অনলাইন ডেস্ক।।
সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন গবেষণায় দেশের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী তরুণদের বড় একটি অংশ পুরোপুরি বেকার বলে তথ্য আসছে। শিক্ষায় গতানুগতিক কারিকুলামে শিক্ষার্থীদের পড়িয়ে সনদ বিতরণ করলেও দক্ষ জনশক্তি তৈরি হচ্ছে না। এতে বাড়ছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা। তাই গতানুগতিক ধারা পরিবর্তন করে কর্মসংস্থানমুখী ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মিল রেখে দেশের অনার্স ও মার্স্টাস কোর্সে কর্মমূখী শিক্ষা যুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স ও মাস্টার্স কোর্সের সিলেবাসের ধরণ পাল্টে যাবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সূত্র আরও জানায়, শিক্ষার্থীদের অনার্স ও মার্স্টাস কোর্সের পাশাপাশি কোর কোর্স করতে হবে। নতুন এই কারিকুলাম চালু হলেও কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হবে না। শিক্ষকরাও চাকরি হারাবেন না। নতুন কারিকুলাম পড়াতে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে গড়ে তোলা হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে নতুন কারিকুলাম তৈরির সম্ভাব্যতা যাচাই করতে ১৫ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কমিটির সদস্য সচিব ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মোল্লা মাহফুজ আল হোসেন বলেন, আমরা দুটি মিটিং করেছি। ডিনদের ফিজিবিলিটি যাচাই করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তাদের প্রতিবেদন পেলে পরবর্তী কার্যক্রম শুরু করা হবে। আপাতত এর বাইরে কিছু বলা যাচ্ছে না।
কমিটির সদস্য ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন (শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণা) প্রফেসর ড. মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কারিকুলাম রিভাইস করা হচ্ছে। তাতে কিছু কিছু কোর কোর্স ও কিছু অপসনাল কোর্স চালু করা হবে। চার বছর মেয়াদী অনার্স কোর্স বা তিন বছরের কোর্সের শিক্ষার্থীরা যে বিষয়ে পড়বে তার সাথে টেকনিক্যাল অথবা জব ওরিয়েন্টেড সাবজেক্ট এর একটা পুল অব কোর্স থাকবে। সেখান থেকে দুই বা তিনটা অপশন শিক্ষার্থীদের তৃতীয় বা চতুর্থ বর্ষে দেয়া হবে। এটি কুদরত ই খুদা শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টেও বলা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, রিভাইসড কারিকুলামে কোর কোর্স থেকে বৃত্তিমূলক বা প্রফেশন ওরিয়েন্টেড কোর্স মূল ডিসিপ্লিনের সাথে পড়ে ডিপ্লোমা করতে পারবে। অথবা মাস্টার্স করবে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট লেবেল গিয়ে। এভাবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকে কর্মমূখী ও চাকরির বাজার উপযোগী করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
জানা যায়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম কর্মমূখী করতে গত ১ এপ্রিল শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির সভাপতিত্বে একটি ভার্চুয়াল সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিস্তারিত আলোচনা শেষে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স কর্মমূখী ও পেশাগত শিক্ষা কার্যক্রম প্রবর্তনের জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে দায়িত্ব দেয়া হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে ১৫ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। ইতিমধ্যে ওই কমিটি কাজ শুরু করেছে।
ওই সভায় শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন, কলেজগুলো থেকে যারা অনার্স ও মাস্টার্স পাস করে তারা খুব ভালো ফলাফল করে। কিন্তু তাদের শিক্ষার মান নিয়ে ভীষণভাবে হতাশা আছে। শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও বিশ্ববিদ্যালয় যারা অনার্স পড়ান, সেই শিক্ষকরা যে মানের শিক্ষক, কলেজগুলোর অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের মানের মধ্যেও পার্থক্য আছে। মন্ত্রী আরো বলেন, আমরা কি কি বিষয় পড়াবো, কি কি শর্ট কোর্স করাবো বা কি কি ডিপ্লোমা করাবো, সেই বিষয়গুলোর জন্য একটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল একাডেমিয়া অ্যান্ড কো-অর্ডিনেশন প্রয়োজন। আমরা শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমন একটা অবস্থায় নিয়ে যেতে চাই, আমাদের কলেজের ছাত্ররা যখন ক্লাস করবে তখন প্রসপেক্টিভ ইমপ্লয়ার জব ফেয়ার করে রিক্রুট করবে। ইন্টারশীপের ব্যবস্থা করবে। দেশে-বিদেশে প্রয়োজনের নিরিখেই কোর্সগুলো তৈরি করা হবে। শর্ট কোর্সগুলো করার পর অনার্স, মাস্টার্স করার সুযোগ থাকবে। কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হবে না। কোন শিক্ষকের চাকরি যাবে না। আমরা শুধু এই শিক্ষা ব্যবস্থাটাকে রি-অর্গানাইজ করবো। এটা কর্মপযোগী ও উপযুক্ত শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ করা হবে মাত্র। সভায় শিক্ষা উপমন্ত্রী, সচিব, অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, মাউশির মহাপরিচালক, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সদস্যসহ বিভিন্ন সরকারি কলেজের অধ্যক্ষরা মতামত তুলে ধরেন।
সভায় বিশিষ্টজনরা বলেন, দেশের প্রায় জেলাতেই বিশ্ববিদ্যালয় আছে। সেখানে মেধাবীরা ভর্তির সুযোগ পাচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সে ভর্তির অযোগ্য শিক্ষার্থীদেরকে কলেজগুলো যেভাবে অনার্স ডিগ্রি দিচ্ছে তা ঠিক হচ্ছে না। বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর অনার্স বা মাস্টার্স শিক্ষার দরকার নেই। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সনদধারী বেকার তৈরি করছে।
তারা বলেন, উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সে দেশের শিক্ষার্থীদের ঢালাওভাবে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে না। কারণ, কোনো অর্থনীতিই বিপুল সংখ্যক অনার্স-মাস্টার্সধারীকে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে না। শিক্ষার্থীর হাতে যখন অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রির সনদ থাকে তখন সে সমাজে নিজের মান-মর্যাদা নির্ধারণ করে ছোট খাটো কোন কাজ করে না। যার ফলে বিশাল সংখ্যক সনদধারী শিক্ষার্থী বেকার থাকে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কারণে আমাদের দেশে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
তারা আরও বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার ডিগ্রি পাচ্ছে। কিন্তু শিক্ষার অন্যান্য বিষয়গুলো থেকে বঞ্চিত। শিক্ষার্থীরা অনার্স-মাস্টার্স পাস করেও কমিউনিকেট করা শিখছে না, ক্রিটিক্যালি থিংক করা শিখছে না, প্রবলেম সলভিং শিখছে না। বর্তমান একাডেমিক শিক্ষা তাদের সফট স্কিলগুলো শিখাচ্ছে না। যা শিক্ষার্থীদের শেখা অপরিহার্য। সফটস্কিল না থাকায় চাকরিদাতাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না এসব সনদধারীরা। ফলে তারা বেকার থাকছে। জাতীয় বোঝা হচ্ছে।
সভায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের যে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স পড়নো হয় সেটা ট্রাডিশনাল। সেটাকে কর্মমূখী ও ডিমান্ড বেইসড করা দরকার। যাতে করে বর্তমান জব মার্কেটের চাহিদার সাথে ম্যাচিং হয়। এই উদ্যোগ উচ্চশিক্ষা সংকোচন নয়, বরং উচ্চশিক্ষাকে কর্মমূখী করা। তিনি আরো বলেন, বর্তমানে অনার্স ও মাস্টার্সের সিলেবাসের সঙ্গে স্কিল শিখানো যাবে কিনা বা এই শিক্ষাক্রমের মধ্যে ইন্টিগ্রেড করা যাবে কিনা তার সম্ভাব্য তা যাচাই করা দরকার। আইনগত ও কাঠামোগত পরিবর্তন করতে হলে সেটা করা হবে।
সভায় বিস্তারিত আলোচনা শেষে শতবর্ষী ১৩টি কলেজ ছাড়া অন্য কলেজে নতুন করে অনার্স ও মাস্টার্সে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ রাখার পক্ষে মত দেন শিক্ষামন্ত্রী। শুধু ডিগ্রিতে (পাস কোর্স) ও শর্ট কোর্সে ভর্তি চালু রাখার কথা বলেন তিনি। তবে বিএড ও এমএডসহ কিছু প্রফেশনাল কোর্স অ্যাক্রেডিয়েশন কাউন্সিলের গাইডলাইন অনুযায়ী চালু রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন ডা. দীপু মনি। সভায় বলা হয়, তবে কলেজগুলোতে অনার্স ও মাস্টার্সের শিক্ষকদের চাকরি চলে যাবে না। এসব শিক্ষকদের যার ডিসিপ্লিনের সাথে সম্পর্কযুক্ত শর্ট কোর্স পড়ানের জন্য প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। যাতে শর্ট কোর্স পড়ানোর জন্য শিক্ষকদের কোন সমস্যা না হয়।
সভায় মতামতের ভিত্তিতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে সম্ভাব্যতা যাচাই করার দায়িত্ব দেয়ার সিদ্ধান্ত হয় সভায়। এরপর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. মো. মশিউর রহমানকে আহবায়ক করে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স-কারিকুলাম মূল্যায়নপূর্বক জাতীয় উন্নয়ন ভাবনা ও লক্ষ্যের সাথে সঙ্গতি রেখে অধিকতর কর্মমূখী ও পেশাগত দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম প্রবর্তনের সম্ভাব্যতা যাচাই করতে ১৫ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সদস্য সচিব করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মোল্লা মাহফুজ আল হোসেনকে।
জানা যায়, বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে দুই হাজার ২৫৮ কলেজ অধিভুক্ত রয়েছে। সহশ্রাধিক কলেজে অনার্স-মাস্টার্স পড়ানো হয়। গ্রামেও গড়ে উঠেছে এ ধরনের কলেজ। ২৯ লাখ শিক্ষাথী এ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন সব বিষয়ে পড়ানো হয় যা শিল্প চাহিদা অনুযায়ী কর্ম সংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারছে না। ফলে বিপুল সংখ্যক স্নাতক ডিগ্রিধারী দেশের সামাজিক অর্থনীতিতে বোঝা হয়ে দাড়িয়েছেন। এ কারণেই এ শিক্ষায় কর্মমূখী ধারণা যুক্ত করার উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
