অনলাইন ডেস্ক।।
হঠাৎ করোনার আবির্ভাবে যেন থমকে গিয়েছিল বিশ্ব। দেশের সব খাতে পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব। থমকে গেছে শিক্ষা ব্যবস্থা। ১৮ মাসব্যাপী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। যদিও সেপ্টেম্বর মাসের ১২ তারিখে সীমিত পরিসরে স্কুল-কলেজ খুলে দেওয়া হয়েছে, কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সশরীরে পরীক্ষা নেওয়া শুরু হলেও তা খোলার সিদ্ধান্ত নিয়ে রয়ে গেছে ধোঁয়াশা, সবকিছু মিলিয়ে অনিশ্চিয়তায়, হতাশায় লাখো শিক্ষার্থী। চরম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। শিক্ষার্থীদের মাঝে পুনরায় সেই গতি ফিরিয়ে আনতে এবং শিক্ষার ক্ষতি পূরণ করতে কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়, তা নিয়ে শিক্ষকদের মতামত তুলে ধরেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও লেখক মুমতা হেনা মীম।
করোনা মহামারিতে বিশ্বের উন্নত, উন্নয়নশীল ও অনুন্নত সব দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এ ক্ষতি বিশ্বকে বেশ কিছুদিন বহন করতে হবে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিক্ষা খাত। ছাত্র-ছাত্রীরা একদিকে যেমন শিক্ষা গ্রহণ থেকে পিছিয়ে গেছে, অন্যদিকে মানসিকভাবেও বিপর্যস্ত। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে অনেক ক্ষেত্রেই তা দ্রুত পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে বলে আমার বিশ্বাস।
প্রায় দীর্ঘ দুই বছর করোনা মহামারির কারণে সব শিক্ষার্থী পড়াশোনা থেকে বিরত আছে এটা পুরোপুরি সঠিক না। আমাদের দেশে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা অনলাইনে নিয়মিত ক্লাস/পরীক্ষা গ্রহণ করেছেন। এতে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত অংশগ্রহণ করেছেন। অনলাইন ক্লাসে শিক্ষকরা শতকরা একশত ভাগ শিক্ষার্থীদের গ্রহণযোগ্যতা না পেলেও শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকরা এর মাধ্যমে শিক্ষা নিয়ে একজন আরেকজনের সাথে যোগাযোগ এবং মিথস্ক্রিয়া ঘটাতে পেরেছে। আবার অনলাইনের মাধ্যমে তারা অনেক কিছু নতুন নতুন বিষয়ে জ্ঞানও অর্জন করেছে। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সব বিভাগেই অনলাইন ক্লাস গ্রহণ করা হয়েছে। অনলাইনে পরীক্ষা গ্রহণও চলছে।
আবার অনেক প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষার্থীরা এই অনলাইন প্রক্রিয়ায় অংশ গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারেনি। করোনা বন্ধের ক্ষতি পোষাতে শিক্ষকরা যদি অতিরিক্ত ক্লাস গ্রহণ ও নির্ধারিত কিছু ছুটি বাতিল করা যায়, তাহলে দ্রুতই সেশনজট কমানো যাবে। আমরা সেটি মাথায় রাখবো। অমার মনে হয়, করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের মাঝের দূরত্ব দ্রুতই ঠিক হয়ে যাবে। শিক্ষায় গতিও ফিরে আসবে।
করোনা মহামারির বিরূপ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে এবং পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়; সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কিছু কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আগামী তিন মাস/ছয় মাসের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণমূলক কর্মকাণ্ড পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি করতে হবে। করোনার কারণে মানসিকভাবে ভেঙে পড়া শিক্ষার্থীদের সাথে শিক্ষক, পরিবারের সদস্য, বন্ধু-বান্ধব সবার ভালো ব্যবহার করা প্রয়োজন। এরপরও যদি সমস্যা হয়, তখন সাইকোলজিক্যাল কাউন্সিলিং করা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একটি কাউন্সিলং ডেস্ক থাকলে তা ভালো হবে।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং শিক্ষার্থীদের ইচ্ছা থাকলে এই পরিস্থিতি থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাওয়া সম্ভব। তবে সে ক্ষেত্রেও একটু সময় লাগবে, রাতারাতি কোনো কিছুই সম্ভব না। উভয় পক্ষকে বাস্তবতা বুঝতে হবে এবং তা মেনে নিয়ে সামনে এগোতে হবে। অনলাইন ক্লাস পরীক্ষায় আমরা অভ্যস্ত ছিলাম না, এটা ঠিক। কিন্তু যখন সারা বিশ্ব করোনার কারণে স্থবির, তখন এই অনলাইন প্রক্রিয়া আমাদের শিক্ষার্থীদের মাঝে কিছুটা হলেও আলো দেখিয়েছে। এতে হয়তো আশানুরূপ লাভ হয়নি, তবে একেবারে বন্ধ থাকার চেয়ে অনেক ভালো হয়েছে। সরাসরি পরীক্ষা নিলে তেমন বেশি ক্ষতি হবে বলে আমি মনে করি না। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের এই দুঃসময় বয়ে বেড়ানোর কোনো কারণ নেই। ইতোমধ্যেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়/শিক্ষা সংক্রান্ত বিভিন্ন অরগান কাজ করেছে। তবে কিছু সময়তো লাগবেই। আমার মনে হয় আমরা সবাই যেন ভালোর দিকে তাকাই।
অধ্যাপক ড. শেখ আবদুস সালাম, উপাচার্য, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
করোনার নেতিবাচক প্রভাবের কারণে শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীব্যাপী সব খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। শিক্ষা খাতেও যে প্রভাবটি পড়েছে, সেই প্রভাবের মূল কয়েকটি জায়গা আছে তার মধ্যে একটি হলো শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আরেকটি হলো শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবর্ষ এবং নিয়মিত লেখাপড়ার যে বিচ্ছেদ ঘটেছে, এই অনিয়মিত লেখাপড়ার কারণে শিক্ষার্থীদের সেশনজটের একটা সম্মুখ সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এই সেশনজটকে কমানোর জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সবার সমন্বিত উদ্যোগে এই সেশনজট উত্তরণের চেষ্টা করতে হবে। আরেকটি শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রভাব পড়েছে সেটা হলো সমসাময়িক এবং বিজ্ঞান-তথ্য ও প্রযুক্তিগত শিক্ষার ক্ষেত্রেই যে ধারাবাহিকতা সেখানেও কিছুটা বাধার সৃষ্টি হয়েছে।
করোনাকালীন সময়ে যদি কোনো শিক্ষার্থী মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে বা করোনার নেতিবাচক প্রভাবের কারণে প্রভাবিত হয়, সেই জায়গা থেকে শিক্ষার্থীদের মানসিক উন্নয়ন ঘটানোর জন্য অবশ্যই সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে উদ্যোগ নিতে হবে। সেইসঙ্গে যেই শিক্ষার্থী মানসিকভাবে নেতিবাচক প্রভাবে প্রভাবিত হয়েছে, তাকেও এগিয়ে আসতে হবে। শুধু এক দিক থেকে সম্ভব নয়। যৌথভাবে মানসিকভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়া শিক্ষার্থীদের মানসিক উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব।
করোনাকালে অনলাইন ক্লাস শিক্ষার্থীদের কাছে আদৌ গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে কিনা সে নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু একটা কথা মনে রাখতে হবে যে, অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থা করোনাকালীন নেতিবাচক প্রভাবের কারণেই গ্রহণ করতে হয়েছে। আমরা তো এ যাবৎকালে শারীরিক উপস্থিতিতে ক্লাসে উপস্থিত হয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করেছি, কিন্তু যেহেতু করোনাকালীন সময়ে নেতিবাচক প্রভাবের কারণে বিকল্প পথ হিসেবে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে শিক্ষাদান হয়েছে, সেহেতু সেই জায়গাগুলোকে সামলে রেখেই সমন্বয় করেই কিন্তু আমাদের এই করোনাকালীন অবস্থায় শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। সেদিক থেকে শিক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্ট সবারই সে বিষয়টি চিন্তাভাবনায় আছে। সেই চিন্তাভাবনার আলোকেই কিন্তু এই শিক্ষা কার্যক্রম যাতে গতিশীল থাকে, স্থবির হয়ে না পড়ে সেজন্যই তো বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে নেওয়া হয়েছে।
এখানে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে যে শিক্ষা কার্যক্রম যাতে গতিশীল থাকে। স্থবির হয়ে না যায়। করোনা কোভিড-১৯ এর এই অবস্থা একটি বিষয়ে আমাদেরকে অভিজ্ঞতা দিয়ে গেলো, সেটা হলো যে আমাদের এ যাবৎকালের গতানুগতিক স্বাভাবিক যে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হতো, সেটি একেবারে সম্পূর্ণরূপে বাধাগ্রস্ত হয়ে গেছে, শিক্ষা কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়ার অবস্থা। সেই পরিস্থিতিতে আমরা বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থাকে গতিশীল রাখার চেষ্টা করেছি। এজন্য আমাদের শিক্ষার্থীদের এবং শিক্ষক-কর্মকর্তা এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট সবাইকে এই মানসিক প্রস্তুতি রাখতে হবে যেকোনো কারণে স্বাভাবিক শিক্ষা ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হলে বিকল্প উপায়ে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রেখে শিক্ষাকে গতিশীল রাখা এবং শিক্ষা কার্যক্রমকে চালিয়ে নেওয়া যায়।
করোনাকালীন সময়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ব্যবস্থায় যে ক্ষতি হয়েছে ,বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং শিক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্ট সবার যৌথ প্রচেষ্টায় এই ক্ষতি পূরণ সম্ভব বলে আমি মনে করি। তবে রাতারাতি এ সমস্যার উত্তরণ হবে না। কারণ দীর্ঘ আঠারো মাস ব্যাপী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ আছে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে পাঠদান বন্ধ আছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্ট যারা আছেন, তারা চেষ্টা করলে এই সমাধান করা সম্ভব। তবে, কিছুটা সময় দিতে হবে, গুরুত্ব দিতে হবে।
অধ্যাপক ড. ছাদেকুল আরেফিন মাতিন, উপাচার্য, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
কোভিড-১৯ অতিমারির বিস্তৃতি ঠেকাতে বাংলাদেশে ১৭ মার্চ ২০২০ সাল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। নিঃসন্দেহে এই অতিমারিতে শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষতি ইতোমধ্যেই হয়ে গেছে। এই ক্ষতির গুণগত এবং পরিমাণগত প্রভাব সুদূরপ্রসারী হবে তা আমরা সবাই অনুমান করতে পারি। ২০২০ সালেই ইউনেস্কো দেখিয়েছে যে বাংলাদেশে ৬০ শতাংশ ছাত্রছাত্রী কোভিড-১৯ অতিমারির বিভিন্নমুখী প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষারত ছাত্রছাত্রীদের উপর চালিত একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে তারা বিভিন্ন ধরনের যে সব ক্ষতির মুখোমুখি তা চিহ্নিত করেছে এভাবে- ১. বন্ধুবান্ধব ও আত্বীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ না করতে পারায় সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে; ২. খণ্ডকালীন চাকরি বা টিউশন হারিয়ে আর্থিক দুরবস্থায় রয়েছে উল্লেখযোগ্য ছাত্রছাত্রী; ৩. ক্রমাগত হতাশা, উৎকণ্ঠা এবং একঘেয়েমি তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করেছে; ৪. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় নিজেদের শিক্ষাগত সনদ অর্জন এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবন সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন রয়েছে ৪র্থ বর্ষ ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ছাত্রছাত্রীরা।
৫. অনলাইন পাঠদান চালু হলেও একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ছাত্রছাত্রী এতে অংশগ্রহণ করতে পারেনি প্রধানত গ্রামাঞ্চলে প্রাপ্ত দুর্বল ইন্টারনেট যোগাযোগ এবং কিছুটা আর্থিক সংগতির অভাবে; ৬. অনলাইন পাঠদান কাঠামো এবং বিষয়বস্তুকে মুখোমুখি পাঠদানের চেয়ে উৎকৃষ্ট মনে করেনি বিরাট সংখ্যক ছাত্রছাত্রী। কারণ হিসেবে মোবাইলের ছোট স্ক্রিন, শিক্ষকদের কথা ব্যহত হওয়া, সহপাঠীদের মুখ দেখতে না পাওয়া, শিক্ষকদের পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের চেয়ে কথা বলার মাধ্যেমে পাঠদান ইত্যাদিকে চিহ্নিত করেছে। এই হচ্ছে কোভিড-১৯ অতিমারি চলাকালীন সময়ে উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম সম্পর্কে ছাত্রছাত্রীদের অভিমত।
অনুমান করা অসংগত নয় যে, শিক্ষকদের কোভিড-১৯ অতিমারির ক্ষতি এর থেকে খুব বেশি ব্যতিক্রম হবে। তবে পাবলিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা আর্থিকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেকে বেতন পাননি বা অর্ধেক বেতন পেয়েছেন। এবিষয়ে মৌলিক গবেষণা হওয়া দরকার।
এই পটভূমি সামনে রেখে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো খুলতে যাচ্ছে। বিষয় ভাবনা হচ্ছে আমরা আলোচ্য ক্ষতিগুলো কিভাবে মোকাবিলা করবো? আমরা জানি যেকোনো ক্ষতি পোষাতে সাহায্যের দরকার হয়। প্রধানত এই সাহায্য আসতে হবে পরিবার, বন্ধুবান্ধব, সামাজিক সংগঠন, শিক্ষক, সর্বোপরি সরকারের দিক থেকে। সাহায্যের ধরন শুধু আর্থিক নয় বরং হতে হবে বহুমাত্রিক। কোভিড-১৯ অতিমারির জন্য যে ক্ষতি শিক্ষা ব্যবস্থায় হয়েছে, তা সুদূরপ্রসারী এবং এই ক্ষতি সহসা পূরণ হওয়ার মতো নয়।
আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, আমরা কিছু সাময়িক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারি মাত্র যাতে ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা লাঘব হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো খুলতে পারে। কিন্তু পরিপূর্ণ সমাধান পাওয়া যাবে না যতক্ষণ না সাহয্যের ধরনে একটি দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা না হচ্ছে। দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা সরকারকে গ্রহণ করতে হবে এবং পত্রপত্রিকায় যেটুকু খবর বেরিয়েছে তাতে আমরা জানতে পারছি যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যেই কাজ শুরু করে দিয়েছে। আপাতত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো খুললে আমরা যারা অংশীজন তাদের কী কী করণীয় তা সংক্ষেপে তুলে ধরা যাক-
১. যেহেতু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুললে ছাত্র, শিক্ষক, কমকর্তা, কর্মচারী সবাইকে পারস্পরিক সংস্পর্শে আসতে হবে সেজন্য প্রথম যে পারস্পরিক সাহায্যটি করা দরকার, তা হচ্ছে কোভিড-১৯ সংক্রমণ রোধে সবচেয়ে কার্যকর যে পদ্ধতি অর্থাৎ মাস্ক পরা, যতটা সম্ভব পারস্পরিক দূরত্ব বজায় রাখা, হাত সেনিটাইজ করা সংক্রান্ত স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলা। ছাত্রছাত্রীদের দল বেধে আড্ডা দেওয়া পরিহার করতে হবে। গণপরিবহনে যাতায়াত করতে হলে সতর্কতা বজায় রাখতে হবে; ২. কোভিড-১৯ সংক্রমণ রোধে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ব্যক্তিগত ও সামাজিক ব্যবহার বিধি শ্রেণিকক্ষে মানা কিছু কিছু বিভাগের ক্ষেত্রে বেশ কঠিন। কারণ, একটি শ্রেণিতে তাদের ছাত্র সংখ্যা অনেক বেশি, স্থান সংকুলান হওয়ার কথা নয়। সেক্ষেত্রে দুই সিফটে একই লেকচারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে বেঞ্চে বসার ক্ষেত্রে পারস্পরিক দূরত্ব বজায় রাখা সহজ হবে; ৩. একটি কোর্সের কিছুটা মুখোমুখি লেকচার, কিছুটা অ্যাসাইনমেন্ট, কিছুটা অনলাইন আলোচনা করে শেষ করা যেতে পারে; ৪. ব্যবহারিক ক্লাসগুলো ২/৩ শিফটে নেওয়া যেতে পারে; ৫. ইনকোর্স পরীক্ষা বা সমাপনী পরীক্ষার ক্ষেত্রে একটি পরীক্ষা হলে শুধু একটি বিভাগের পরীক্ষা না নেওয়াই সমীচীন হবে।
৬. হলে ছাত্রছাত্রীদের উঠার ব্যাপারে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর যে চিন্তাভাবনা তা বাস্তবমুখী করা খুবই কঠিন। কারণ, ছাত্রছাত্রীদের ব্যক্তিক ও সামষ্টিক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা বা মনিটর করা হল কর্তৃপক্ষের সাধ্যাতীত জনবল কাঠামোর জন্য। এই সমস্যাটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার পর কোভিড-১৯ সংক্রমণ রোধে সবচেয়ে বড় এবং কঠিনতম সমস্যা বলে ভাবা হচ্ছে। আপৎকালীন সমাধান হিসাবে প্রতি হলে আইসোলেশন প্রস্তুত কক্ষ করা, আক্রান্ত হলে সেবা শুশ্রুষাকারী আউটসোর্সিং করার ব্যবস্থা করা, নিজস্ব মেডিক্যাল সেন্টার থাকলে সেখানে আলাদা ওয়ার্ড তৈরি করা, একটি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা টিম তৈরি করা, আত্বীয়-স্বজনের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগ রক্ষার জন্য টিম তৈরি করা, ইত্যাদি নানামুখী পদক্ষেপ নিতে হবে; ৭. সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিতে পারে বাজেট বহির্ভূত খরচ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার সমন্বয়। এজন্য সরকারি বাড়তি অনুদান পাওয়ার চেষ্টা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালক কর্তৃপক্ষকে চালিয়ে যেতে হবে।
দীর্ঘ প্রায় দুই বছর যাবত শিক্ষার্থীরা মুখোমুখি পাঠ বঞ্চিত হয়ে আসছে। একটি বিচ্ছিন্ন অবস্থার মধ্যে তাদের থাকতে হয়েছে। হঠাৎ করে নতুন প্রেক্ষিতে ক্লাস শুরু হলে তাদের মানিয়ে নিতে মানসিক সমস্যা হতে পারে। কারণ, যেকোনো বিচ্ছিন্নতা এক ধরনের অনীহা তৈরি করে। ফলে এক ধরনের অমনোযোগিতা বা ক্লাস ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। এই ক্ষেত্রে শিক্ষকদের পাঠদান ছাড়া কিছুটা মটিভেশনাল বক্তব্য দিলে উপকার আসতে পারে। কোভিড-১৯ পরবর্তী নতুন বাস্তবতায় শিক্ষা কার্যক্রমকে চালু এবং উজ্জীবিত রাখতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগ ও ইনস্টিটিউটগুলোর একাডেমিক কমিটির সক্রিয় ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। একাডেমিক কার্যক্রম যথাযথভাবে হচ্ছে কিনা তা মনিটরিং করা অত্যন্ত জরুরি। এই সময়ে কোনো শিক্ষকের কোনো গাফিলতি যেন না হয় তা মনিটরিং করা এবং দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং দরকার হলে এটি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো যেতে পারে।
কোভিড-১৯ পরবর্তী শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে একটি বাড়তি অনুপ্রেরণামূলক পরিবেশ দরকার, পারস্পরিক দায় আরোপের সংস্কৃতি পরিহার করা দরকার এবং দরকার ছাত্র-শিক্ষক-কতৃর্পক্ষ এই তিন অংশীজনের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা। তাহলেই কেবল কোভিড-১৯ এর ক্ষতি ও ক্ষত দ্রুত দূর হতে পারে।
ড. আবু তোরাব রহিম, অধ্যাপক, পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
করোনা অতিমারির প্রেক্ষাপটে সুদীর্ঘ বিরতির পর পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো খুলতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে স্কুল, কলেজগুলো খুলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মধ্য অক্টোবরের মধ্যে খুলে দেবার প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। এদেশের প্রায় সব সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ধারণ ক্ষমতার ঢের বেশি শিক্ষার্থী অবস্থান করে বিধায় তাদের শতভাগের টিকাদানের পরেই আবাসিক হলগুলো খুলে একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। তবে খুলে যাবার পরে বড় চ্যালেঞ্জ হলো স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা আর শিক্ষার্থীদের সময়ের ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়া।
বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের বিখ্যাত উক্তি “সময়ই অর্থ” আমরা সবাই জানি। সময় অপচয় করলে অর্থ উপার্জনের সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়। যেহেতু সব ব্যক্তির আয় হচ্ছে জাতীয় আয়, কাজেই শিক্ষার্থীদের যে সময় নষ্ট হয়ে গেলো তা পুষিয়ে দেবার সব চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। এটি শুধু ছাত্রদের স্বার্থে নয়, সমাজ ও দেশের স্বার্থেও। এক্ষেত্রে সবার আগে ভাবতে হবে ২০২০ সালের স্নাতক শেষ পর্ব ও স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার কথা। তার পরে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য বর্ষের পরীক্ষাগুলো। ২০২০ পরীক্ষার প্রায় সব পর্বের শিক্ষার্থীদের ক্লাস অনলাইনে হয়েছে, যার অভিজ্ঞতা আশাব্যঞ্জক নয়। ‘ব্লেম গেম থিওরি’ এখানে কার্যকর। শিক্ষার্থীরা বলে অনেক শিক্ষকরা ঠিকঠাক ক্লাস নেয় না আবার শিক্ষকরা বলেন, বেশিরভাগ শিক্ষার্থী ক্লাস করে না, উভয়েই অসত্য নয়। বাস্তবতা হলো নিয়মিত ও সময়মতো ক্লাস হলে বেশিরভাগ শিক্ষার্থী ক্লাস করে। তবে শিক্ষার্থীদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ ডিভাইস ও নেট সমস্যার কারণে শুরু থেকেই ক্লাস করতে পারেনি।
টেকনিক্যাল বিষয় বা বিভাগের সিলেবাসের সব অংশ আবার অনলাইনে পড়ানো যায় না। এমতাবস্থায়, ক্যাম্পাস খুললে এক থেকে দুই সপ্তাহ ক্লাস বা রিভিউ ক্লাস নিয়ে পরীক্ষা নিলে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে। আর করোনা সৃষ্ট দীর্ঘ ১৮ মাসের ক্ষতি পুষিয়ে দেবার জন্য পরবর্তী বর্ষ বা সেমিস্টারগুলোর সিলেবাস কিছুটা সংক্ষিপ্ত করে পড়ানো যেতে পারে। ৬ মাসের সেমিস্টার ৫ মাসে, ১২ মাসের বর্ষ ৮/৯ মাসে সম্পন্ন করা যেতে পারে। সংগত কারণে কোন ক্লাস না হলে পরবর্তী সময়ে তার মেকআপ ক্লাস নিতে হবে। রাইজিংবিডি
শিক্ষার্থীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বা তার আশেপাশে অবস্থান করায় নেট সমস্যা কমে যাবে, ফলে অনলাইনে মেকআপ ক্লাসগুলো নেওয়া যেতে পারে। সৃষ্ট ক্ষতি কমানোর জন্য আগামী কয়েক বছরের জন্য ধর্মীয় ও জাতীয় দিবসের ছুটি ব্যতিরেকে গ্রীষ্মকালীন ও শীতকালীন ছুটি বাতিল করতে হবে। সাপ্তাহিক ছুটি দুই দিনের জায়গায় একদিন করা যেতে পারে। ক্লাসের সময় ও সংখ্যা বাড়ানো যেতে পারে। সর্বোপরি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে বিশ্ব শব্দের সংশ্রব আছে তাই বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে একাডেমিক ইয়ারের শুরুতেই ক্লাস শুরু ও শেষ, পরীক্ষা শুরু ও শেষ এবং ফলাফল প্রকাশের তারিখ ঘোষণা করতে হবে এবং তা মেনে চলতে হবে। শিক্ষকরা আন্তরিকভাবে চাইলে এটি অসম্ভব নয়। শিক্ষার্থীদেরও অহেতুক পরীক্ষা পেছানোর দাবি বা আন্দোলন থেকে বিরত থাকতে হবে।
এতদিনে আমরা সবাই ওয়াকিবহাল যে ফেস মাস্ক সুরক্ষা দেয়। আর টিকা নিলে করোনা হলেও অবস্থা সংকটাপন্ন হয় না। কাজেই শিক্ষা কার্যক্রম টেকসই রাখতে আবাসিক হলে, মেসে, ক্লাসে, আড্ডায় সব জায়গায় স্বাস্থ্যবিধি মানার বিকল্প নেই। টিকা নেবার পরেও মাস্ক পরে যেতে হবে। এই স্বাস্থ্যবিধি মানানোর দায়িত্ব এতদিন শুধু সরকারের ছিল। এখন এই দায়িত্ব আমাদের সবার। আর এর ব্যত্যয় ঘটলে কি ঘটতে পারে তা গত দেড় বছরে আমরা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। সেই অবস্থার প্রত্যাবর্তন রোধ করা আমাদের সবার এখন অবশ্য কর্তব্য।
অধ্যাপক ড. আবদুর রশিদ সরকার, অর্থনীতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
২০২০ সালের মার্চে করোনা সংক্রমণ শুরু হবার পর প্রথমদিকে কয়েক মাস বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকলেও পরবর্তী সময়ে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই ইউজিসির নির্দেশনা মোতাবেক অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার সিন্ধান্ত গ্রহণ করে। তবে বাংলাদেশে এমন অনলাইন কার্যক্রম প্রথম হওয়ায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা একেবারে শুরুর দিকে নানা রকম সমস্যার সম্মুখীন হলেও অধিকাংশই তা দ্রুত কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়। কলা ও মানবিক অনুষদের বিভাগগুলোতে তত্ত্বীয় ক্লাস বেশি থাকায় শিখন-শিক্ষণ প্রক্রিয়া ভালোভাবেই আগানোর কথা। তারপরেও যদি কোনো কোর্সে দুর্বলতা বা অসম্পূর্ণতা থেকে থাকে, তবে ব্লুমস ট্যাক্সোনমির শিখন উদ্দেশ্যের উচ্চতর স্তর অর্থাৎ প্রয়োগ, বিশ্লেষণ, সৃষ্টি করা প্রভৃতির ওপর অধিকতর জোর দিয়ে বাসায় অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে, শিক্ষার্থীদের উপর চাপ যাতে বেশি না পড়ে যায়। কারণ তারা দীর্ঘ দিন পরে ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক জীবনে ফিরছে।
করোনার নেতিবাচক প্রভাবে অনেকেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকতে পারে। তবে উচ্চশিক্ষায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভৌতবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান ও অন্যান্য অনুষদের শিক্ষার্থীরা যাদের তত্ত্বীয় ক্লাসের পাশাপাশি ব্যবহারিক ক্লাস থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় খুললে পরে অবশ্যই তাদের এই ক্লাসগুলোর ব্যাপারে অধিক যত্নশীল হতে হবে। এছাড়া কিছু কিছু ডিপার্টমেন্টে ফিল্ড ট্রিপ, প্রজেক্ট, ট্যুর, ইন্টার্নশিপ প্রভৃতি কোর্স রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় খুললে পরে এসব বিষয়গুলোর দিকে আলাদাভাবে নজর দেওয়া যেতে পারে।
মো. রিয়াদুল ইসলাম, সহকারী অধ্যাপক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
