ভালভাবে বেচেঁ থাকতে জীবন ও জীবিকার সমন্বয়

বেচেঁ থাকার জন্য মানুষের জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সুস্থ দেহ ও সুস্থ মন। আর ভালভাবে বেচেঁ থাকার জন্য জীবন রক্ষা বড় চ্যালেঞ্জ। মানুষের জীবন পরনির্ভরশীলতার উপর নয় ইহা জীবিকার উপর নির্ভরশীল। মানুষের বেচেঁ থাকার জন্য এই দুটো জিনিস একটি জীবন ও অন্যটি জীবিকা যা ওতপ্রোত ভাবে জড়িত।

জীবন:সাধারণ অর্থে “জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বেচেঁ থাকার সময়ই হল জীবন”। এর মধ্যে মানুষের হাসি কান্না,সুখ-দুঃখ, আনন্দ, আবেগ, উল্লাস, সুস্থ,অসুস্থ, বৃদ্ধি, প্রজনন, পরিপাক, অনুভূতি, পরিব্যাপ্তি, অভিব্যক্তি ইত্যাদি বিদ্যমান থাকে।
বৈজ্ঞানিক ভাষায় বহুভাবে সংগা দেওয়া যায়। কতগুলি বিশেষ বৈশিষ্ট্য একত্রে কাজ করে জীবের যে সত্তা প্রকাশিত হয় সেটিই জীবন। আর যাদের নেই সেগুলো হলো জড় পদার্থ।

জীবিকা : মানুষ বেচেঁ থাকার জন্য যে সকল কর্মকান্ড করে অর্থ উপার্জন করে সেটাই জীবিকা।
মানুষ নিজের বা পরিবারের মৌলিক চাহিদা খাদ্য, বস্তু, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি পূরণের জন্য যে কাজের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করে সেটাই জীবিকা।
পৃথিবীতে মানুষের অবস্থাভেদে বিভিন্ন রকমের চাহিদা থাকে। মানুষ স্বপ্ন দেখে লক্ষ্য সীমান্তে পৌছানোর। আর সেই চাহিদা কারই বা না থাকে। কিন্তু সব চাহিদার চেয়ে মনে হয় বেচেঁ থাকার চাহিদাই সবার বেশি থাকে।

তবে বেচেঁ থাকার জন্য সবার আগে প্রয়োজন খাদ্য। যা মানুষের মৌলিক চাহিদার একটি। অন্য মৌলিক চাহিদা গুলো হলো বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা।
জীবন ধারনের জন্য মানুষের চাহিদার শেষ নেই। মানুষ যার যার অবস্থান থেকে চাহিদার স্বপ্ন দেখে। যেই স্বপ্নের গতিবেগ হাজার মাইলকেও অতিক্রম করে। মানুষের ব্যক্তি চাহিদার সাথে পারিবারিক কিছু চাহিদা থাকে। সেই চাহিদা দ্রুত পাবার লক্ষ্য অর্জনে নিজের সীমা অতিক্রম করে বিপদগামী হয়ে যায়। বেছে নেয় ধ্বংসাত্মক পথ। যা পরিবার ও সমাজের ঝুঁকি হয়ে পড়ে। এ থেকে বের হওয়ার জন্য সরকার ও বিত্তশালীদের এগিয়ে আসা উচিত। জীবন বাচাঁনোর জন্য তাদের জীবিকার পথ বের করা এখনিই জুরুরি।

আল্লাহতালার সৃষ্টির সেরা মানুষ। সৃষ্টিকর্তার কাছেই সকল মানুষ সমান। যার কারণে আল্লাহতালার নিয়ামত হিসেবে প্রকৃতি থেকে আলো,বাতাস, পানি, মাটি, অক্সিজেন ইত্যাদি ধনী দরিদ্র সকলে আমরা সমভাবে ভোগ করি। যদি প্রকৃতি থেকে আমরা অক্সিজেন না পেতাম বা তা টাকায় কিনতে হতো তবে এক মুহুর্তে কত লোক অক্সিজেনের অভাবে মারা যেত তা কি আমরা কখনো ভেবে দেখি? অক্সিজেন তো সৃষ্টিকর্তার নিয়ামত যা প্রকৃতি থেকে আল্লাহর সৃষ্টিকুল প্রানি ভোগ করছে। কৃত্রিম উপায়ে তৈরী নয়।

সারা দুনিয়ার মধ্যে আমাদের একটি ছোট দেশ। যেখানে মানুষ বাস করে কুঁড়ে ঘর থেকে বড় বড় দালান কুঠায়। আবার কুঁড়ে ঘরও কারো ভাগ্যে জোটে না। রাস্তায় ও ফুটপাতে থাকে অসংখ্য অসহায় মানুষ। সেই শ্রেণি লোকের সংখ্যা কিন্তু কম নয়। শহর গুলোতে এ শ্রেণি বেশি দেখা যায়। শহরে সাধারণত ধনীরাই বেশি বাস করে। তাদের চোখে কিন্তু রাস্তার পাশে থাকা অসহায়দের চিত্র দৃশ্যমান। তা দেখে মানবতার হৃদয় একটু কাপে কি তাদের!
এই বৈষম্যের কারণ কি? তা কি কখনো কেউ ভেবে দেখেছে? কারনই একটি শুধু প্রতিযোগিতা করে বেচেঁ থাকার জন্য। সাথে চায় আরাম আয়েস ও ভোগ বিলাসিতা।
কিন্তু সুন্দর এই দুনিয়ার মহব্বত ছেড়ে আমাদের সবাইকে চলে যেতে হবে। কেউ ইচ্ছা করলেও বেচেঁ থাকতে পারবে না। জন্ম নিলে মৃত্যু অনিবার্য। ভালভাবে বেচেঁ থাকার জন্যই জীবন ও জীবিকার সমন্বয় জরুরি। তা হলে আগে জীবনের সুরক্ষার প্রয়োজন। সমন্বয় সাধনটা কিভাবে করা যায় তার সঠিক পরিকল্পনার দরকার।

জীবন ধারনের জন্য জীবিকার প্রয়োজন। মানুষ জীবিকার সন্ধানের পিছে পিছে ছুটছে। কিন্তু কয়জনই বা জীবিকার উৎস খুজে পায়। সেই সংখ্যা তো কম নয়। তবে সরকারের উচিৎ মানুষের জীবিকার উৎস গুলো উদঘাটন করা। সব রকম সরকারি /বেসরকারি অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে জীবিকার পথ খোলা রাখা।
জীবিকা মেটানোর জন্য ইসলামী মূল্যবোধে চেতনায়
রাষ্ট্রকেই সর্বপ্রথম এগিয়ে আসতে হবে।

আল্লাহতালার কাছে সকল মানুষ সমান হওয়া সত্বেও ইসলামী অনুশাসনে না চলার কারনে ধনী দরিদ্র নামে বৈষম্যের সৃষ্টি হয়েছে। এই বৈষম্যে দূর করতে হলে যাকাতের মাধ্যমে ফান্ড গঠন করে অসহায় ও কর্মহীন মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যাবস্থা করা জুরুরি হয়ে পড়েছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কুটির শিল্প থেকে শুরু করে প্রতি জেলায় জেলায় বিভিন্ন ধরনের শিল্প কারখানা গড়ে তুলতে হবে। গ্রাম পর্যায়ে মানুষের হস্ত শিল্প, হাসঁ-মুরগি পালন, গরু-ছাগল পালন, মৎস্য চাষ ও কৃষি কাজের উপর গুরুত্ব দিতে হবে। হয়ত বা একদিন মানুষের ভাগ্যের দরজা খুলে কাজ করার সুযোগ আসবে। বেচেঁ থাকার চাহিদা জীবিকার মাধ্যমে কিছুটা হলেও পুষিয়ে নিবে।

বর্তমান বাংলাদেশ সহ সারাবিশ্বে করোনা ভাইরাস নামে ভয়াবহ মহামারীতে লক্ষ লক্ষ লোক মারা যাচ্ছে। সারা দেশে লক ডাউনে মানুষ ঘরে আবদ্ধ থাকছে। কিন্তু সব মানুষ কি আর ঘরে থাকতে পারছে? মানুষ বেরিয়ে যাচ্ছে খাবারের সন্ধানে। ব্যবসা বাণিজ্য, দোকানপাট, শিল্পকারখানা, যানবাহন সহ সব কিছু লক ডাউনের কারণে বন্ধ। কিন্তু সব কিছু কি বন্ধ করা সম্ভব? মোটেই না। কারণ লক ডাউন দেওয়ার পূর্ব প্রস্তুতি সঠিক ছিল না মনে হয়। সবার আগে খেটে খাওয়া দিন মজলুমের বেচেঁ থাকার বিষয়টি ভেবে লক ডাউন দেওয়া উচিৎ ছিল

শ্রেণীভিত্তিক করে পেশাজীবী ক্ষুদ্র ব্যাবসায়ী সহ বিভিন্ন শ্রেনীর শ্রমজীবীদের আর্থিক সহয়তা বিবেচনাধীন জীবিকা উৎসের পথ বের করা প্রয়োজন।
পাশাপাশি গণ সচেতনতা বড়ানো খুবই জরুরি। স্বাস্থ্য বিধি এর উপর জনসাধারণ কতটুকু গুরত্ব দিচ্ছে?এই মহামারীতে একদিকে লকডাউন আর অন্যদিকে হাট বাজার, দোকান পাট, যানবাহন, বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে লোকসমাগম। আবার অন্যদিকে সরকার দেশে সব ধরনের নির্বাচন দিয়ে লক ডাউনের গুরত্বকে হালকা করে দিচ্ছে। যে কারণে জনগন স্বাস্হ্য বিধি মানছে না এবং গুরত্ব ও দিচ্ছে না। কারণ অভাব যখন তাকে ঘিরে ফেলে স্বাস্থ্য বিধি ও লক ডাউন তাকে আটকিয়ে রাখতে পারে না।

মানুষের জন্য অর্থনীতি, অর্থনীতির জন্য মানুষ নয়।তাই যে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষের জীবনকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। সর্বোপরি মনে রাখতে হবে জীবন বনাম জীবিকার এই কঠিন বেড়াজাল থেকে মুক্ত হতে হলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কোন বিকল্প নেই।

বাংলাদেশ ছোট্ট একটি দেশ যার আয়তনের তুলনায় লোকসংখ্যা অনেক বেশী। সমস্যা হাজারো। সব সমস্যার সমাধান সরকারের পক্ষে মোটেই এককভাবে সম্ভব নয়। তাই সকল শ্রেনীর মানুষের দেশের বৃহৎ স্বার্থে বেচেঁ থাকার জন্য স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করা জুরুরি।

জীবন ও জীবিকা দুটিই আমাদের কাছে সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ যা অস্তিত্বের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। কোন একটি ক্ষেত্রেই বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়ার অবকাশ নেই। জীবন ও জীবিকা একসংগে বাচাঁতে পারলেই বাঁচবে অর্থনীতি, বাঁচবে দেশ।
লেখক-
মোঃ আবু জাফর সেক
প্রধান শিক্ষক,
আনছার উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়,
অম্বিকাপুর, ফরিদপুর।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.