শিক্ষাঙ্গনে ফিরে আসুক প্রাণচাঞ্চল্য

করোনা পরিস্থিতির কারণে স্কুল-কলেজের চলমান ছুটি আরেক দফা বাড়িয়ে ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে। সরকারের সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী এ ছুটি ছিল ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। গত বছরের ১৭ মার্চের পর প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে।
করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল প্রথমে কয়েক সপ্তাহের জন্য। এরপর দফায় দফায় ছুটির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। ফলে একটানা প্রায় দেড় বছর সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এদেশে এত দীর্ঘকাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কখনোই বন্ধ থাকেনি।
গত সপ্তাহে জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশে করোনা মহামারির পুরোটা সময়জুড়েই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। কোভিড-১৯-এর কারণে স্কুল বন্ধের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম। দীর্ঘ এ বন্ধের ফলে প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা স্তর পর্যন্ত চার কোটির বেশি শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যত বেশি সময় ধরে শিশুরা বিদ্যালয়ের বাইরে থাকবে, ততই সহিংসতা, শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহের ঝুঁকির সম্মুখীন হবে। এতে তাদের স্কুলে ফিরে আসার সম্ভাবনাও কমে যাবে।’
দেশে করোনা সংক্রমণ চিহ্নিত হয় গত বছরের ৮ মার্চ এবং এর নয় দিন পরই সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণা করা হয়। এর পরপরই দেওয়া হয় লকডাউন। সরকারি-বেসরকারি অফিস, আদালত, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শপিংমল, দোকানপাট, গণপরিবহণ বন্ধ রাখা হয়। কিন্তু পোশাকশিল্প ও রপ্তানিমুখী কল-কারখানা খোলা রাখার অনুমতি দেওয়া হয়। ফলে লকডাউন বা বিধিনিষেধ আরোপ করা হলেও তা পুরোপুরি সফল হয়নি। শহরাঞ্চলে স্থাপিত পোশাক শিল্পের কমপক্ষে ৪০ লাখ শ্রমিক একসঙ্গে বসে কাজ করেছেন, অবাধে চলাফেরা করেছেন, একসঙ্গে বসবাস করেছেন। অন্য রপ্তানিমুখী শিল্পের শ্রমিক-কর্মচারীরাও একই সুবিধা পেয়ে অবাধে চলাচল করেছেন। সে সময় আমাদের দেশে করোনার ভ্যাকসিনও আসেনি। ফলে লকডাউন দিয়েও লাভ হয়নি। করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েছে। সরকারও লকডাউনের মেয়াদ দফায় দফায় বাড়িয়েছে। কখনো আবার শিথিল করেছে।
লকডাউন বা বিধিনিষেধে করোনা সংক্রমণ গত বছরের শেষদিকে অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এসেছিল বলে কর্তৃপক্ষ দাবি করে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি ছিল এই যে, করোনার সংক্রমণ কখনোই সন্তোষজনকভাবে কমে আসেনি। মৃত্যুর সংখ্যা কমেছিল, কিন্তু কোনোদিনই শূন্যের কোঠায় বা কাছাকাছি আসেনি।
করোনা সংক্রমণের শুরু থেকেই দেখা গেছে বিপুলসংখ্যক মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেননি। তারা মাস্ক ব্যবহার করেননি, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা করেননি। এ পরিস্থিতিতে গত বছর এবং এ বছর মোট চারটি ঈদ উৎসব উদযাপিত হয়েছে। এর মধ্যে দুটি ছিল ঈদুল আজহা। এই ঈদ উপলক্ষ্যে ঢাকা মহানগরসহ দেশের সবকটি ঘনবসতিপূর্ণ শহরাঞ্চলে পশুর হাট বসানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এসব হাটে এক কোটির বেশি মানুষের সমাগম হয়েছিল।
বিধিনিষেধ এবং গণপরিবহণ বন্ধ থাকা সত্ত্বেও ঈদের আগে-পরে ঢাকা শহর এবং অন্য বড় শহর থেকে লাখ লাখ মানুষ দেশের বাড়ি তথা গ্রামে গেছে এবং এসেছে ফেরিতে অথবা ছোটখাটো পরিবহণে গাদাগাদি করে। এসব কারণেই চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিল থেকে করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যু আবার বাড়তে থাকে ব্যাপকভাবে।
নতুন এ সংক্রমণকে বলা হচ্ছে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ। এ সংক্রমণ এতটাই ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল যে, একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর সংখ্যা ২৬৪ পর্যন্ত উঠেছিল। আর একদিনে করোনায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ১৬ হাজার ছাড়িয়েছিল। সরকারি-বেসরকারি কোনো হাসপাতালেই করোনা রোগী ভর্তির স্থান ছিল না। বর্তমানে করোনা পরিস্থিতির উন্নতি লক্ষ করা যাচ্ছে। মৃত্যু ও আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমে আসছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কোনো দেশে করোনায় শনাক্তের হার যদি পাঁচ শতাংশের নিচে নামে, তাহলে সে দেশে মহামারি নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে। সেই হিসাবে বাংলাদেশকে এখনো অনেক দূর যেতে হবে।
গত বৃহস্পতিবার শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের এক সভায় বিরাজমান পরিস্থিতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়ে আলোচনা হয়। সভায় সিদ্ধান্ত হয়, করোনা সংক্রমণের হার পাঁচ থেকে দশ শতাংশের মধ্যে এলে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। ১১ আগস্ট থেকে প্রায় সবকিছু খুলে দেওয়ার পর শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের পক্ষ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার দাবি উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৮ আগস্ট সচিব সভায় করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি এবং টিকা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন। এ নির্দেশনার ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবারের সভাটি অনুষ্ঠিত হয়।
শিক্ষার্থীদের টিকা দেওয়াসহ কিছু শর্ত পূরণ সাপেক্ষে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আগামী ১৫ অক্টোবরের পর থেকে নিজ নিজ সিদ্ধান্তে খুলতে পারবে বলে কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষ করে আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় খোলার ক্ষেত্রে করোনার টিকা গ্রহণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসগুলোতে ধারণক্ষমতার বেশি শিক্ষার্থী একসঙ্গে থাকেন। চারজনের জন্য নির্ধারিত একটি কক্ষে আটজন থাকেন। প্রয়োজনের তুলনায় ছাত্রাবাস বা ছাত্রাবাসের সিট কম বলেই এ পরিস্থিতি। এমন অবস্থায় করোনার সংক্রমণ বাড়বে। ছাত্রাবাসে সিট সংখ্যার অতিরিক্ত শিক্ষার্থী যদি না থাকেন, এবং সবাই যদি টিকা নিয়ে থাকেন, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ে করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলে আশা করা যায়। কিন্তু প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অর্থাৎ স্কুল-কলেজের পরিস্থিতি ভিন্ন। সেখানে ছাত্রাবাস বা আবাসিক শিক্ষার্থীর প্রশ্ন নেই। স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরা শ্রেণিকক্ষে একসঙ্গে বসে পড়াশোনা করবে, স্কুলের মাঠে খেলবে-এর বেশি কিছু নয়। এদের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারলে করোনা সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে না।
করোনা সংক্রমণ থেকে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কিছু বিশেষ ব্যবস্থা নিতে পারে। যেমন শুরুতেই ক্লাসের সংখ্যা কম রাখা, পরবর্তীকালে বাড়ানো। শ্রেণিকক্ষের আসনগুলোর মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী দূরত্ব বজায় রাখাও প্রয়োজন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য শিক্ষার্থীদের সচেতনও করতে হবে।
করোনাকালে গত দেড় বছর শিক্ষা খাত ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চার কোটি ছাত্রছাত্রী এ দীর্ঘ সময় তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে পারেনি। বেশি ক্ষতি হয়েছে শিশু-কিশোরদের। তারা স্কুলে যেতে পারেনি, ঘরের বাইরে যেতে পারেনি, মাঠে গিয়ে খেলতে পারেনি। স্কুল বন্ধ থাকায় বন্ধুদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ঘরে বসে থেকে মানসিক সমস্যার শিকার হয়েছে। শিশু-কিশোররা স্কুলের বাইরে থাকায় তাদের কী ধরনের ক্ষতি হচ্ছে, তা ইউনিসেফের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
কোনো কোনো কলেজে ও স্কুলেও অনলাইনে পড়াশোনার ব্যবস্থা চালু হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীরা বাড়িতে বসেই স্মার্টফোন বা ল্যাপটপের সাহায্যে শিক্ষকের লেকচার শুনতে পারে। কিন্তু এ অনলাইন পদ্ধতি সব শিক্ষার্থীর পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। অনলাইনে ক্লাস করতে হলে শিক্ষার্থীর প্রয়োজন হয় স্মার্টফোন অথবা ল্যাপটপ। সব অভিভাবকের পক্ষে এত দামি ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম কিনে দেওয়া সম্ভব হয় না। তদুপরি এর সঙ্গে প্রয়োজন হয় ইন্টারনেট লাইন বা ওয়াইফাই। সেটাও ব্যয়সাপেক্ষ। এ লাইন সব জায়গায়, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে, সহজলভ্য নয়। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের বিকল্প হচ্ছে নগদ টাকা দিয়ে নির্দিষ্ট মেয়াদি ইন্টারনেট প্যাকেজ কেনা। সেখানেও খরচের ব্যাপার রয়েছে। ফলে অনলাইন ব্যবস্থা চালু করা হলেও বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এ ব্যবস্থা থেকে বঞ্চিত।
প্রকৃত শিক্ষালাভের জন্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ থাকা জরুরি। অর্থাৎ শ্রেণিকক্ষে বসে শিক্ষার্থী শিক্ষকের কাছ থেকে সরাসরি শিক্ষাগ্রহণ করবে, প্রশ্নোত্তর হবে, মতবিনিময় হবে-এটাই প্রকৃত শিক্ষা। এতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে নৈকট্য তৈরি হয়, উভয়েই এতে লাভবান হয়। অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কোনো বিষয়ের ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে, কিন্তু স্কুলের ছেলেমেয়েদের জন্য তা মোটেই নয়।

অনেক দেরিতে হলেও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ স্কুল-কলেজ খোলার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করছে এবং সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই সিদ্ধান্ত নেবে বলা হয়েছে। সিদ্ধান্ত যাই হোক, কথা একটাই-ছেলেমেয়েদের জন্য স্কুলের গেট খুলে দিতে হবে যত শিগগির সম্ভব। তা না হলে আমাদের নবাগত প্রজন্মের বিরাট ক্ষতি হয়ে যাবে, রাষ্ট্রের ক্ষতি হবে, যা সহজে পূরণ হবে না। তাই আমরা চাই, স্কুল-কলেজ খুলে যাক-শিশু-কিশোরদের কলকাকলিতে মুখরিত হোক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণ, ফিরে আসুক প্রাণচাঞ্চল্য।

চপল বাশার : সাংবাদিক, লেখক

basharbd@gmail.com


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.