এইমাত্র পাওয়া

চবিতে অপরাধ করেও ‘পার পাচ্ছেন’ অপরাধীরা

নিজস্ব প্রতিনিধি।।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) অপরাধ করেও পার পেয়ে যাচ্ছেন অপরাধীরা। প্রশাসনের ওপর মহলে তদবির করে সংঘর্ষ ও হামলায় জড়িতরা শাস্তি মওকুফ করিয়ে নিচ্ছেন একের পর এক। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অতীতে অপরাধ করে শাস্তি মওকুফের মাধ্যমে পার পাওয়া শিক্ষার্থীরাই হত্যাকাণ্ড, ছুরিকাঘাত, চাঁদাবাজির মতো গুরুতর অপরাধে জড়িয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। গুরুতর অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার পরিবর্তে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মানবিক আচরণ করছেন বলেও অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।

এদিকে, এবারও বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম না মেনে ১২ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর শাস্তি প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নিয়মানুযায়ী কোনো অপরাধে জড়িতদের শাস্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব হেলথ, রেসিডেন্স অ্যান্ড ডিসিপ্লিনারি কমিটির সভায়। আবার শাস্তি মওকুফের সিদ্ধান্তও নেওয়ার এখতিয়ার এই কমিটির। কিন্তু ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের বিষয়ে কিছুই জানেন না এই কমিটির কেউই। এমনকী কোনো সভাও আহ্বান করা হয়নি এ বিষয়ে।

অভিযোগ রয়েছে, ব্যক্তিগত প্রয়োজনে জাপান সফরে যাওয়ার আগের দিনই ১৫ ডিসেম্বর অত্যন্ত গোপনে তড়িঘড়ি করেই এই ১২ ছাত্রলীগ নেতার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের চিঠি ইস্যু করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব হেলথ, রেসিডেন্স অ্যান্ড ডিসিপ্লিনারি কমিটির সদস্য সচিব ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. রবিউল হাসান ভূঁইয়া। ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হওয়ায় রবিউল হাসান ভূঁইয়া ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের এমন বিশেষ সুবিধা দিতে তৎপর বলেও অভিযোগ করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চবির একাধিক ছাত্র ও শিক্ষক।

গত ১৫ অক্টোবর ও ১৭ অক্টোবর দুই দফায় ধারালো অস্ত্র হাতে সংঘর্ষ ও হামলায় জড়ান ১২ ছাত্রলীগ নেতাকর্মী। এদের কাউকে ছয় মাস ও কাউকে এক বছর পর্যন্ত বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কিন্তু মাত্র দুই মাসের মাথায় গত ১৫ ডিসেম্বর এই ১২ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে বিভিন্ন বিভাগে চিঠি দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর। যদিও এই প্রত্যাহারের বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলছেন না প্রশাসনের কেউই। আবার বহিষ্কৃত অবস্থায়ও এই শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ জালাল হল ও শাহ আমানত হলসহ বিভিন্ন হলে অবস্থান করে আসছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে, প্রশাসন স্বীকার না করলেও এক শিক্ষার্থীর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের চিঠির অনুলিপি জাগো নিউজের হাতে এসেছে। ওই চিঠিতে আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের ২০১৯-২০২০ সেশনের শিক্ষার্থী মো. নাঈমকে সাজা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও হেলথ, রেসিডেন্স অ্যান্ড ডিসিপ্লিনারি কমিটির সদস্য সচিব ড. রবিউল হাসান ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে মানবিক দিক বিবেচনায় শাস্তি প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও ওই শিক্ষার্থীকে ছয় মাসের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছিল।

শাস্তি প্রত্যাহারের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়- ‘ক্ষমা চেয়ে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মানবিক দিক বিবেচনায় গত ১৭ অক্টোবর বহিষ্কার হওয়া শিক্ষার্থীর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হলো। এরপর থেকে স্বাভাবিক নিয়মে পরীক্ষা ও অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন। তবে ভবিষ্যতে বিভাগের অ্যাকাডেমিক বা পরীক্ষা কার্যক্রমে আপনি (বহিষ্কৃত শিক্ষার্থী) বা আপনার পক্ষের কেউ বিঘ্ন ঘটালে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো প্রকার শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে আপনার সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে, কোনো প্রকার কারণ দর্শানো ছাড়াই আপনার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

জানা গেছে, ১৫ অক্টোবর ও ১৭ অক্টোবর দুই দফায় সংঘর্ষে জড়ানোর পর নাঈমসহ ১২ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করে প্রশাসন। দুই পক্ষের অভিযোগ, সিসিটিভি ফুটেজ ও গোয়েন্দা তথ্য যাচাই-বাছাই করে এসব শিক্ষার্থীদের বহিষ্কার করা হয়। তাদের মধ্যে দুজনকে এক বছর করে ও বাকিদের ছয় মাসের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। বহিষ্কৃতরা চবি ছাত্রলীগের চুজ ফ্রেন্ডস উইদ কেয়ার (সিএফসি) ও সিক্সটি নাইন গ্রুপের সদস্য।

তাদের মধ্যে সিক্সটি নাইন গ্রুপের নেতাকর্মীরা হলেন- ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের মো. নাঈম, একই শিক্ষাবর্ষের বাংলা বিভাগের সাইফুল ইসলাম, রসায়ন বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের আশরাফুল আলম নায়েম, একই শিক্ষাবর্ষের পরিসংখ্যান বিভাগের আকিব জাভেদ, ইতিহাস বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের জুনায়েদ হোসেন জয় ও অর্থনীতি বিভাগের ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের ফরহাদ। তাদের মধ্যে আশরাফুল আলম নায়েমকে এক বছর ও বাকিদের ছয় মাসের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে।

আর সিএফসি গ্রুপের বহিষ্কৃতরা হলেন- আইন বিভাগের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের মির্জা খবির সাদাফ, একই বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের খালেদ মাসুদ, লোকপ্রশাসন বিভাগের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের অহিদুজ্জামান সরকার, সমাজতত্ত্ব বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের আরিফুল ইসলাম, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের তানজিল হোসেন ও আরবি বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের তৌহিদ ইসলাম। তাদের মধ্যে মির্জা খবির সাদাফকে এক বছর ও বাকিদের ছয় মাসের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে।

গ্রুপ দুটির মধ্যে সিএফসির নেতৃত্বে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি রেজাউল হক রুবেল এবং সিক্সটি নাইনের নেতৃত্বে সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন টিপু।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, বহিষ্কারাদেশ পাওয়া প্রায় সবাইকে শাস্তি প্রত্যাহার করে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে চিঠি দিয়েছে প্রশাসন। এসব চিঠি ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে পেয়েছে বিভাগগুলো। যদিও বিভাগ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জানাতে সম্মত হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও হেলথ, রেসিডেন্স অ্যান্ড ডিসিপ্লিনারি কমিটির সদস্য সচিব ড. রবিউল হাসান ভূঁইয়া দেশের বাইরে ছুটিতে থাকায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

জানতে চাইলে চবির ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক এস এম মনিরুল হাসান বলেন, ‘প্রক্টর অফিস হয়তো চিঠি দিতে পারে। বিষয়টি আমার জানা নেই।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের হেলথ, রেসিডেন্স অ্যান্ড ডিসিপ্লিনারি কমিটির সদস্য ড. মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের বিষয়ে আমি জানি না। এ বিষয়ে সভায় কোনো আলোচনা হয়নি। সভায় আলোচনা ছাড়া বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের কোনো নিয়ম আছে কি না আমার জানা নেই।’


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.