ব্যাংকে কমছে মুনাফার হার

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

ডিসেম্বরে গড় মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ; যেখানে ব্যাংকে ১০০ টাকা আমানত রেখে আমানতকারীরা গড় মুনাফা পেয়েছেন ৩ টাকা ৯৯ পয়সা। অর্থাৎ ৪ শতাংশের নিচে। পাশাপাশি সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে বিধিনিষেধ অর্থাৎ কর শনাক্তকারী নম্বর বা টিআইএন বাধ্যতামূলক করায় অনেকেই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করছেন না। এমনই পরিস্থিতিতে নিরুপায় হয়ে পড়েছেন সাধারণ আমানতকারীরা। এক দিকে সব পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে, অন্য দিকে কমে যাচ্ছে আয়। আয়ের সাথে ব্যয় সমন্বয় করতে না পেরে অনেকেই জীবনযাত্রার ব্যয়ে কাটছাঁট করছেন।

জানা গেছে, আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বলা হয়েছিল, তিন মাস মেয়াদি ও তদূর্ধ্ব আমানতের সুদহার মূল্যস্ফীতির নিচে নামবে না। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে সামগ্রিক আমানতের গড় সুদহার মূল্যস্ফীতি তো দূরের কথা, ব্যাংক রেটেরই নিচে নেমে গেছে। যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেঁধে দেয়া ন্যূনতম ব্যাংক রেট রয়েছে ৪ শতাংশ, সেখানে ডিসেম্বর শেষে গড় সুদহার নেমে গেছে ৩ দশমিক ৯৯ শতাংশে। এর মধ্যে ২৫ ব্যাংকের গড় সুদহার তলানিতে নেমে গেছে। অন্য দিকে ডিসেম্বরে গড় মূল্যস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরে ব্যাংকে রাখা টাকার ক্রয়-ক্ষমতা যতটুকু কমেছে সে পরিমাণ সুদও পাচ্ছেন না আমানতকারী। এতে লোকসানে পড়ছেন তারা। এর উপরে এক্সসাইজ ডিউটি (আবগারি শুল্ক) ও অন্যান্য চার্জের খড়গ তো আছেই। এমনি পরিস্থিতিতে সাধারণ গ্রাহকের আমানত পুঁজিবাজারসহ ঝুঁকিপূর্ণ খাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, মূল্যস্ফীতিতে নিচে নেমে আসায় প্রকৃতপক্ষে আমানতকারীরা ব্যাংকে অর্থ রেখে মূলধন হারাচ্ছেন। তারা বাড়তি মুনাফার আশায় ঝুঁকিপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ করলে অর্থনীতির জন্য মোটেও সুখকর হবে না।

ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, করোনার প্রভাবে ব্যাংকগুলো নতুন কোনো বিনিয়োগে যাচ্ছে না। যেটুকু বিনিয়োগ করা হচ্ছে তা প্রণোদনা কর্মসূচির মধ্যেই সীমিত রাখছে। আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা শিথিলতার কারণে গত প্রায় দুই বছর ব্যাংকগুলো ঋণও আদায় করতে পারেনি। অপর দিকে বাড়তি মুনাফা অর্জনের চাপ রয়েছে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ওপর। বাধ্য হয়ে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে বেশি মুনাফা অর্জনের জন্য আমানতকারীদের ওপরই হাত দিচ্ছে বেশির ভাগ ব্যাংক। ডিসেম্বর শেষে আমানতের গড় সুদহার ৩ দশমিক ৯৯ শতাংশে নেমে এসেছে। দেশের ইতিহাসে আর কখনো আমানতের সুদহার এত নিচে নামেনি। গত বছরের একই সময়ে সুদহার ছিল ৪ দশমিক ৬৪ শতাংশ। যেখানে মূল্যস্ফীতির হার (পয়েন্ট টু পয়েন্ট) গত ডিসেম্বরে ছিল ৬ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ আর গড়ে ছিল ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ।

সামগ্রিক পরিস্থিতির বিষয়ে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আমানতের সুদহার শুধু নিচে নেমেছে তাই নয়, মূল্যস্ফীতির থেকেও নিচে নেমে গেছে, যা খুবই বিপজ্জনক। এতে আমানতকারীরা ব্যাংক-বিমুখ হবেন, যা ব্যাংকিং খাতের জন্য ভালো নয়। আর মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ করে পুঁজি হারালে পুরো অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা বলছেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আমানতের সুদহার অনেক কম হলেও তাদের ওখানে বিভিন্ন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যাংকিং চলে। অর্থনীতি সচল রাখতে বিভিন্ন পথ (টুলস) তারা ব্যবহার করে। কিন্তু আমাদের এখানে সে ধরনের কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে এখানে আমানতের সুদহার কমে গেলে তাতে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। এ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে মানুষ বাড়িঘর কেনার মতো জায়গায় বিনিয়োগ করবে কেউ ব্যাংকে আমানত রাখবে না। এজন্য নতুন নতুন বিনিয়োগের জায়গা খুঁজে বের করার পরামর্শ তাদের।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.