৯ দিনে সংক্রমণ বেড়েছে ৪ গুণ

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে অব্যাহতভাবে বাড়ছে করোনা সংক্রমণ। বছর শুরু হওয়ার প্রথম দিন থেকে গতকাল রোববার পর্যন্ত ৯ দিনে করোনা সংক্রমণ বেড়েছে চার গুণের বেশি। গত ১ জানুয়ারি একদিনে সারা দেশে করোনা শনাক্ত হয়েছিল ৩৭০ জন। অপর দিকে গতকাল সারা দেশে করোনা শনাক্ত হয়েছে এক হাজার ৪৯১ জন। নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে গতকাল করোনা শনাক্তের হার ছিল ৬.৭৮ শতাংশ।

জানুয়ারির প্রথম দিন করোনা শনাক্তের হার ছিল ২.৪৩ শতাংশ। চলতি জানুয়ারি মাস শেষে একদিনে সংক্রমণ উঠে যেতে পারে কয়েক হাজার। সংক্রমণ অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় করোনার টিকা গ্রহণ না করা শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে না যাওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত ১২-১৮ বছর বয়সী সব শিক্ষার্থীর টিকা গ্রহণ নিশ্চিত করতে একটি নির্দেশনা পাঠিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর (মাউশি)। এতে বলা হয়, আগামী ১৫ জানুয়ারির মধ্যে প্রায় সব শিক্ষার্থীর টিকাদান কার্যক্রম শেষ হবে।

গতকাল রোববার মাউশির নির্দেশনায় বলা হয়, ১২-১৮ বছর বয়সী সব শিক্ষার্থীকে ১৫ জানুয়ারির মধ্যে কোভিড-১৯ প্রতিরোধে ভ্যাকসিন দেয়ার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর থেকে গত ৩০ ডিসেম্বর বিভিন্ন নির্দেশনা দেয়া হয়। রাষ্ট্রের এ গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রাধিকার কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নে নতুন করে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। মাউশির নির্দেশনা অনুসারে, ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী সব শিক্ষার্থী (নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত) ভ্যাকসিন গ্রহণ করবে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান ভ্যাকসিন গ্রহণের জন্য নির্ধারিত দিনে শিক্ষার্থীদের টিকা কেন্দ্রে উপস্থিতি নিশ্চিত করবেন।

একই সাথে শৃঙ্খলা রক্ষার্থে প্রয়োজনীয় শিক্ষককেও টিকা কেন্দ্রে পাঠানো হবে। নির্দেশনা অনুসারে, টিকা গ্রহণ ব্যতীত কোনো শিক্ষার্থী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শ্রেণিকার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। টিকা কার্যক্রম চলমান অবস্থায় সব মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অঞ্চল, জেলা শিক্ষা অফিস, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের সব কর্মকর্তা-কর্মচারী ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন ব্যতিরেকে কর্মস্থল ত্যাগ করতে পারবেন না। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক ও সিভিল সার্জনসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ও প্রয়োজনীয় সমন্বয় করে ভ্যাকসিনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন নিশ্চিতে সচেষ্ট থাকবেন।

নির্দেশনা অনুসারে, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার সব পরিচালক, সরকারি ও বেসরকারি কলেজের অধ্যক্ষ, সব অঞ্চলের উপপরিচালক, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, সব সরকারি ও বেসরকারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে এই নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। বেশি সংক্রামক ধরন ওমিক্রন : এ যাবৎকালের মধ্যে করোনাভাইরাসের সবচেয়ে বেশি সংক্রামক ধরনটি হলো ওমিক্রন। ব্রিটেনের বিজ্ঞানীরা (ডেইলি মেইলে প্রকাশিত) বলছেন, খুব বেশি সংক্রমণের অধিকারী হলেও নতুন এ ধরনে মৃত্যু হয়ে থাকে ডেল্টা ধরনের চেয়ে ১ শতাংশের কম। তারা বলছেন, করোনার আবির্ভাবের কারণে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের সংক্রমণের সমপরিমাণ মৃত্যু হতে পারে ওমিক্রন সংক্রমণে।

এটা সবার জানা যে, ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসে সর্দি ও জ্বর ছাড়া আর কিছু হয় না। মৃত্যুতো নেই বললেই চলে। কেবল যাদের অন্য আরো মারাত্মক রোগ রয়েছে সে ক্ষেত্রে মৃত্যু হতে পারে। এছাড়া ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসে কারো মৃত্যু হয় না। গতকাল সারা দেশে নমুনা পরীক্ষা করা হয় ২১ হাজার ৯৮০ জনের। গতকাল করোনায় মৃত্যু হয়েছে তিনজনের। করোনায় গতকাল প্রায় দেড় হাজার আক্রান্ত হলেও করোনা থেকে সুস্থ হওয়ার পরিমাণ কিন্তু অনেক কম। গতকাল দেশে করোনা থেকে সুস্থ হয়েছে ২১৭ জন।

করোনায় যে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে এর মধ্যে পুরুষ একজন এবং নারী দুইজন। সারা দেশে ২৮ হাজার ১০২ জনের মৃত্যু হলো করোনায়। মৃত্যু ও হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সংখ্যা একেবারেই কম হলেও ওমিক্রনে করোনাভাইরাসের অন্যান্য ধরনের মতোই লক্ষণ ও উপসর্গ প্রকাশ পেয়ে থাকে। মাথাব্যথা, জ্বর, শরীরে ক্লান্তি আসা, পুরো শরীর ব্যথা করা, গলা শুকিয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণগুলো ওমিক্রনে আক্রান্তদের মধ্যেও দেখা দিতে পারে। ওমিক্রনে মৃত্যু ও হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা কম হলেও করোনাভাইরাসের এই ধরনটিকে অবহেলা করার কোনো কারণ নেই। এখনো বাংলাদেশে করোনায় যারা আক্রান্ত হচ্ছেন তাদের সবারই একই ধরনের লক্ষণ উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। তাদের জিহ্বায় স্বাদ অথবা নাকের গন্ধও থাকছে না।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন : এ প্রসঙ্গে শেরেবাংলা নগরের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট যক্ষ্মা হাসপাতালের উপপরিচালক ডা: আয়শা খাতুন নয়া দিগন্তকে বলেছেন, ‘সম্প্রতি খুব দ্রুত করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার কারণে মনে করা হচ্ছে এসবই হচ্ছে ওমিক্রনের সংক্রমণে। ওমিক্রন ও ডেল্টার মধ্যে লক্ষণ-উপসর্গ প্রায় একই রকম হয়ে থাকে। ওমিক্রনে এমনিতেই আক্রান্তরা সুস্থ হয়ে যাচ্ছেন। এতে কারো মনে করার কোনো কারণ নেই যে, ওমিক্রনে তেমন কোনো ক্ষতি হবে না। শিশু ও বৃদ্ধরা কিন্তু ওমিক্রনে বেশ ঝুঁকিপুর্ণ। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে আগের মতোই স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে মেনে চলতে হবে। ওমিক্রন যেহেতু ডেল্টার চেয়ে বেশি সংক্রামক সে কারণে বাইরে বের হলে অথবা কোনো জনসমাবেশে গেলে অবশ্যই মাস্ক পরে যেতে হবে।

তিনি বলেন, কেউ যদি মনে করেন তিনি করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন অথবা হতে পারে তাহলে তার উচিত হবে বিলম্ব না করে পরীক্ষা করিয়ে নেয়া। এখনতো খুব অল্প সময়ের মধ্যে পরীক্ষার রেজাল্ট পাওয়া যাবে, সেজন্য দেরি করা উচিত হবে না।’ ডা: আয়শা খাতুন বলেন, ‘রোগী যদিও আগের চেয়ে অনেক বেশি, তবু হাসপাতালগুলোতে আগের মতো রোগী ভর্তি হচ্ছে না। যদিও প্রতিটি মৃত্যুই বেদনার; তবু বলতে পারি করোনা আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যু অনেক কমে গেছে।’ ডা: আয়শা জোর দিয়ে বলেন, ‘যারা করোনার টিকা নেননি তাদের উচিত বিলম্ব না করে রেজিস্ট্রেশন করে করোনার টিকা নিয়ে নেয়া।

কেউ যদি মনে করেন তিনি করোনায় আক্রান্ত তাহরে তার উচিত দ্রুত পরীক্ষা করিয়ে আইসোলেশনে (একাকী কোনো একটি ঘরে বাস করা) চলে যাওয়া।’ বিট্রেনে নতুন একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বুস্টার ডোজ দেয়া হলে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ওমিক্রন আক্রান্ত হাসপাতালে ভর্তি এড়িয়ে সুস্থ হয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের চিকিৎসকেরাও বলেছেন, আগে করোনার জন্য দুইটি টিকা নিয়ে নেয়া উচিত। যারা উপযুক্ত তাদের বুস্টার ডোজ নিয়ে নেয়া উচিত। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ২৪ জন ওমিক্রনে আক্রান্তকে শনাক্ত করা হয়েছে। উল্লেখ্য, ওমিক্রনে আক্রান্ত কিনা তা সাধারণ অ্যান্টিজেন টেস্ট বা আরটিপিসিআর টেস্টে ধরা পড়ে না।

জিনোম সিকোয়েন্স করলেওই তখন ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হচ্ছে। বাংলাদেশে সরকারিভাবে আইইডিসিআরই কেবল জিনোম সিকোয়েন্স করতে পারছে ওমিক্রনের। এ ছাড়া বেসরকারিভাবেও জিনোম সিকোয়েন্স করছে কিছু প্রতিষ্ঠান। করোনা সংক্রমণ বেড়ে চলেছে অব্যাহতভাবে : করোনা সম্পর্কে জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির একজন সদস্য নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, ওমিক্রন সাধারণত দেড় থেকে তিন দিনে দ্বিগুণ হয়ে থাকে। যেহেতু জানুয়ারির প্রথম দিন থেকে আজ পর্যন্ত (গতকাল রোববার) চার গুণের বেশি বেড়েছে তা হলে তাতে বলা চলে যে বাংলাদেশে সব করোনা আক্রান্তই ওমিক্রনে আক্রান্ত হচ্ছে না।

এখানে ডেল্টা ও ওমিক্রনের মিশ্রণ রয়েছে। হাসপাতালে তেমন ভর্তি না হলেও ধীরে ধীরে ভর্তির সংখ্যা বাড়ছে। করোনারভাইরাসের যে ওয়েবসাইটটিতে প্রতি সপ্তাহে করোনার জিনোম সিকোয়েন্সের রিপোর্ট পাওয়া যায় সেখানে দেখা যাচ্ছে যে, এশিয়ান দেশগুলোতে এখন পর্যন্ত ওমিক্রন ছড়িয়েছে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত। তবে তিনি জোর দেন মাস্ক ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার মধ্যে। তিনি দুঃখের সাথে বলেন, ওমিক্রন বাংলাদেশে চলে এসেছে তা সত্ত্বেও জনসমাগম কম হচ্ছে না।

একই সাথে নির্বাচনী সমাবেশও হচ্ছে। আবার সচিবালয়েও মিটিং হচ্ছে। সেখানে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে মিটিংগুলো হচ্ছে না। অন্তত মন্ত্রীরা যখন সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন, তখন বেশ ভিড়ই লক্ষ করা যায়। এখন পর্যন্ত গণপরিবহনে আগের মতোই যাত্রীতে ঠাসা দেখা যায়। এসব বন্ধ করতে হবে ওমিক্রনকে ঠেকাতে চাইলে।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.