ঘাতকরা বাংলাদেশকে হত্যা করেছিল,বঙ্গবন্ধুকে নয়

অনলাইন ডেস্ক।।

বাঙালী হাজার বছর ধরে স্বপ্ন দেখেছিলো, বিশ্বের মানচিত্রে একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের জন্ম হবে। সেই স্বাধীন ভূখণ্ড প্রতিষ্ঠার জন্য এই জনপদে ক্ষুদিরাম বসু, তিতুমীর, মাস্টারদা সূর্য সেন, হাজী শরীয়তুল্লাহ, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীরা স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার জন্য লড়াই সংগ্রাম করেছিলেন, কেউ নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। কিন্তু বাঙালির সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি। টুঙ্গিপাড়ার বাইগার নদীর তীরে জন্মগ্রহণ করা বাবা-মায়ের আদরের খোকা, যিনি পরবর্তীতে খোকা থেকে শেখ মুজিব, শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু, বঙ্গবন্ধু থেকে জাতির পিতা হয়েছিলেন, সেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্বের মানচিত্রে একটি স্বাধীন ভূখন্ডের জন্ম দিয়েছিলেন। সেই স্বাধীন ভূখণ্ডের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু মুজিবকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হত্যা করা হয়। সেই সঙ্গে তাঁর জীবন-সঙ্গিনী এবং অনুপ্রেরণা বেগম মুজিব, তাঁর তিন সন্তান মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামাল, শেখ জামাল, দশ বছরের শিশু শেখ রাসেল, বঙ্গবন্ধুর পুত্রবধূ, যাঁর হাতের মেহেদির রঙ তখনো শুকায়নি এবং বঙ্গবন্ধুর একমাত্র ছোট ভাই শেখ আবু নাসেরসহ পরিবারের ১৮ জন সদস্যকে হত্যা করা হয়। ১৫ আগস্ট বাঙালির ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়।  সেদিন যারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিলো, তারা জাতীয়-আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের ক্রীড়নক। পাকিস্তানের এজেন্ট, আওয়ামী লীগের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা একটি অংশ এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে জিয়াউর রহমান গং এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় সেনাবাহিনীর কতিপয় উচ্চাভিলাষী অফিসার বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর পরিবারকে হত্যা করে। সেদিন তারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেনি, হত্যা করেছিলো বাংলাদেশকে, বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে।

যে বঙ্গবন্ধু বাঙালির মুক্তির জন্য ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত কারাগারে ১৪টি বছর নির্যাতিত হয়েছেন, কারাভোগ করেছেন, দুই দুইবার যাকে ষড়যন্ত্র করে ফাঁসির মঞ্চে ঝুলানোর চেষ্টা করা হয়েছিলো, যে বঙ্গবন্ধুকে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের কারাগারে বিচারের নামে প্রহসন করে মৃত্যুদণ্ড দিতে তাঁর কবর খোঁড়া হয়েছিলো, যে বঙ্গবন্ধু দেশের মানুষের মুক্তির জন্য ক্ষমতা-মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিয়ে আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করেছিলেন, আইয়ুব খান-এর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ঐতিহাসিক ছয় দফা দিয়েছিলেন, যা ছিলো বাঙালির মুক্তির সনদ, যে বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাঙালিকে একবিন্দুতে দাঁড় করিয়েছিলেন, যেখানে লাখ লাখ মানুষের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিলো, ‘আমার নেতা তোমার নেতা শেখ মুজিব, শেখ মুজিব’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’- সেই বঙ্গবন্ধুকে কেন হত্যা করা হলো?
বঙ্গবন্ধু যে এই দেশের মানুষকে কতোটা ভালোবাসতেন, তা তাঁর বক্তব্যে প্রমাণিত হয়েছে। প্রখ্যাত ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করেছিলেন, যখন আপনি জানলেন, আপনার কবর খোঁড়া হয়েছে, তখন আপনার কার কথা মনে পড়েছিলো। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘প্রথমে আমার দেশের কথা মনে পড়েছিলো, তারপর আমার স্ত্রী-সন্তানদের কথা। আমি বাংলাদেশকে, বাংলাদেশের মানুষকে সব থেকে ভালোবাসি। ‘
১৯৭২-এর ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু তাঁর স্বপ্নের স্বাধীন দেশে যখন পা রাখলেন, বঙ্গবন্ধু তাঁর স্ত্রী-সন্তানদের কাছে ছুটে যাননি। ছুটে গিয়েছিলেন ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে, তাঁর জনতার কাছে। সেদিন তিনি শিশুর মতো অঝোরে কেঁদেছিলেন, আবেগ-আপ্লুত হয়ে বক্তব্য দিয়েছিলেন। সেদিন তিনি বলেছিলেন, আমার এই স্বাধীনতা পরিপূর্ণ হবে না, যদি বাংলার মানুষের পেটে ভাত না থাকে, বাংলার মা-বোনের পরনে কাপড় না থাকে, যদি বাংলার বেকার ছেলেরা কাজ না পায়, তাহলে আমার এই স্বাধীনতা পরিপূর্ণ হবে না।
এই লক্ষ্য সামনে রেখে বঙ্গবন্ধু যুদ্ধবিদ্ধস্ত বাংলাদেশ নির্মাণ শুরু করেছিলেন। এক কোটি লোক ভারত থেকে দেশে ফিরে এলেন। দুই কোটি মানুষের ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। ত্রিশ লাখ শহীদ পরিবার। দুই লাখ সম্ভ্রম হারানো মা-বোন, বাংলাদেশের যেদিকে তাকান, সেদিকেই আহাজারি ও আর্তনাদ। এই আহাজারি-আর্তনাদের মধ্যে ধ্বংসস্তুপের উপরে দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক ভিত্তির উপর দাঁড় করানোর লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করলেন বঙ্গবন্ধু।
সেই সময়ে পরাজিত মুসলিম লীগাররা, পরাজিত সাম্প্রদায়িক শক্তি, যুদ্ধাপরাধী এবং ছাত্রলীগের মধ্যে থাকা কিছু লোক অতি বিপ্লবের স্লোগান দিয়ে বের হয়ে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করে। জাতীয়-আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের ক্রীড়নক হিসেবে ঈদের জামাতে আওয়ামী লীগের এমপিকে গুলি করে হত্যা করলো তারা। পাটের গুদামে আগুন দিলো, থানা লুট করলো। এই অস্থিতিশীল পরিবেশের মধ্যে বঙ্গবন্ধু অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা-চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় নিয়ে অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি ঘোষণা করলেন। যখন অর্থনৈতিক ভিত্তির উপর দাঁড় করালেন, তখন জাতীয়-আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীরা তাদের এই দেশীয় এজেন্ট জিয়া-মুশতাকদের দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট সপরিবারে হত্যা করে। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সেদিন আবার হত্যা করা হলো বাংলাদেশ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলখকারী সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে পাকিস্তানের ধারায় ফিরিয়ে নিয়ে যান। তাঁর ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখতে শত শত সেনা অফিসারকে হত্যা করলেন। আওয়ামী লীগ এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সাড়ে চার লাখ নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করলেন, কাউকে গুম করলেন, খুন করলেন এবং রাত দশটা থেকে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত কারফিউ দিলেন। এসব করলেন তাঁর ক্ষমতা রক্ষা করার জন্য। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে অবৈধভাবে নির্বাচন করলেন। যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসন করলেন, গোলাম আজমকে দেশে ফিরিয়ে আনলেন। রাজাকার শাহ আজিজকে মন্ত্রী বানালেন। আলীমকে মন্ত্রী বানালেন। দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি জিয়াউর রহমান শুরু করলেন। সুবিধাবাদী-টাউট মুসলিম লীগ এবং অতি বিপ্লবীদের নিয়ে একটি দল গঠন করে দেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা গলাটিপে হত্যা করলেন। দেশের গণতন্ত্র হত্যা করলেন। দেশকে জঙ্গিবাদের দেশ বানালেন, তালেবানের দেশে বানালেন। দেশের মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নিলেন।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে আমাদের যে অন্ধকার জগতে নেওয়া হয়েছিলো, সেখান থেকে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে, মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে আজকের প্রধানমন্ত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশে এসেছিলেন, আওয়ামী লীগের হাল ধরেছিলেন। সততা, সাহসিকতা এবং দেশপ্রেম নিয়ে জিয়া থেকে খালেদা জিয়া- সকল ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে কণ্টকাকীর্ণ পথ মাড়িয়ে মানুষের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে এনেছেন তিনি।জননেত্রী শেখ হাসিনা লড়াই-সংগ্রাম করে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে মর্যাদাশীল এবং উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের ধারায় ফিরে এসেছে। বঙ্গবন্ধু তনয়া জননেত্রী শেখ হাসিনা এসেছিলেন বলেই, আওয়ামী লীগের হাল ধরেছিলেন বলেই, আজকে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা হওয়ার পথে। আজকে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছেছে। শিশুরা বছরের শুরুতে নতুন বই পাচ্ছে, বয়স্ক এবং বিধবারা ভাতা পাচ্ছেন। বাংলাদেশ পারমাণবিক বিশ্বে প্রবেশ করেছে, সাবমেরিনের যুগে প্রবেশ করেছে, ছিটমহল চুক্তি হয়েছে। বাংলাদেশে আজ মেগা প্রজেক্ট হচ্ছে শেখ হাসিনা’র নেতৃত্বে। পদ্মা সেতু হচ্ছে, কর্ণফুলী টানেল হচ্ছে, একশ’ অর্থনৈতিক জোন হচ্ছে, মেট্রোরেল হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু কন্যা আজ দেশকে এই জায়গায় নিয়ে এসেছেন।

বঙ্গবন্ধু যখন অর্থনৈতিক ভিত্তির উপর দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন যে আমেরিকা কৃত্রিম খাদ্য সংকট সৃষ্টি করে বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ির দেশ হিসেবে বিদ্রুপ করেছিলো, আজকে সে দেশের রাষ্ট্রপতি স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বঙ্গবন্ধু তনয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রশংসা করছেন। শেখ হাসিনা’র নেতৃত্বে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
আগস্টে, জাতীয় শোকের মাসে দাঁড়িয়ে আমি মনে করি, আজও ‘৭১ এবং ‘৭৫-এর খুনীদের প্রতিনিধিরা জাতীয়-আন্তর্জাতিকভাবে ষড়যন্ত্র করছে। সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার চেষ্টা করছে। আজ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল শক্তিকে জননেত্রী শেখ হাসিনা’র নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।  বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ গড়ার মধ্য দিয়ে আমরা বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিশোধ নেবো- এটিই হবে আমাদের শপথ।  


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.