নিউজ ডেস্ক।।
করোনা শ্রেণিকক্ষের শিক্ষায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এ সময়ে শিক্ষার্থীদের যে ক্ষতি হয়েছে তা অপূরণীয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষার সার্বিক ক্ষতি কখনই পুরোপুরি পূরণ সম্ভব হবে না। তবে পরিকল্পিত পদক্ষেপের মাধ্যমে ঘাটতি সর্বোচ্চ পরিমাণে পূরণ সম্ভব হতে পারে বলে মনে করেন তারা। তাদের ধারণা মানসিক ট্রমা আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের উজ্জীবিত করতে মোটিভেশনাল ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
দীর্ঘ বন্ধের পর যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা হবে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে মনোযোগ আনতে উজ্জীবিত করার পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আফরোজা হোসেন। তিনি আমাদের সময়কে বলেন, করোনা পরিস্থিতির কারণে ছেলেমেয়েদের ঘরবন্দি থাকা, জীবনের শঙ্কা, পরিবারে আর্থিক টানাপড়েন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় তাদের ক্লাস-পরীক্ষা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। উদ্বেগ কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজন তাদের পর্যাপ্ত মোটিভেশনাল ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা। তারা যেন ক্লাসে ফিরেই প্রাণোচ্ছল হয়ে পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এ উদ্যোগ নিতে হবে।
করোনায় শিক্ষা, শিক্ষার্থী ও সমাজের ওপর নানা দিক থেকে প্রভাব পড়েছে উল্লেখ করে গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, এখনই একটি জরিপ করা উচিত শিক্ষা খাতে কী কী ক্ষতি হয়েছে তা চিহ্নিত করতে। চিহ্নিত খাতসমূহ কীভাবে পুনরুদ্ধার করা যায়- এর জন্য দীর্ঘ, মধ্য এবং স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের ঝরেপড়া, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ এবং শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার- এই ৫টির প্রত্যেকটি বেড়ে যেতে পারে। করোনার ফলে শিক্ষার্থীরা দুই কারণে স্কুলে নাও ফিরতে পারে। প্রথমটি দীর্ঘ শিখন বিরতির কারণে একটি অংশ পাঠ না পারা ও বোঝার পরিস্থিতিতে পড়তে পারে। দ্বিতীয়টি সম্ভাব্য দারিদ্র্যের কশাঘাতে নিপতিত হয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে কাজে ভিড়ে যেতে পারে। ঝরেপড়া এসব শিক্ষার্থী মেয়েশিশুদের বিয়ে হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে মাধ্যমিকে ঝরেপড়াদের ক্ষেত্রে এটা বেশি ঘটতে পারে।
এই বিষয়ের সঙ্গে সন্তান জন্ম দেওয়া ও মৃত্যুর সম্পর্ক বিদ্যমান। এ বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অন্তত ৩ থেকে ৫ বছরের একটি সুনির্দিষ্ট শিক্ষা পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা নেওয়া উচিত। স্কুল খোলার পর কীভাবে শিশুদের ক্লাসে ফেরানো হবে সেই উদ্যোগ নিতে হবে। শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়াতে হবে এবং এ অর্থ যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে এর কার্যকর মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা নিতে হবে। আগামী দিনগুলোয় শিক্ষার আর্থিক, একাডেমিক, অবকাঠামো এবং ব্যবস্থাপনার জন্য একটি স্বচ্ছ পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি। এর ব্যত্যয় হলে বহু কষ্টে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ শিক্ষা, নারীশিক্ষা ও মাতৃ-শিশুমৃত্যুতে যে অর্জন করেছে তা মøান হওয়ার শঙ্কা আছে।
একাডেমিক শিক্ষা ঘাটতি পূরণের দিকে বেশি গুরুত্বারোপ করার পরামর্শ দিয়েছেন শিক্ষাবিদ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ। তিনি বলেন, করোনাকালে বড় ধরনের শিক্ষা ঘাটতি তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে করোনা পরিস্থিতি থেকে কবে পুরোপুরি উত্তরণ সম্ভব হবে- তাও অনিশ্চিত। এ কারণে বাস্তবতার নিরিখে শিক্ষণ ও শিখন পরিকল্পনা তৈরির পাশাপাশি তা এখনই বাস্তবায়নে যেতে হবে।
করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলে দ্রুত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া উচিত উল্লেখ করে অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, দেড় বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধের কারণে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা থেকে উত্তরণে জন্য অন্তত দুই থেকে তিন বছরের পরিকল্পনা নিতে হবে। একাডেমিক ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে এ শিক্ষাবিদের পরামর্শ- স্কুলে দুই-তিন বছরের জন্য বাংলা, গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞানের ওপর বাড়তি জোর দেওয়া। পিছিয়ে পড়াদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ ও প্রয়োজনে এলাকাভিত্তিক পরিকল্পনা নিতে হবে। এ ছাড়া পিছিয়ে পড়া এলাকায় সেখানে নিয়মিত শিক্ষকদের পাশাপাশি কিছু সহায়ক শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রস্তুত করে কাজে লাগাতে হবে। বেসরকারি সংস্থাকেও যুক্ত করা যেতে পারে। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী ও জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা বাদ দিতে হবে।
শিক্ষা প্রশাসনের পরিকল্পনায় শিক্ষা খাতে বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখার পরামর্শ দিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ বলেন, করোনায় অনেক বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক শিক্ষক পেশা ছেড়েছেন। এসব প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া চালু করতে হবে। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষকদের প্রণোদনা বা বিনাসুদে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত আর্থিক অসচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার ব্যয় নির্বাহে নগদ অর্থ প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। এমনকি স্বাস্থ্যবিধি বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় যে অবকাঠামো তৈরির জন্য নির্দেশনা রয়েছে এটি বাস্তবায়নে অসচ্ছল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে তাদের প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করতে হবে। টেলিভিশন, ইন্টারনেটভিত্তিক লেখাপড়ার জন্য (দূরশিক্ষণ) ইন্টারনেট, ডিভাইস, বিদ্যুৎ সংযোগের সুযোগ-সুবিধা প্রান্তিক পর্যায়ে নিশ্চিত করতে হবে। বিশ^বিদ্যালয়ে সেশনজট কমিয়ে আনতে ব্যবস্থা নিতে হবে।
করোনাপরবর্তী শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে এখন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরির কাজ চলছে জানিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন বলেন, করোনার সংক্রমণ কত দিন চলবে তা প্রথমে বোঝা যায়নি। এ জন্য প্রথমে খুব দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা হয়নি। তখন চিন্তায় ছিল সামনে চলে আসা সমস্যার সমাধান করা। এ সমস্যা শুধু বাংলাদেশের নয়, সারা বিশ্বেরই। প্রত্যেক জাতিই নিজস্ব সুবিধা আর পদ্ধতি অনুযায়ী উত্তরণের কার্যক্রম চালাচ্ছে। সম্ভাব্য সব ধরনের পদক্ষেপে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরির কাজ চলছে। তাতে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শও গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হবে।
গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী ১২ সেপ্টেম্বর থেকে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হবে। আগামীকাল ৫ সেপ্টেম্বর রবিবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা হওয়ার কথা রয়েছে। দেশের চার কোটি শিক্ষার্থী স্কুল খোলার চূড়ান্ত ঘোষণা শোনার অপেক্ষায়।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
