এইমাত্র পাওয়া

শিশুর সুরক্ষায় চাই যুগোপযোগী আইন

নিজস্ব প্রতিনিধি।।

আইন থাকা সত্ত্বেও বাড়ি থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান- সর্বত্রই শিশুর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। উচ্চ আদালতের রায়, শিশু আইনসহ নানা ধরনের রক্ষাকবচ থাকলেও এসবে অস্পষ্টতা ও দুর্বলতার কারণে তাদের প্রতি নিষ্ঠুরতার অবসান হয়নি। ফলে শিশুর সুরক্ষায় বিদ্যমান আইন সংশোধন করে তা যুগোপযোগী করা এখন সময়ের দাবি।

গতকাল শনিবার ‘শারীরিক ও মানসিক শাস্তি থেকে সুরক্ষা :শিশু আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী’ শীর্ষক ভার্চুয়াল গোলটেবিল বৈঠকে বক্তাদের বক্তব্যে এসব কথা উঠে আসে। যৌথভাবে এ বৈঠকের আয়োজন করে সমকাল, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) ও সেভ দ্য চিলড্রেন।

সমকালের উপদেষ্টা সম্পাদক আবু সাঈদ খানের সঞ্চালনায় বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. নিজামুল হক। আরও বক্তব্য দেন শিশুর প্রতি শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিরসন কোয়ালিশন আহ্বায়ক অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সমাজসেবা বিভাগ উপসচিব মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম চৌধুরী, ব্লাস্টের আইন উপদেষ্টা এস এম রেজাউল করিম, সেভ দ্য চিলড্রেন চাইল্ড রাইটস গভর্ন্যান্স অ্যান্ড চাইল্ড প্রোটেকশনের সেক্টর ডিরেক্টর আবদুল্লাহ আল মামুন, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মেখলা সরকার, অ্যাডভোকেট আরাফাত হোসেন খান, অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ আমিরুল হক প্রমুখ।

‘শিশুর প্রতি শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিরসনে আইনগত সুরক্ষা’ বিষয়ক খসড়া প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন ব্লাস্টের অ্যাডভোকেসি ও ক্যাপাসিটি বিল্ডিং উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম। তিনি জানান, বাংলাদেশে দুই থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রতি দশ শিশুর মধ্যে ছয়টি নিজ বাড়িতে শারীরিক ও মানসিক শাস্তির শিকার হয়। ২০১৪ সালে পরিচালিত ইউনিসেফের এক জরিপে এ তথ্য উঠে আসে। ওই জরিপ পরিচালনার আগের মাসে বাংলাদেশে এক থেকে ১৪ বছর বয়সী ৮৯ ভাগ শিশু শারীরিক ও মানসিক শাস্তির শিকার হয়েছিল। ২০১৮ সালে পরিচালিত ব্লাস্টের এক জরিপে বলা হয়, প্রায় ৭০ ভাগ পিতা-মাতা ও অভিভাবক শিশুকে শাস্তি দেওয়ায় সমর্থন করেন। বিশ্বব্যাপী পরিচালিত সব গবেষণাতেই শিশুকে শৃঙ্খলিত করার নামে যে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি দেওয়া হয়, তা শিশুর বিকাশে ও মানসিক স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

খসড়া প্রস্তাবনায় বলা হয়, শিশুর প্রতি নিষ্ঠুরতার দণ্ড হিসেবে বিদ্যমান শিশু আইন-২০১৩-এর ৭০ ধারায় উল্লেখ রয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি যদি তার হেফাজতে, দায়িত্বে বা পরিচর্যায় থাকা কোনো শিশুকে আঘাত, উৎপীড়ন, অবহেলা, বর্জন, অরক্ষিত অবস্থায় পরিত্যাগ, ব্যক্তিগত পরিচর্যার কাজে ব্যবহার বা অশালীনভাবে প্রদর্শন করে এবং এভাবে আঘাত, উৎপীড়ন, অবহেলা, বর্জন, পরিত্যাগ ব্যক্তিগত পরিচর্যা বা প্রদর্শনের ফলে ওই শিশুর অহেতুক দুর্ভোগ সৃষ্টি হয় বা স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়, যাতে সংশ্নিষ্ট শিশুর দৃষ্টিশক্তি বা শ্রবণশক্তি নষ্ট হয়, শরীরের কোনো অঙ্গ বা ইন্দ্রিয়ের ক্ষতি হয় বা কোনো মানসিক বিকৃতি ঘটে, তাহলে তিনি এই আইনের অধীন অপরাধ করেছেন বলে গণ্য হবে।’

তবে ৭০ ধারায় ‘শারীরিক ও মানসিক শাস্তির বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। এ পরিপ্রেক্ষিতে ব্লাস্ট ও ‘শিশুর প্রতি শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিরসনে কোয়ালিশন’ অংশীজনদের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে পরামর্শ করে শিশু আইন-২০১৩-এর একটি খসড়া সংশোধনী প্রস্তাবনা প্রস্তুত করেছে। এই খসড়া সংশোধনী প্রস্তাবনায় শিশুর শারীরিক ও মানসিক শাস্তি প্রদানের সংজ্ঞা এবং অপরাধের গুরুত্ব অনুসারে লঘু ও গুরু শাস্তির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, শাস্তি হিসেবে সমাজকল্যাণমূলক সেবা প্রদান করার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাই শিশুর প্রতি শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিরসন-সংক্রান্ত খসড়া বিধানাবলি মূল আইনে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

বৈঠকে আইনগত পরিবর্তন ও সংশোধনের উদ্যোগ প্রসঙ্গে রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘আইন করে সুরক্ষা দিয়েও লাভ হয় না, যদি কিনা সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে বিষয়টা গ্রহণ করা না হয়। নিজেদের মধ্যে এ বিষয়ে উপলব্ধি সৃষ্টি করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, আমরা তো বেড়েই উঠেছি শাসনব্যবস্থার মধ্য দিয়ে। সেটা পরিবার ও স্কুল উভয় ক্ষেত্রে। স্কুলে তো শাস্তির নানা ধরন ছিল। আঙুলের মধ্যে পেনসিল ঢুকিয়ে মোচড় দেওয়া থেকে শুরু করে হাঁটু গেড়ে দাঁড়ানো। এখন সময় এসেছে পরিবর্তনের। আমরা যদি সেই সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক জায়গায় না বদলায়, তাহলে আইনের সংশোধন কোনো কাজে লাগবে না।

আবু সাঈদ খান বলেন, ‘শিশুর প্রতি নির্যাতন নিত্যদিনের ঘটনা। ঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থানে শিশুরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। নির্যাতন প্রতিরোধে আইন থাকলেও যথেষ্ট প্রয়োগ নেই। আইনও পর্যাপ্ত নয়।’ তিনি বলেন, শিশুর জন্য সুশৃঙ্খল জীবন দরকার। তবে শৃঙ্খলিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বা তাদের স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া এখন সময়ের দাবি। তাই সনাতনী ধ্যান-ধারণা ত্যাগ করে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে শিশুর মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

মো. নিজামুল হক বলেন, জন্ম থেকে দেখে এসেছি, শিশুকে বিভিন্নভাবে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি দেওয়া হয়। ভয়ভীতি দেখানো হয়। বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের ভালো করার নামে মানসিক নির্যাতনও করা হয়। এসব শিশুরাই ভবিষ্যতে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তাই সুস্থ ও সুন্দর সমাজ নির্মাণে শিশুর বিকাশ জরুরি। শিশুর প্রতি সব ধরনের শাস্তি নিরসনে শক্তভাবে এ বিষয়ে ‘ক্যাম্পেইন’ করতে হবে। বিশেষ করে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলতে হবে।

আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, আধুনিক বিশ্বে প্রযুক্তি ও মানসিক স্বাস্থ্যবিজ্ঞান যেভাবে এগিয়েছে, তাতে শিশুকে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি দিয়ে সুদূরপ্রসারী মঙ্গল হয় না। হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে কোনো কথা তাদের দিয়ে মানিয়ে নেওয়া যাবে। তিনি আরও বলেন, শাস্তি থেকে সুরক্ষা পাওয়া শিশুর মৌলিক অধিকার। বর্তমানে ৬৩টি দেশ শিশুর প্রতি শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ করে আইন করেছে। বাংলাদেশ এ তালিকায় নেই। অথচ ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে পা দেবে। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের সংজ্ঞায় শুধু মাথাপিছু আয় নয়, সামাজিক সূচকের বিষয়ও রয়েছে। তাই সামাজিক সূচকেও পরিবর্তন আনতে হবে বাংলাদেশকে।

এস এম রেজাউল করিম বলেন, শিশুদের রক্ষণাবেক্ষণ ও নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদেরই। ২০১৩ সালের শিশু আইনের ৭০ ধারায় শিশুর প্রতি শারীরিক ও মানসিক শাস্তির বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে বলা হয়নি।

কামরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, শিশুর প্রতি সকল প্রকার নির্যাতন বন্ধ করতে হলে শুধু আইন প্রয়োগই নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে অঙ্গীকার করতে হবে।

সমাপনী বক্তব্যে কাজী ফারুক আহমেদ বলেন, ছেলেমেয়েরা স্কুলে হোক, বাড়িতে হোক- কিছু ভুল করতে পারে। প্রচলিত নিয়মের কিছু বিচ্যুতি তারা ঘটাতে পারে। তাদের নিয়মানুবর্তী করতে আমরা কিছু বিকল্প ভাবতে পারি। মনোবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন রকম বিকল্পের কথা বলেছেন। সেই সঙ্গে আমাদের মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে। অভিভাবকদেরও বদলাতে হবে। শিক্ষক সংগঠনেরও অনেক কিছু করার আছে। তিনি আরও বলেন, আইনের অপপ্রয়োগ যেন হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

শিশুর শাস্তি নিষিদ্ধ করে ২০১১ সালে উচ্চ আদালত রায় দিয়েছেন। একই বছর শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় আদেশ জারি করেছে। ২০১৩ সালের শিশু আইনও করা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত শিশুদের প্রতি এ ধরনের নিষ্ঠুরতার অবসান হয়নি। বিশিষ্টজন মনে করেন, শারীরিক ও মানসিক শাস্তির বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকায় এবং শাস্তির উপাদানগুলো আইনে অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় এ-সংক্রান্ত ঘটনা প্রতিরোধে আইনগত পদক্ষেপ নিতে নানাবিধ প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.