বর্তমানে আমাদের দেশে ৪৪টি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলের অনুমোদন রয়েছে। বর্তমানে দেশের প্রতিটি স্যাটেলাইট চ্যানেল বিনোদন, সংবাদ, খেলাধুলা, সিনেমা, মিউজিকসহ অনেক অনুষ্ঠান পরিবেশন করে থাকে ।
যার ফলে প্রতিটি চ্যানেলেই কমপক্ষে ১ থেকে ২ হাজার জনবল কর্মরত রয়েছে । যা বেশির ভাগ টিভি চ্যানেলের পক্ষে পরিচালনা খরচ বহন করা সম্ভব হচ্ছে না । এছাড়া আরও ১৪৫টি টিভি চ্যানেল অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে, এ সকল চ্যানেল অনুমোদন পেলে অনেক স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলই হুমকির সম্মুখীন হয়ে বন্ধ হয়েছে যেতে পারে । আবার আমাদের দেশের অনেক গ্রাহকই দেশিয় চ্যানেলের অনুষ্ঠান সমুহ উপভোগ করেন না, ভারতীয়সহ অন্যান্য দেশের টিভি চ্যানেলের প্রতি আগ্রহ বেশি ।
অপর দিকে দেশিয চ্যানেল সমুহ বিদেশে ডাউনলিংক হয় না বললেই চলে। আমাদের দেশে একটি বিদেশি চ্যানেল যদি ডাউনলিশংক করা হয় সেক্ষেত্রে সরকারকে মাত্র বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫০ হাজার টাকা প্রদান করতে হয়, যার ফলে যে কোন দেশের টিভি চ্যানেল আমাদের দেশে অতি সহজেই ডাউনলিংক করতে পারে ও তাদের দেশিয় সকল বিজ্ঞাপনসহ অনুষ্ঠান পরিবেশন করে ।
অপরদিকে শুধু ভারতে বিদেশি চ্যানেল ডাউন লিংক করতে ভারতীয় ৫ কোটি রুপী অর্থাৎ বাংলাদেশী প্রায় ৬ কোটি টাকার প্রয়োজন হয়, যা আমাদের দেশিয় কোন স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলের পক্ষে অনুষ্ঠান প্রচারসহ বিজ্ঞাপন প্রচার করা সম্ভব হয় না ।
এছাড়া ভারত, পাকিস্থানসহ অনেক দেশই নিজের বিজ্ঞাপন নিজ দেশে ও বর্হিবিশ্বে প্রচার করার জন্য বিদেশি অনুষ্ঠানের জন্য পৃথক স্যাটেলাইট চ্যানেল চালু করেছে, উদাহরন স্বরুপ বলা যায় পাকিস্থান ভারতীয় হিন্দি সিনেমার চ্যানেলের পরিবর্তে পাকিস্থানে বেশ কয়েকটি হিন্দি সিনেমার চ্যানেল চালু করেছে, একই ভাবে তারা ইংরেজী, চাইনিজ সিনেমার জন্য পৃথক টিভি চ্যানেলসহ বিভিন্ন বিদেশি গানের জন্য পৃথক মিউজিক চ্যানেল চালু করেছে ।
যার ফলে নিজ দেশসহ বিদেশে চ্যানেল সমুহ ডাউনলিংক করিয়ে তাদের দেশিয় বিজ্ঞাপন প্রচার করতে সক্ষম হয়েছে, এছাড়া অনেক চ্যানেলের ক্ষেত্রেই ২০ জন থেকে ৫০জন জনবল দিয়ে পরিচালনায় সম্ভব হচ্ছে।
তাই বর্তমানে প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে আমাদের দেশের স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল স্থাপন আইন আরও সহজতর করে ২৫টি ক্যাটাগরিতে ভাগ করতে হবে । প্রতিটি স্যাটেলাইট চ্যানেলকে অনুমোদন পাওয়ার পর একই লাইসেন্সের অধীনে অনলাইন, ওয়েভ ও আইপি ভিত্তিক প্রচারের সুযোগ প্রদান করা প্রয়োজন ।
এছাড়া স্যাটেলাইট চ্যানেল সমুহকে ক্যাটাগরি ভিত্তিক পৃথক পৃথক জামানত ফি, লাইসেন্স ফি ও নবায়ন ফি প্রদানের সুযোগ প্রদান করতে হবে । যা নি¤েœ কিছু প্রস্তাব আকারে পেশ করা হলোঃ
ক্যাটাগরি-১ ঃ সংবাদ, সম্পাদকীয়, স্ক্রলে সংবাদ প্রকাশ, অনুসন্ধান মুলক রিপোর্ট, টক শো, অর্থনীতি, ক্রীড়া । ক্যাটাগরি-২ ঃ সংবাদ, স্ক্রলে সংবাদ প্রকাশ, টক শো, অর্থনীতি, ক্রীড়া, বিনোদন (নাটক, ধারাবাহিক, সিনেমা, ম্যাগাজিন, মিউজিক) । ক্যাটাগরি-৩ ক্রীড়া। ক্যাটাগরি-৪ ঃ বিনোদন, ক্রাইম নাটক, প্রতিযোগীতামুলক । ক্যাটাগরি-৫ ঃ বিনোদন, প্রতিযোগীতামুলক । ক্যাটাগরি-৬ ঃ বিনোদন। ক্যাটাগরি-৭ ঃ লাইফ ষ্টাইল। ক্যাটাগরি-৮ঃ বিদেশি ভাষার সিরিয়াল, নাটক। ক্যাটাগরি -৯ ঃ বিদেশি ভাষার সিনেমা । ক্যাটাগরি-১০ ঃ বাংলায় ডাবিংকৃত বিদেশি সিরিয়াল, নাটক। ক্যাটাগরি-১১ ঃ বাংলায় ডাবিংকৃত বিদেশি সিনেমা । ক্যাটাগরি-১২ ঃ ভারতীয় বাংলা সিরিয়াল, নাটক। ক্যাটাগরি-১৩ ঃ বাংলায় ডাবিংকৃত শিশুতোষ চ্যানেল। ক্যাটাগরি-১৪ ঃ দেশিয় শিশুতোষ চ্যানেল। ক্যাটাগরি-১৫ ঃ ভারতীয় বাংলা গান । ক্যাটাগরি-১৬ ঃ ভারতীয় বাংলা ছায়াছবির গান। ক্যাটাগরি-১৭ ঃ ভারতীয় বাংলা ছায়াছবি । ক্যাটাগরি-১৮ ঃ দেশিয় গান। ক্যাটাগরি-১৯ ঃ দেশিয় ছায়াছবির গান। ক্যাটাগরি-২০ ঃ দেশিয় ছায়াছবি। ক্যাটাগরি-১ এর সর্বোচ্চ জামানত ফি-১,০০,০০,০০০.০০টাকা, লাইসেন্স ফি-৫০,০০,০০০.০০টাকা ও নবায়ন ফি-১০,০০,০০০.০০টাকা ও ক্যাটাগরি-২০ ঃ এর সর্বনি¤œ জামানত ফি-১০,০০,০০০.০০টাকা, লাইসেন্স ফি-৫,০০,০০০.০০টাকা ও নবায়ন ফি-১,০০,০০০.০০টাকা নির্ধারণ করা যেতে পারে । অন্যান্য ক্যাটাগরি সমুহের জামানত ফি, লাইসেন্স ফি ও নবায়ন ফি অনুপাতিক হারে নির্ধারণ করার প্রয়োজন হবে।
ক্যাটাগরি-২১ থেকে ক্যাটাগরি-২৫ পর্যন্ত চ্যানেলকে কমিউনিটি ভিত্তিক স্যাটেলাইট টেলিভিশন হিসাবে গন্য করা যেতে পারে । এসব চ্যানেল তার ব্যয়ভার পরিচালনার জন্য মোট অনুষ্ঠানের সর্বোচ্চ ১০ ভাগ বিজ্ঞাপন প্রচার করতে পারবে ।
ক্যাটাগরি-২১ ঃ ক্ষুদ্র নৃ গোষ্টি সমুহের নিজস্ব ভাষার। ক্যাটাগরি-২২ ঃ দেশিয় প্রকৃতি ও পর্যটন। ক্যাটাগরি-২৩ ঃ কর্মসংস্থান। ক্যাটাগরি-২৪ ঃ কৃষি ভিত্তিক । ক্যাটাগরি- ঃ শিক্ষা ও ধর্মীয় শিক্ষা (কলেজ, বোর্ড, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক পরিচালিত)। ক্যাটাগরি-২১ এর সর্বোচ্চ জামানত ফি-৮,০০,০০০.০০টাকা টাকা, লাইসেন্স ফি-১,০০,০০০.০০টাকা ও নবায়ন ফি-৫০,০০০.০০টাকা ও ক্যাটাগরি-২৫ এর সর্বনি¤œ জামানত ফি-১,০০,০০০.০০টাকা টাকা, লাইসেন্স ফি-২০,০০০.০০টাকা ও নবায়ন ফি-১০,০০০.০০টাকা নির্ধারণ করা যেতে পারে । অন্যান্য ক্যাটাগরি সমুহের জামানত ফি, লাইসেন্স ফি ও নবায়ন ফি অনুপাতিক হারে নির্ধারণ করার প্রয়োজন হবে। স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল অনুমোদনের জন্য একটি পৃথক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করতে হবে । সেখানে টিভি চ্যানেল আবেদন করার ১ মাস থেকে ৬ মাসের মধ্যে অনুমোদনের ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে । ক্যাটাগরি-৩ থেকে ক্যাটাগরি-২৫ পর্যন্ত স্যাটেলাইট টিভি চ্য্যনেলের অনুমোদন সর্বোচ্চ এক মাসের মধ্যে প্রদানের ব্যবস্থা রাখতে হবে ।
সেন্সর বোর্ডকে পুর্নগঠন করে দেশিয় ছায়াছবি, মিউজিক ভিডিও, শিশুতোষ (কার্টুন), সিরিয়াল ও নাটক, বিদেশি ভাষার ছায়াছবি, সিরিয়াল ও নাটক, বাংলায় ডাবিংকৃত ছায়াছবি, সিরিয়াল, শিশুতোষ অনুষ্ঠান ও নাটক, বিজ্ঞাপনের জন্য পৃথক ইউনিট গঠন করতে হবে ।
সেন্সর বিহীন অনুষ্ঠান ও বিজ্ঞাপন স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচার করা যাবেনা । এছাড়া ক্যাটাগরি-১ ও ২ ব্যতীত কোন স্যাটেলাইট চ্যানেল সংবাদ, স্ক্রলে সংবাদ, টক শো পরিবেশন করতে পারবে না, যার ফলে সংবাদের মানবৃদ্ধিসহ অনেক অরাজকতা ও ভুয়া সাংবাদিকতা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হবে।
বিটিভিকে পুর্নগঠন করা প্রয়োজন, চীন থেকে ঋণ গ্রহন করে বিটিভিকে এলাকা ভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসাবে প্রতিষ্ঠা না করে পিটিভি ও দুরদর্শনের ন্যায় পৃথক পৃথক চ্যানেল চালু করতে হবে । যেমনঃ বিটিভি সিনেমা, স্পোটর্স, মিউজিক, মুভি মিউজিক, শিক্ষা, ইংরেজী নিউজ, সংবাদ, হিন্দি মুভি, ইংরেজী মুভি, মিউজিক, হিন্দি মিউজিক, হিন্দি মুভি মিউজিক, ভারতীয় বাংলা সিনেমা নামে কমপক্ষে ৩০-৪০টি বানিজ্যিক ও লাভজনক স্যাটেলাইট চ্যানেল পরিচালনা করা সম্ভব হবে ।
প্রতিটি চ্যানেলের জন্য একজন উপ-পরিচালক পদমর্যাদার কর্মকর্তা নিয়োগ প্রদান করা যেতে পারে। দেশিয় সংস্কৃতি বিকাশের জন্য বিটিভির আর্কাইভে সংরক্ষিত অনুষ্ঠান সমুহ সম্পুর্ন বিনা খরচে দেশে বিদ্যমান স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল সমুহকে সরবরাহ করার ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে এবং ক্যাটাগরি অনুসারে সকল স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল সমুহ তাদের মোট প্রচার সময় ১০ ভাগ সময় বিটিভির আর্কাইভে সংরক্ষিত অনুষ্ঠান সমুহ প্রচার করবে ।
দেশে যদি ক্যাটাগরি ভিত্তিক স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল প্রতিষ্ঠান করা যায় তবে আকাশ সংস্কৃতির এই যুগে বিদেশি চ্যানেল সমুহের আগ্রাসন থেকে দেশকে মুক্ত করা সম্ভব হবে ও দেশে প্রচারিত সকল টেলিভিশন চ্যানেল থেকে জামানত ফি, লাইসেন্স ফি, নবায়ন ফি ও বিজ্ঞাপনের ১৫ ভাগ ভ্যাট থেকে প্রচুর অর্থ দেশের অর্থনীতিকে বেগবানসহ বিশ্বে বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও বিজ্ঞাপন প্রচার সম্ভব হবে।
লেখক-
প্রকৌশলী রিপন কুমার দাস,
কলাম লেখক ও ট্রেড ইন্সট্রাক্টর,
ডোনাভান মাধ্যমিক বিদ্যালয়,
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
