ পাবে না। এই ঘ্রাণ তো এত তীব্র যে, চল্লিশ বছরের দূরত্বে থেকে তা উপলব্ধি করা যায়’ (বুখারী, কিতাবুল জিযিয়া)।

হাদিসে আছে, মুসলিম দেশে বসবাসকারী বিধমীর্দের সম্বন্ধে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, যদি কোনো মুসলমান এদেরকে হত্যা করে, তাহলে সে কখনও জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এই হাদিস দ্বারা হজরত রাসুল করিম (সা.) মুসলিম ও অমুসলিমের জান ও মালের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ করেননি। আরেক জায়গায় তিনি (সা.) বলেন, ‘ভিন্নধমীর্দের ধনসম্পদ আমাদেরই ধনসম্পদের মত এবং তাদের রক্ত আমাদের রক্তের মতই মূল্যবান।’ এখানেও আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, অমুসলিমদের সব ধরনের স্বাধীনতা আছে। তাদের জান, মাল ও ধমীর্য় উপাসনালয়ের সব কিছুই মুসলমানদের জান, মাল ও ধর্মীয় উপাসনালয়ের মতো শ্রদ্ধাষ্পদ।

হজরত মুহাম্মদ (সা.) তার জীবন দ্বারা একথা প্রমাণ করে গিয়েছেন, ধর্মের নামে কোনো অন্যায় অবিচার নেই। সব ধর্মের সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ ও তাদের ধমীর্য় উপাসনালয়গুলো শ্রদ্ধার বস্তু। মহানবী (সা.) এর শিক্ষাগুলোকে আজ আমাদের জীবনে বাস্তবায়ন করার সময় এসেছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) সমাজের সর্বক্ষেত্রে এবং সব জাতির মাঝে শান্তি, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন। ধর্মীয় সম্প্রীতির যে শিক্ষা উপস্থাপন করেছেন বিশ্বনবী (সা.) তা অতুলনীয়।

খৃষ্টানদের নাগরিক ও ধমীর্য় অধিকারকেও তিনি নিশ্চিত করেছেন এবং কেয়ামত পর্যন্ত যেন তা বলবৎ থাকে, সে ব্যবস্থাও করেছেন। খৃষ্টানদের নাগরিক ও ধমীর্য় অধিকার নিশ্চিতকারী মহানবী (সা.) প্রদত্ত ৬২৮ খ্রিষ্টাব্দের ঘোষণাপত্র: এটি মোহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ (সা.) প্রণীত কাছের এবং দূরের খ্রিষ্টীয় মতবাদ পোষণকারী প্রত্যেকের জন্য ঘোষণা পত্র: আমরা এদের সাথে আছি। নিশ্চয়ই আমি নিজে আমার সেবকবৃন্দ মদিনার আনসার এবং আমার অনুসারীরা এদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছি। কেননা, খৃষ্টানরা আমাদের দেশেরই নাগরিক আর আল্লাহর কসম! যা কিছুই এদের অসন্তুষ্টি ও ক্ষতির কারণ হয়, তার আমি ঘোর বিরোধী। এদের প্রতি বলপ্রয়োগ করা যাবে না, এদের বিচারকদেরকে তাদের দায়িত্ব থেকে অপসারণ করা যাবে না আর এদের ধর্মযাজকদেরকেও এদের আশ্রয়স্থল থেকে সরানো যাবে না। কেউ এদের উপাসনালয় ধ্বংস বা এর ক্ষতিসাধন করতে পারবে না। কেউ যদি এর সামান্য অংশও আত্মসাৎ করে সেক্ষেত্রে সে আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গকারী এবং তার রাসুলের অবাধ্য সাব্যস্ত হবে। নিশ্চয়ই এরা (অর্থাৎ খৃষ্টানরা) আমার মিত্র এবং এরা যেসব বিষয়ে শঙ্কিত, সেসব বিষয়ে আমার পক্ষ থেকে এদের জন্য রয়েছে পূর্ণ নিরাপত্তা। কেউ এদেরকে জোর করে বাড়ি ছাড়া করতে পারবে না অথবা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতেও এদেরকে বাধ্য করা যাবে না। বরং মুসলমানরা এদের জন্য যুদ্ধ করবে। কোনো খৃষ্টান মেয়ে যদি কোন মুসলমানের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়, সেক্ষেত্রে তার (অর্থাৎ সে মেয়ের) অনুমোদন ছাড়া এটি সম্পাদিত হতে পারবে না। তাকে তার গির্জায় গিয়ে উপাসনা করতে বাধা দেয়া যাবে না। এদের গির্জাগুলোর পবিত্রতা অবশ্যই রক্ষা করতে হবে। এগুলোর সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে বাধা দেয়া যাবে না। আর এদের ধমীর্য় অনুশাসনগুলোর পবিত্রতাহানী করা যাবে না। এ উম্মতের কোনো সদস্য এ ঘোষণাপত্র কিয়ামত দিবস পর্যন্ত লঙ্ঘন করতে পারবে না। (অগ্রপথিক সীরাতুন্নবী (সা.) ১৪১৬ হিজরী, ১০ বর্ষ, ৮ সংখ্যা, ইসলামী ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ-এর প্রকাশনা, ১ম সংস্করণ, আগষ্ট ১৯৯৫)।

অন্য ধর্মের প্রতি মর্যাদাবোধ ও তাদের উপসনালয় ও সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের যে দৃষ্টান্ত হজরত রাসুল করিম (সা.) দেখিয়েছেন, তা তার সীরাতের উজ্জলতম অধ্যায়। তাই আমাদের দায়িত্ব, নিজ দেশে অবস্থানকারী সকল অমুসলিম ভাইদের জান-মাল যেন নিজেদের জান-মাল মনে করে রক্ষা করি ও সিরাতে নববি (সা.) এর শিক্ষাগুলোকে যেন নিজেদের মধ্যে বাস্তবায়িত করি।

ইসলাম ধর্ম মুসলমানকে গুপ্তহত্যা, ধ্বংসযজ্ঞ এবং ন্যাক্কারজনক কার্যকলাপ করা থেকে বিরত থাকতে সব সময়ই নিষেধ করেছে। ইসলামের আদর্শ হলো শত্রুর সাথেও বন্ধুসুলভ আচরণের দৃষ্টান্ত স্থাপন করা।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের আনুগত্য ও বশ্যতা স্বীকার করে নেয়া যে জীবনাদর্শের লক্ষ্য, তারই নাম ইসলাম। জীবনের প্রতিক্ষেত্রে, প্রতিস্তরে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের বিধিনিষেধ পালন করা, তার সন্তুষ্টি অন্বেষণ করা এবং এ লক্ষ্যে নিজেকে বিলীন করে দেয়ার নামই ইসলাম।

সমাজ ও রাষ্ট্রকে অশান্তি, জুলুম ও বিশৃঙ্খলামুক্ত করার নির্দেশ ইসলামে রয়েছে বলেই ইসলাম শান্তির ধর্ম। মানুষ যদি শান্তি পেতে চায়, তাহলে তার নিজের ইচ্ছেমতো জীবনযাপন না করে আল্লাহর দেয়া বিধান মেনে চলতে হবে। তাই আল্লাহ তার প্রেরিত বিধানের নাম রেখেছেন ইসলাম।

লেখক: কলামিস্ট

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০২/০২/২৩     


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.