মোফাচ্ছের হোসাইন।।
মানুষই জীব জগতের একমাত্র প্রজাতি যার জ্ঞান অর্জন করে এবং সে জ্ঞান বংশানুক্রমে হস্তান্তরিত করে। এভাবেই গড়ে উঠেছে মানব সভ্যতা। বংশ পরম্পরায় জ্ঞান ও সভ্যতা সংস্কৃতি যাঁরা হস্তান্তর করে তাঁরাই হলেন শিক্ষক। সুতরাং সকল সভ্য দেশে শিক্ষকেরাই সমাজে সর্বাধিক মর্যাদা ও অধিকার পেয়ে থাকেন। কিন্তু আমাদের ব্যাপারটি হল ঠিক তার উল্টো;চিকিৎসা, ইঞ্জিনিয়ারিং, কৃষি, ওকালতি ইত্যাদির ন্যায় শিক্ষকতা ও একটি পেশা। এই পেশায় নিয়োজিত হওয়ার পূর্বে মানুষ সাধারণত দুটো দিক থেকে অনুপ্রাণিত হয়(ক) একটি চাকরি বা অর্থনৈতিক প্রবণতা (খ) অন্যটি আদর্শিক বা ভাবপ্রবণতার দিক।
প্রথমটির মাধ্যমে তিনি চান অর্থ সম্পদ যার দ্বারা সাংসারিক জীবনে একদিকে যেমন সুখ ও সমৃদ্ধি লাভ করা যায় অন্যদিকে তেমনি তার সৎ ব্যবহারের দ্বারা জীবনে সম্মান, গৌরব ও প্রতিষ্ঠা অর্জন করা যায়।দ্বিতীয়টি দ্বারা তিনি চান সেবা ও আত্মনিয়োগ। যারা দ্বিতীয়টি দ্বারা অনুপ্রানিত হন তাঁরা পার্থিব সুখ সমৃদ্ধির দিকে আর্থিক মনোযোগী নন। ফলে উৎসর্গীকৃত জীবন যাপনে তারা আত্মপ্রসাদ লাভ করেন। প্রকৃত আদর্শ শিক্ষক হতে হলে চাই আত্মোৎসর্গী প্রেরণা।
সমাজ ও রাষ্ট্র জীবনে যাপনে একজন নাগরিক যে সকল গুণের অধিকারী হবে একজন শিক্ষকের সেইসব গুনাবলী অবশ্যই থাকতে হবে। শিক্ষকতাকর্মের পরিধি শিক্ষার্থী তথা ভবিষ্যৎ সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে পরিব্যাপ্ত তার কর্মক্ষেত্রে ক্রমবর্ধিষ্ণু মানবশিশুর সর্বাঙ্গীন বিকাশের দায়িত্ব অর্জিত হয় শিক্ষকের উপর। শিক্ষক শিক্ষার্থীকে যে বিষয়বস্তু শিখান শিক্ষার্থী তাই শিখে এবং ক্রমান্বয়ে শিক্ষকের জীবনাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হয়।
এই পেশায় নিযুক্ত ব্যক্তির কতগুলো গুনাবলী থাকা অত্যাবশ্যক। USA এর Dr. FL Cleff ১৯৯৩ খৃী: শিক্ষকের ১০টি গুনের কথা উল্লেখ করেন। যেমন আচরনদক্ষতা, ব্যক্তিগত চেহারা, আশাবাদীতা, গাম্ভীর্য, উৎসাহ, মানসিক সততা, আন্তরিকতা, সহানুভূতি, জীবনীশক্তি, বিদ্যাবত্তা। এছাড়া Prof. Bagly and Keith আরও ৩টি গুনের উল্লেখ করেছেন, তাহলো কৌশল (Tact), সুমিষ্ট সুর ((Good Voice), নেতৃত্বের কৌশল (Capacity for Leadership), Prof Bossing আরও ২টি গুণের কথা উল্লেখ করেছেন যেমন রহস্য প্রিয়তা (ঝবহংব ড়ভ যঁসধঁৎ) শিক্ষার্থীর প্রতি বন্ধুভাব।
একজন শিক্ষার্থীর চাহিদা প্রয়োজন, মনমানসিকতা, পরিবেশ, পরিস্থিতি প্রচেষ্টা গ্রহন, ক্ষমতা, আচার-আচরণ, অতীত ইতিহাস প্রভৃতি বিষয়গুলোর প্রতি খেয়াল রেখে শিক্ষন শিখনের অনুকুল পরিবেশ সৃষ্টি করবেন।
স্বামী বিবেকানন্দের ভাষায় “তিনিই সুশিক্ষক যিনি শিক্ষার্থীদের স্তরে নেমে আসতে পারেন এবং তার নিজের আত্মার বাণী শিক্ষার্থীদের মর্মস্থলে পৌছে দিতে পারেন এবং তাদের অন্তরটিকে নিজের অন্তর দিয়ে লক্ষ্য করতে পারেন।পসিবল রেন বলিয়াছেন “শিক্ষক কেবলমাত্র খবরের উৎস বা ভান্ডার নহেন কিংবা প্রয়োজনীয় অপ্রয়োজনীয় খবর সরবরাহকারী ও নহেন, তিনি শিশুর বন্ধু, পরিচালক, বিজ্ঞ উপদেষ্টা, মনের বিকাশ সাধনকারী চরিত্রগঠনকারী ও বটে।
বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ বলিয়াছেন “গায়ের জোরে সব হওয়া যায় গুরু হওয়া যায় না গুরু হইতে গরিমা লাগে। এই গরিমা অর্জন করতে হইলে শিক্ষাদান পদ্ধতি ও শিক্ষাদান কৌশল অবশ্যই তাহার জানা থাকিতে হইবে।
শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষকদের ভূমিকা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষকেরা হচ্ছে যে কোন শিক্ষাব্যবস্থার প্রানকেন্দ্র এবং শিক্ষার মান, শিক্ষকের মান ও প্রচেষ্টার উপর নির্ভরশীল। তাই শিক্ষার সকল স্তরে উচ্চতর যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তিকে বাছাই করে নিতে না পারলে, তাদের মর্যাদায় প্রতিষ্টিত না করলে কোন কিছুই সফল হবে না।
দেশ জাতির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক নিবেদিত শিক্ষক সম্মানীয়, পুজনীয়, স্মরনীয় এবং চিরকাল হৃদয় সিংহাসনে বসিয়ে রাখার মত, গ্রহনীয়। এ ধরনের শিক্ষকদের কথা মাথাই রেখেই, তাদের স্মরণ বরন করার জন্য ইউনেস্কো এর উদ্যোগ প্রতি বছরের ৫ই অক্টোবরকে নির্ধারন করা হয়েছে আন্তর্জাতিক শিক্ষক দিবস হিসাবে।
পৃথিবীর সবদেশের সবসমাজের কাছে এ দিনটি অত্যন্ত গৌরব ও মর্যাদার। শিক্ষক দিবস পালনের ইতিহাস খুব বেশীদিন আগের নয়। ১৯৯৩ সালে গঠিত হয়Education International-EI নামক আন্তর্জাতিক শিক্ষক সংগঠন। ১৬৭টি দেশের ২১০টি জাতীয় সংগঠনের প্রায় তিন কোটি বিশ লাখ সদস্যদের প্রতিনিধিত্বকারী এ আন্তর্জাতিক সংগঠন আহবান জানায় শিক্ষক দিবস পালনের। এ আহবানের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৪ সালে ইউনেস্কোর ২৬তম অধিবেশনে গৃহীত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে তৎকালীন মহাপরিচালক ড; ফ্রেডারিক এম মেয়রের যুগান্তকারী ঘোষনার মাধ্যমে ১৯৯৫ সাল থেকে এ দিবসটি পালিত হয়ে আসছে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে।
শিক্ষা যদি হয় জাতির মেরুদন্ড তবে শিক্ষকেরা সে মেরুদন্ডের স্রষ্টা। গোটা মনুষ্য সমাজের মধ্যে নৈতিক বিচারে শিক্ষকদের চেয়ে সম্মানিত এবং শিক্ষকতার চেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পেশা আর কোথাও খুঁজে পাবে না কেউ।
সারা বিশ্বের মত বাংলাদেশেও শিক্ষকতা একটি মহান হিসেবে স্বীকৃত। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মানসম্মত শিক্ষা। বিভিন্ন পরীক্ষার ফলাফলে পাশের আর্ধিক্য গড়লেও গুনগত মান নিয়ে সংশয় রয়েছে। তাই মানসম্মত শিক্ষা দানের জন্য প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত ও দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষকদ্বারা সকল শিক্ষার্থীর শিক্ষাদান নিশ্চিত করতে হবে।
এ বছরের আন্তর্জাতিক শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয়টি ছিল খুবই তাৎপর্যমন্ডিত। Young Teachers: The future of the profession” তরুণ শিক্ষক; পেশাগত ভবিষ্যৎ সর্বোচ্চ মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আকর্ষন এবং তরুন প্রতিভাদের পেশাগত দক্ষতা আনয়ন এ বিষয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
১৯৪৮ সালের মানবাধিকারের ঘোষনাকে অক্ষুন্ন রাখার স্বার্থে মানসম্মত শিক্ষার জন্য শিক্ষক, ছাত্র, অভিভাবক, বিভিন্ন পেশার মানব ও সরকারের মধ্যে ঐক্য গড়ার মধ্যে দিয়ে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকেরা সমাজ, রাষ্ট্রের আলোকবর্তিকার মত কাজ করবে।
তবে আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষাক্রম পর্যাপ্ত সংখ্যক যোগ্য শিক্ষক প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষাদান সামগ্রী ও ভৌত কাঠামো যথাযথ শিক্ষন পদ্ধতি কার্যকর ব্যবস্থাপনা ও তত্ত¡বধান এবং গবেষনা ও উন্নয়নের স্বীকৃতি, সম্মানজনক বেতন পেশন, সামাজিক প্রাপ্তি ও চমৎকার কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
অভিষ্ট্য লক্ষ্যে পৌছার জন্য সকল স্তরে শিক্ষক সংকট দূর করতে হবে, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অনুপাত গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে আনতে হবে।
অতীতের যে কোন অবস্থার চেয়ে বর্তমান সরকার সবচেয়ে বেশি অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ ও এ বিষয়ে আন্তরিক। তাই সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ২৬ শে জুলাই শিক্ষার সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষকের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিতকরনে বিজ্ঞানী ড: কুদরাত এ খুদার নেতৃত্বে ১৮ জন বিশিষ্ট নানাবিধ ও শিক্ষা প্রসাশকদের নিয়ে খুদা কমিশন গঠন করেছিলেন।
বস্তুত “বর্তমান শিক্ষার নানাবিধ অভাব ও ত্রুটি-বিচ্যুতি দুরিকরন, শিক্ষার মাধ্যমে সুষ্ঠ জাতি গঠনের নির্দেশ দান এবং দেশকে আধুনিক জ্ঞান, ও কর্মশক্তিতে বলীয়ান করার পথ নির্দেশের উদ্দেশ্যেই সরকার এই কমিশন নিয়োগ করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য ১৫ই আগষ্ট ১৯৭৫ সালে ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়ে প্রতিক্রিয়াশীলরা রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে নেয়। স্বাধীনতা বিরোধীরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কে ধুলিষ্যাৎ করার ষড়যন্ত্রের মেতে উঠে। সুদীর্ঘ ২১ বছর পর তারই সুযোগ্য কন্যা, বিশ্ব মানবতার মহানেত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা অনেক লড়াই সংগ্রাম করে ১৯৯৬ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর জাতির জনকের স্বপ্নের কাজগুলো সমাপ্ত করার দৃঢ় ইচ্ছা পোষণ করন।
২০১০ সালে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কার্যক্রম শুরু করেন। প্রাথমিক শিক্ষাকে পরিপূর্ণ জাতীয়করণ করেছেন। মাধ্যমিক শিক্ষায় ও অনেক যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। বিশেষকরে যে সকল উপজেলায় সরকারি স্কুল নেই কলেজ নেই সেই সকল উপজেলায় প্রায় ৩০০টি স্কুল ও ২৯৯ টি কলেজ সদ্য সরকারিকরণ করেছেন। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাশরুম সহ অবকাঠমো এখন দৃষ্টি নন্দন।
২৬ হাজার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক লক্ষাধিক শিক্ষক জাতীয়করন করে শিক্ষকের মর্যাদা দিয়েছেন। ৬ হাজারের বেশী ননএমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিও প্রক্রিয়াধীন মাদ্রাসার স্নাতক (সম্মান) কোর্স চালু করেছেন। কওমী মাদ্রাসার আইনগত স্বীকৃতি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। সব বাধা বিপত্তি পিছনে ফেলে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে ইনশাল্লাহ। আন্তর্জাতিক শিক্ষক দিবসে বলতে চাই বঙ্গবন্ধু সোনারবাংলা গড়ার যে স্বপ্ন দেখেছেন এবং তারই সুযোগ্য কন্যা যেভাবে শিক্ষাকে সবারকাছে পৌছানোর ব্যবস্থা নিয়েছেন তার সফল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শিক্ষক সমাজ কার্যকরী প্রচেষ্টা চালাবেন। আর তখনই মানসম্মত, প্রযুক্তিগত গুনগত আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মানে সফলতা আসবে। আমরা দারুনভাবে আশাবাদী।
দেশে প্রাথমিক বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় ১০ লক্ষ। বিশাল এ শিক্ষিত জনগোষ্ঠী দেশের সম্পদ। ইউনেস্কো, আই,এল,ও ঘোষিত জিডিপির ৬ শতাংশ বাজেট বরাদ্দ আজ সময়ের দাবী। সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে নানান বৈষম্য বিরাজমান। শিক্ষকতা পেশায় তরুন মেধাবীদের আকৃষ্ট করার জন্য এ সমস্ত বৈষম্য দূর করা জরুরী।
আমরা দারুন ভাবে আশাবাদী মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শিক্ষাবান্ধব সরকার আগামীতে ক্ষমতায় আসবে।
অচিরেই প্রত্যাশিত সকল সমস্যার নিরসন হয়ে বাংলাদেশ কাংখিত লক্ষ্যে উপনীত হবে। আজ এ দিবসে শিশু কিশোরদের স্বপ্নবোনার কারিগরদের সবাইকে জানাই বিন¤্শ্রদ্ধা। আসুন আমাদের হৃদয়ের মনিকোঠায় ঠাই করে নেয়া শিক্ষকদের এ দিনে একটি শুভেচ্ছা বানী পাঠাই, দেখা করে আর্শীবাদ নিই, একাগুচ্ছ ফুল হাতে দিয়ে আসি।
এদিনে আমি শিরদাঁড় উচু করে কবি কাজী কাদের নেওয়াজের সঙ্গে সূর মিলিয়ে দৃঢ়চিত্তে বলতে চাই; “শিক্ষক আমি শ্রেষ্ঠ সবার, দিল্লির পতি সে তো কোন ছার। ভয় করি না’ক, ধারি না’ কো ধার, মনে আছে মোর বল। বাদশাহ শুধালে শাস্ত্রের কথা গুনাব অনর্গল। যায় যাবে প্রাণ তাহে, প্রাণের চেয়ে মান বড়, আমি বোঝাব শাহেনশাহে। ”
লেখক-
মোফাচ্ছের হোসাইন সহ:অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
ইস:ইতি ও সংস্কৃতি বিভাগ
সরকারি ইস্পাহানী কলেজ
ও
প্রাক্তন সদস্য, শিক্ষক কর্মচারী কল্যানট্রাষ্ট
শিক্ষা মন্ত্রনালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
