মদীনা শহরের বিশেষ বৈশিষ্ট্য

মদীনা মুনাওয়ারা প্রত্যেক মুমিনের ভালোবাসার জায়গা, হৃদয়ের স্পন্দন। ঐশীবাণী অবতীর্ণ হওয়ার স্থান। পৃথিবীর সবচেয়ে কোলাহলমুক্ত শান্ত ও প্রশান্তির শহর, যে শহরে মুমিনহৃদয়ে আশ্চর্য এক ভাব উদয় হয়। অন্তরের মণিকোঠায় তরঙ্গ সৃষ্টি হয়।

 অদ্ভুত এক তন্ময়তা ছেয়ে যায় তার দেহজুড়ে। প্রিয় হাবিবের এই শহরকে আল্লাহ তাআলার ভূপৃষ্ঠের মধ্যে কত মর্যাদা দিয়েছেন! যে শহরে নবীজির পবিত্র কদম মোবারক পড়েছে, সে শহর মর্যাদাবান হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট। এ ছাড়া নবীজির পবিত্র জবানে এ শহরের বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে।

বরকতময় শহরঃ

প্রিয় নবী (সা.) এই শহরের জন্য বরকতের দোয়া করেছেন। এই দোয়া ছিল সবার জন্য, বিশেষ করে মদিনার ফলমূল, শস্য ইত্যাদির জন্য। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, মৌসুমের প্রথম ফল রাসুল (সা.)-কে দেওয়া হতো। তিনি তখন বলতেন, হে আল্লাহ! আমাদের মদিনায়, আমাদের ফলে (বা উৎপন্ন ফসলে), আমাদের মুদ্দ-এ ও আমাদের সা’-এ বরকত দান করুন, বরকতের ওপর বরকত দান করুন। অতঃপর তিনি ফলটি তাঁর কাছে উপস্থিত সবচেয়ে ছোট শিশুকে দিয়ে দিতেন। (মুসলিম, হাদিস : ৩২২৬)। 

নিরাপদ শহরঃ

প্রিয় নবী (সা.)-এর শহরকে আল্লাহ তাআলা নিরাপত্তার চাদরে আবৃত করেছেন। তাই এই শহরে কেউ চাইলেই কোনো ধরনের ফিতনা-ফ্যাসাদ করতে পারবে না। বিশেষ করে দাজ্জালের অনুপ্রবেশ থেকে আল্লাহ তাআলা এই শহরকে করেছেন সুরক্ষিত। বিভিন্ন ধরনের মহামারি থেকেও আল্লাহ তাআলা এই শহরকে মুক্ত রেখেছেন। এটা একমাত্র প্রিয় নবীর বরকত। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, দাজ্জাল মদিনার দিকে আসবে, তখন সে দেখতে পাবে ফেরেশতারা মদিনাকে পাহারা দিয়ে রেখেছেন। কাজেই দাজ্জাল ও প্লেগ মদিনার কাছে আসতে পারবে না, ইনশাআল্লাহ। (বুখারি, হাদিস : ৭৪৭৩)

পবিত্র শহরঃ

সোনার মদিনাকে আল্লাহ তাআলা পবিত্র বানিয়েছেন। তাই এখানে অন্যান্য শহরের মতো, যে কেউ যা চাইবে তা-ই করতে পারবে না। জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহানবী (সা.) বলেছেন, নিশ্চয়ই ইবরাহিম (আ.) মক্কার হারাম নির্ধারণ করেছেন আর আমি মাদিনাকে হারাম বলে ঘোষণা করছি—এর দুই প্রান্তের কঙ্করময় মাঠের মধ্যবর্তী অংশকে। অতএব, এখানকার কোনো কাঁটাযুক্ত গাছও কর্তন করা যাবে না এবং এখানকার জীবজন্তুও শিকার করা যাবে না। (মুসলিম, হাদিস : ৩২০৮)। 

অশুভপ্রত্যাশীদের জন্য ধ্বংসঃ

নবীর শহর ও তার বাসিন্দাদের জন্য কেউ যদি অশুভ কাজ করার ইচ্ছা করে কিংবা তাদের ব্যাপারে কোনো মন্দ পরিকল্পনা করে, আল্লাহ তাআলা তাদের ধ্বংস করে দেবেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি এখানকার (মদিনার) অধিবাসীদের ক্ষতিসাধনের ইচ্ছা করবে, আল্লাহ তাকে গলিয়ে ফেলবেন; যেমন লবণ পানিতে গলে যায়। (মুসলিম, হাদিস : ৩২৫০)

অন্য বর্ণনায় এসেছে, যে ব্যক্তিই মদিনাবাসীর ক্ষতিসাধনের ইচ্ছা করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে জাহান্নামের আগুনে এমনভাবে বিগলিত করবেন, যেভাবে আগুনের তাপে সিসা গলে যায় অথবা লবণ পানিতে তরল হয়ে যায়। (মুসলিম, হাদিস : ৩২১০)

মদিনায় মৃত্যুবরণঃ

ওই ব্যক্তির ভাগ্য কতই না ভালো, যার মৃত্যু হয়েছে নবীর শহরে। কারণ রাসুল (সা.)-এর শহরে মৃত্যু হয়েছে এমন ব্যক্তির জন্য বিশেষ ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে কেউ যদি মদিনায় মৃত্যুবরণ করতে পারে, সে যেন তা-ই করে। কারণ যে ব্যক্তি এখানে মারা যাবে, আমি তার পক্ষে সুপারিশ করব। (নাসাই, হাদিস : ১৯৭১)

মসজিদ-ই-নববীঃ

হাদিসে যে কয়টি মসজিদের ফজিলত বর্ণিত হয়েছে এর অন্যতম হচ্ছে মসজিদ-ই-নববী। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি নবী (সা.) থেকে বর্ণনা করেন যে তিনি বলেছেন, মসজিদুল হারাম, মসজিদুর রাসুল ও মসজিদুল আকসা (বায়তুল মাকদিস) এই তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোনো মসজিদের (সালাতের) উদ্দেশে সফর বাঁধা যাবে না (অর্থাৎ সফর করা যাবে না)। (বুখারি, হাদিস  : ১১৮)

ইসলামের প্রথম নির্মিত মসজিদ। মক্কা থেকে হিজরতের পর মহানবী (সা.) মদিনার অদূরে কুবা নামক স্থানে এই মসজিদ নির্মাণ করেন। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে কুবার অধিবাসী ও মসজিদ-ই-কুবার প্রশংসা করে বলেন, ‘যে মসজিদ প্রথম দিন থেকে তাকওয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত, সেখানে অবস্থান করা আপনার জন্য অধিক সংগত। সেখানে এমন কিছু লোক আছে, যারা পবিত্রতা পছন্দ করে। আর আল্লাহ পবিত্র ব্যক্তিদের ভালোবাসেন। ’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ১০৮)

হাদিসে এসেছে, নবী করিম (সা.) প্রতি শনিবার কুবা মসজিদে আসতেন, কখনো হেঁটে, কখনো আরোহণ করে। (বুখারি, হাদিস : ১১১৯)

অন্যত্র এসেছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, কুবা মসজিদে নামাজ আদায় করলে এক ওমরাহর সমপরিমাণ সওয়াব। (আহমদ, হাদিস : ১৫৯৮১)


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.