এইমাত্র পাওয়া

মহাদূর্যোগের মুখোমুখি পৃথিবী

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশ খুব বেশি দায়ী নয়। অথচ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এ দেশটি। উন্নত দেশগুলো উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে ব্যাপক হারে শিল্পকারখানা গড়ে তুলছে পাল্লা দিয়ে। তাতে কার্বন নিঃসারণের মাত্রা বেড়ে গেছে যেমন, তেমনি আবার নিয়ন্ত্রণহীনভাবে সিএফসি গ্যাসের ব্যবহার বাড়িয়ে দিয়েছে। এসব গ্যাস নিঃসরণের কারণে পৃথিবীর ফিল্টার নামে খ্যাত ওজোনস্তর ক্রমশ পাতলা হয়ে ভূপৃষ্ঠ তপ্ত হচ্ছে। যার ফলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বৃদ্ধি পাচ্ছে বছর বছর। গ্রীষ্মে তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে যেমন, তেমনি শীতে তাপমাত্রা মাইনাসের কাছাকাছি চলে যাচ্ছে কোথাও কোথাও। শীতপ্রধান দেশগুলোও তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যার প্রভাবে হিমবাহের চাঁই গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে যেমন, তেমনি সমুদ্রের জলের উষ্ণতা বৃদ্ধি পেয়ে জলস্ফীতি হয়ে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো।

নেচার ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানা গেছে, আর্কটিক মহাসাগরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বরফ যুগেও দেখা গিয়েছিল। উল্লেখ্য, সমুদ্রজলের তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাও বৃদ্ধি পেতে থাকে। বিগত ৪০-১০০ বছরের মধ্যে দেখা গেছে গ্রিনল্যান্ডের তাপমাত্রা ১০-১২ ডিগ্রি বৃদ্ধি পেয়েছে। আরেকটি দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, ২০২০ সালের ফেব্র‚য়ারির শুরুতেই উত্তর মেরুর পূর্বাঞ্চলের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে, সেখানকার তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে রয়েছে বলে জানা গেছে। বর্তমানে যে হারে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসারণ হচ্ছে, তাতে ২০৩০ সালের মধ্যে গড় তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যাবে। আর সেটি হলেই পৃথিবী মহাদুর্যোগের মুখোমুখি পড়বে।
জর্জিয়া ইউনিভার্সিটির পরিবেশবিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এভাবে বরফগলা অব্যাহত থাকলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে দ্রুত। ফলে বিশ্বের নিম্নাঞ্চলগুলো প্লাবিত হবে ব্যাপকভাবে। সেই তালিকার মধ্যে রয়েছে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশের নামও।

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও শৈত্যপ্রবাহের ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন স্হানে প্রতিদিনই কোনো না কোনো ধরনের দুর্যোগ সংঘটিত হচ্ছে। সেটি হতে পারে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, খরা, বন্যা, সাইক্লোন, টর্নেডো, ভূমিকম্প ও নদীভাঙনসহ নানান দুর্যোগ। তার মধ্যে তাপমাত্রা বৃদ্ধিই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে তুলছে পৃথিবীকে। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততার কারণে। যার প্রমাণ আমরা বার কয়েক পেয়েছিও। সিডর, আইলা, বুলবুল, আম্ফান ও ইয়াসের তাণ্ডবলীলায় মারাত্মক দুর্যোগের শিকার হয়েছিল বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ। তবে পশ্চিমবঙ্গে ইয়াস ভয়ংকরভাবে আঘাত হানলেও সামান্য দিক পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ সেই যাত্রায় কিছুটা রক্ষা পেয়েছিল। তথাপি উপকূলীয় অঞ্চলে জলোচ্ছ্বাসের কারণে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতির খবর আমরা জানতে পেরেছি। এসব প্রাকৃতিক তাণ্ডব ঘটছে শুধু বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলেই, যার মূল কারণই হচ্ছে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসারণ। গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসারণের জন্য বিজ্ঞানীরা মানুষকেই দায়ী করেছেন। যার জন্যই মূলত বৈশ্বিক উষ্ণায়ন অব্যাহত রয়েছে আর পরিবর্তন ঘটছে জলবায়ুর, যা আমাদের কাছে জলবায়ু সংকট হিসেবে পরিচিত।

জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে ধারণা থাকা সত্ত্বেও উন্নত দেশগুলো গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসারণের জন্য তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি। শুধু কাগজ-কলমের মধ্যেই তাদের উদ্যোগ সীমাবদ্ধ রয়েছে। উন্নত দেশের কর্মকাণ্ডে সমগ্র পৃথিবী আজ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্হায় রয়েছে। সূত্রমতে জানা যায়, বর্তমানে বায়ুমণ্ডল কার্বন ডাইঅক্সাইডের ঘনত্ব প্রান্তসীমা ৩৫০ পিপিএম ছাড়িয়ে অত্যন্ত বিপজ্জনক ৩৯৮.৫৮ পিপিএম ঘনমাত্রায় পৌঁছে গেছে, যা পৃথিবীর অস্তিত্বের প্রতি মারাত্মক হুমকিই বলা যায়।

জাতিসংঘ কর্তৃক জলবায়ুবিষয়ক এবং বৈশ্বিক গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসারণ বন্ধে ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিওডি জেনেরোতে কনভেনশনের আয়োজন করা হয়। সেখানে গঠিত হয় ‘জলবায়ুবিষয়ক জাতিসংঘ কনভেনশন’ (ইউএনএফসিসিসি)। ঐ কনভেনশনে, ১৫০ দেশকে এই নতুন বিধান মেনে চলতে রাজি করানোর প্রচেষ্টা চালানো হয়। কার্বন ডাইঅক্সাইড ও অন্যান্য গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসারণ প্রশমনে বাধ্যতামূলক করতে প্রটোকল ঘোষণা করা হয়। মূলত ঐ সময় থেকেই সদস্য দেশগুলো প্রতি বছর মিলিত হওয়ার জন্য সম্মত হয় এবং প্রতি বছর মিলিত হচ্ছেও। কিন্তু কাজের কাজ তেমন কিছু হচ্ছে না। গাছের গোড়া কেটে জল ঢালার মতো দরিদ্র দেশকে কিছু অনুদানের ব্যবস্হা করা হচ্ছে শুধু।

জানা গেছে, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে এরই মধ্যে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেয়ে মানুষের জীবন ও জীবিকায় মারাত্মকভাবে প্রভাব ফেলেছে। যার কারণে বাধ্য হয়ে বাস্ত্তহারা হতে হচ্ছে বিশাল জনগোষ্ঠীকে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এরই মধ্যে প্রায় ৬০ লাখ বাংলাদেশি বাস্ত্তহারা হয়েছেন, আর তাদের অধিকাংশই এখন শহরমুখী হচ্ছেন। পরিবেশবিজ্ঞানীদের অভিমত, আর মাত্র ৪৫ সেন্টিমিটার সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পেলেই উপকূলীয় অঞ্চলের ১০ শতাংশ ভূমি জলে তলিয়ে যাবে। তবে এই অভিমত অপ্রতিষ্ঠিত হিসেবে ধরে নিচ্ছেন অন্য গবেষক দল। কারণ ইতিমধ্যে জানা গেছে, ডুবে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে এমন জায়গাগুলোতে ভারসাম্য বজায় থাকবে সমুদ্রে উচ্চমাত্রার পলির আগমনে। এরই মধ্যে তার কিছুটা প্রমাণও মিলেছে। যেমন : হাতিয়া অঞ্চলসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বিশাল আয়তনের চর জেগেছেও। 

অন্যদিকে ২০০৫ সালে ‘আইপিসিসি’ জানিয়েছে, ২০৫০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এক মিটার বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ২১ শতাংশ লবণাক্ত জলে সয়লাব হয়ে যাবে। নানা ধরনের তর্কবিতর্কের ফলে সর্বশেষ যা আমরা অবগত হয়েছি তা হচ্ছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশ মহাদুর্যোগের মুখোমুখি হবে, যা অবধারিত সত্য কথা। ফলে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার আরো কিছু দেশ বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে। সেই বিপর্যয় থেকে আদৌ উত্তরণ মিলবে কি না, তাতে সন্দিহান আমরা। যদি বিশ্ববিবেক জাগ্রত হয়, তাহলে আমরা এই মহাদুর্যোগ থেকে উত্তরণ পাব হয়তো। তাই বিশ্ববিবেকের কাছে আমাদের আর্জি, সময় থাকতে দ্রুত পদক্ষেপ নিন; কার্বন নিঃসারণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে জলবায়ু যুদ্ধে বাংলাদেশসহ ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে বিজয়ী করতে সাহাঘ্য করুন।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও কলামিস্ট।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.