প্রশ্ন কঠোর লকডাউন নিয়ে। ঘরে-বাইরে সমালোচনা। রিকশায় পাশাপাশি দুজন বসেই চলছে ফাঁকা ঢাকায় ঘুরাফেরা। মাইক্রোবাসে ৮-১০ জন। মোটরসাইকেলেও দুজন চলাফেরা করছে। গতকাল এমন দৃশ্য ছিলো ঢাকাসহ দেশজুড়ে। এছাড়া সরকারি-বেসরকারি অফিসে জরুরি পরিষেবায় যারা কাজ করছেন তাদের জন্য করা হয়নি নিজস্ব গাড়ির ব্যবস্থা। সচেতন নাগরিক ও বিশিষ্টজনরা বলছেন, যে উদ্দেশ্যে লকডাউন দেয়া হয়েছে এতে করে উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। প্রয়োজনে মানুষ ঠিকই পাশাপাশি ও গাদাগাদি করে চলছে।
রাজধানীর উত্তরা থেকে অফিস করতে মতিঝিলে আসেন হাসিবুর রহমান। সেখান থেকে দুই-তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে কর্মস্থলে আসেন। তিনি বলেন, মোটরসাইকেলে করে হাতিরঝিল আসলে দুজন দেখে পুলিশ নামিয়ে দেয়। সেখান থেকে কিছু পথ হেঁটে রিকশায় করে দুজন কর্মস্থলে আসি। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘অফিস জানিয়েছিল গাড়ির ব্যবস্থা করবে কিন্তু করেনি। তাই আমাদের এতো দুর্ভোগ হচ্ছে।’ এ নিয়ে বিশিষ্টজনরা বলছেন, সবকিছু খোলা রেখে লকডাউন ঘোষণা একটি ভুল সিদ্ধান্ত। ভুল সিদ্ধান্ত থেকে বেরিয়ে বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। আর যতক্ষণ বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত নিতে না পারবে, ততক্ষণ পর্যন্ত লকডাউন বা শাটডাউনের সাথে সাধারণ মানুষকে যুক্ত করতে পারবে না। অতীত স্টাইলেই সব চলছে, তাই এই লকডাউন বাস্তবায়ন হবে এমনটা আশা করা যাচ্ছে না। তবে এবারের করোনার ধরনের বিষয়টি বিবেচনা করেই লকডাউন বাস্তবায়ন হবে বলে আশা করি। নইলে পরিস্থিতি একেবারে খারাপের দিকে যাবে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান খোলা রেখে লকডাউন দেয়া হয়েছে।
বলা হয়েছে— অল্প সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে অফিস পরিচালনা করতে হবে। এদের নিজস্ব পরিবহনে আনা-নেয়ার জন্য বলা হয়েছে। কিন্তু কতটি প্রতিষ্ঠানের সেই সক্ষমতা আছে? অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের সেই সক্ষমতা নেই। এ থেকে স্পষ্ট হয়ে গেছে, যে উদ্দেশ্যে লকডাউন দেয়া হয়েছে সেই সূত্র বা উদ্দেশ্য ভেস্তে যাচ্ছে।
মঞ্জুর হাসান তালুকদার রাসেল বলেন, ‘কিসের লকডাউন অথবা শাটডাউন? গার্মেন্টস খোলা থাকলে সব মিলকারখানা খোলা রাখতেই হবে। সব বায়িং হাউস খোলা রাখতেই হবে। সর্বনিম্ন এক কোটি মানুষকে প্রতিদিন রাস্তায় চলাচল করতেই হবে। তাদের যাতায়াতের ব্যবস্থা কী হবে? বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যেখানে গার্মেন্টসের লোকের নাকি করোনা হয় না! কি হাস্যকর এক যুক্তি! বর্তমান গার্মেন্টস মালিকরা রেভিনিউয়ের কথা বলে সরকারকে একপ্রকার জিম্মি করে রেখেছেন। এখানে আমরা নিরুপায় আর অসহায়।’ সজিব হাসান বলেন, ‘করোনা কি প্রাইভেটকারে দুই-চারজন একসাথে বসলে হয় না? নাকি বড়লোক দেখে ছাড় দেয়? রিকশায় দুইজন বসলে করোনা হয় না? মোটরসাইকেলে বসলে করোনা হয় না? সবাই তো পাশাপাশি বসে।’ বেলাল হোসেন বলেন, ‘শুধু বৃহস্পতিবারের অপেক্ষায় আছি। কী লকডাউন দেয় সেটা দেখার জন্য। লকডাউন নাকি গরিব মানুষকে মেরে ফেলার পাঁয়তারা— কোনটা।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান আমার সংবাদকে বলেন, ‘এবার লকডাউন কার্যকর না করে উপায় নেই। কারণ আগের ভাইরাসের থেকে এটি অনেক শক্তিশালী এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তাই এবারের লকডাউন যেকোনোভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। আমরা যদি আগের অভিজ্ঞতা দেখি— তাহলে এই লকডাউন বাস্তবায়ন হবে বলে আমরা আশা করতে পারি না। কিন্তু এবারের করোনার ধরনের বিষয়টি বিবেচনা করেই লকডাউন বাস্তবায়ন হবে বলে আশা করি। নইলে পরিস্থিতি একেবারে খারাপের দিকে যাবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘দেখুন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান খোলা রেখে লকডাউন দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে— অল্প সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে অফিস পরিচালনা করতে হবে। এদের নিজস্ব পরিবহনে আনা-নেয়ার জন্য বলা হয়েছে। কিন্তু কতটি প্রতিষ্ঠানের সেই সক্ষমতা আছে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের সেই সক্ষমতা নেই। যারা অফিস করছেন, তারা নিজ উদ্যোগে বিভিন্নভাবে অফিসে আসছেন। এতে সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বেশি থাকে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সরকারের এমন সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষের মাঝে উদাসীনতা সৃষ্টি হচ্ছে। লকডাউনে সরকারকে সবকিছু বন্ধ রাখতে হবে এবং অসহায় মানুষের খাবার নিশ্চিত করতে হবে।’
রাজনীতিবিদ রুহিন হোসেন প্রিন্স আমার সংবাদকে বলেন, ‘বিগত দিনের অভিজ্ঞতা বলে— সবকিছু খোলা রেখে লকডাউন ঘোষণা একটি ভুল সিদ্ধান্ত। এই ভুল সিদ্ধান্ত থেকে আমাদের বেরিয়ে এসে বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। আর যতক্ষণ বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত নিতে না পারবো, ততক্ষণ পর্যন্ত লকডাউন বা শাটডাউনের সাথে সাধারণ মানুষকে যুক্ত করতে পারবো না। বরং পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাবে।’
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘সবকিছু খোলা রেখে যে লকডাউন চলছে, এই লকডাউনে মানুষ কর্মের প্রয়োজনে বের হচ্ছেন। আশা করি, আগামী ১ জুলাই থেকে সরকার যে কঠোর লকডাউনের কথা বলছে, তাতে সবকিছু বন্ধ থাকবে এবং প্রয়োজন ছাড়া কেউ রাস্তায় বের হবে না। সরকারের ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি কমে যাবে। তিনি আরও বলেন, ‘গণপরিবন বন্ধ থাকায় সংক্রমণের ঝুঁকি কিছুটা কমেছে।
কিন্তু একই পরিবারের বাইরে অপরিচিত বা অন্য কারো সাথে এক রিকশায় ওঠা ঠিক নয়, তাতে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। শুধু সরকার নয়, করোনার সংক্রমণ থেকে মুক্তি পেতে সবাইকে সতর্ক হতে হবে।
নিজ নিজ দায়িত্বে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে ও সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে হবে।’
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
