শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ অভিভাবকদের ভাবনা

নিউজ ডেস্ক।।

করোনার কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে আছে। শিক্ষার্থীরা যেন উত্তাল সাগরে মাঝি মাল্লা হীন ভাসমান তরীর যাত্রী । তারা লক্ষে পৌছতে পারছে না ।লক্ষ্যে পৌঁছার সম্ভাবনাও নেই। ইতিমধ্যে তরীতে মজুদ থাকা খাদ্য পানীয় শেষ হয়ে গেছে। কিছু দুর্বল যাত্রী মারা গেছে। অনেকে মুমূর্ষ অবস্থায় আছে। বাকি সব অসুস্থ হয়ে পড়েছে। উদ্ধারের তৎপরতা নেই ।সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের অবস্থা জানতে পেরে সাগর তীরে এসে অবস্থান নিয়েছে। তাদের চোখে-মুখে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ।একজন জননেতা এসে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন আগামী আগস্ট মাসের শেষের দিকে আমরা তরীকে তটে ভিড়াব যদি তখন সাগর শান্ত থাকে। আপনারা কোন চিন্তা করবেন না।
সব অভিভাবকেরই তার সন্তান নিয়ে একটা ভাবনা থাকে। ভাবনা ও পরিকল্পনা অনুযায়ী গড়ে তোলার চেষ্টা করে। সন্তানের জন্য প্রয়োজনীয় খরচ করে ।তারপর সে মনে করে লেখাপড়ার খরচটা যদি সে নিজেই চালিয়ে নিতে পারত তাহলে ভাল হত। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে।
যখন সে তা পারে না তখন সন্তান নিজের কাছে বোঝা মনে হয়। এই মুহূর্তে অভিভাবক দের অবস্থা সাগরতীরে অবস্থানকারী অভিভাবকের মতো। কোন অভিভাবক ভাবছে স্নাতক ফাইনাল হয়ে গেলে ছেলেটাকে কিছু একটা করতে বলতাম ।কোন অভিভাবক হয়তো ভাবছে অনার্স ফাইনাল হয়ে গেলে মেয়েটাকে একটা যোগ্য পাত্রে পাত্রস্থ করতে পারতাম ।কেউ ভাবছে ছেলেটা ভালো একটা ইউনিভার্সিটি তে ভর্তি হতে পারলে বলতাম আমি তোমাকে আর খরচ দিতে পারব না । প্রাইভেট পড়িয়ে
খরচ চালিয়ে যাও ।কেউ ভাবছে পরীক্ষাটা হয়ে গেলে তাকে ব্যবসার কাজে লাগিয়ে দিতাম কিংবা বিদেশে পাঠিয়ে দিতাম ।কেউ তার গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে না । কবে পারবে তা অনিশ্চিত ‌‌।
কিছুদিন আগে দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে জানতে পারলাম ৯৭ ভাগ অভিভাবক তার সন্তানকে প্রতিষ্ঠানে পাঠাবেন যদি প্রতিষ্ঠান খোল। জরিপে জনমতের যে প্রতিফলন ঘটেছে সে অনুযায়ী সরকার কোনো পদক্ষেপ কিংবা দিকনির্দেশনা দিতে পারেনি। সরকারের উচিত ছিল কিছু একটা করা। যেমন ১। স্বাস্থ্যবিধি মেনে সংক্ষিপ্তভাবে অন্তত পরীক্ষা গুলো চালিয়ে যাওয়া ।এতে সময়ের অপচয় হতো না। শিক্ষার্থীরা নতুন বই পড়তে পারতো। পরীক্ষার মাধ্যমে জ্ঞানার্জন হয়না অর্জিত জ্ঞানের মূল্যায়ন করে স্তর পরিবর্তন করা হয়। প্রধান প্রধান সাবজেক্ট গুলো ঠিক রেখে বাকি সাবজেক্টগুলো স্কুল ভিত্তিক মূল্যায়ন করা যেতে পারত। এসএসসি এবং এইচএসসি তে শুধুমাত্র এমসিকিউ এর মাধ্যমেও মূল্যায়ন করা যেত। প্রয়োজনে বিভাগ অনুযায়ী আলাদা আলাদা সময়ে পরীক্ষা নেওয়া যেত।
২। শিফটিং করে ক্লাস চালিয়ে নেওয়া ।সপ্তাহে প্রত্যেক শ্রেণীর ছাত্ররা যদি দুই দিন ক্লাস করতে পারত তাহলে ও ভালো হতো।
৩। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির ক্ষেত্রে কেন্দ্র বাড়িয়ে কিংবা একাধিক গ্রুপ করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ধাপে ধাপে পরীক্ষার আয়োজন করা যেত। দীর্ঘদিন পড়াশোনা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকলে পরবর্তীতে লেখাপড়ায় মনোযোগ নষ্ট হতে পারে। মরমী কবি লালন ফকির বলেছেন “সময় গেলে সাধন হবে না।”
শিক্ষানীতিতে সরকার ভুল পথে হাঁটছেন। সরকারের আমলা মন্ত্রী-সচিব সবাই যেন খয়ের খাঁ ।সবাই মুখে কুলুপ মেরেছেন ।আর বিরোধী দলগুলোর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে দেখেনি । দু-চারটি ছোটখাটো দল যারা মানববন্ধন করেছেন খুলে দেওয়ার দাবিতে তাদের ধন্যবাদ জানাই।
আমার কৃষিবিদ এক বড় ভাই ( যার মেয়ে এসএসসি পরীক্ষার্থী ) কে জিজ্ঞাসা করি স্কুল কলেজের ব্যাপারে আপনার ভাবনা কি? উত্তরে বললেন” নামকাওয়াস্তে হলেও একটা পরীক্ষা নিয়ে পার করে দিলে বার্ডেন মনে হতো না।”
প্রতিবেশী আরেক ব্যবসায়ী বড় ভাই ( যার ছেলে এসএসসি পরীক্ষার্থী ) কে জিজ্ঞাসা করি আপনি কি ভাবছেন ? তিনি বললেন “লেখাপড়ার জন্য শহরে এসেছি ব্যবসা ও শেষ ছেলেদুটো শেষ। “আর এক প্রতিবেশী ভাই( যার দুটো মেয়ে অনার্সে পড়ে) বললেন “মেয়েদের বয়স হয়ে যাচ্ছে, বিয়ের ব্যাপার আছে ,চাকরির ব্যাপার আছে ছেলে হলে চিন্তা করতাম না।” অন্য একজন অভিভাবক (যার ছেলে মেডিকেলে পড়ে) তিনি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে যা বললেন তা লেখার মত না। সারকথা বাড়ি পাগলা গারদে পরিণত হয়েছে ।কলেজ খুললে তিনি হাফ ছেড়ে বাঁচতে পারতেন। অন্য একজন অভিভাবক( যিনি একটি বেসরকারি ডিগ্রি কলেজের উপাধ্যক্ষ) বললেন ” সবকিছু স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে পারলে স্কুল-কলেজ কেন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে পারবে না? ছেলেটা রাতভর মোবাইল টিপে দিনভর ঘুমায়।”
তাই বলতে চাই সরকার যেমন জীবন ও জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য স্থাপন করেছেন। তেমনি জীবিকা ও শিক্ষার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা প্রয়োজন। কারণ জীবনের জন্য যেমন জীবিকার প্রয়োজনে তেমনি জীবিকার জন্য শিক্ষার প্রয়োজন । দ্বিতীয়তঃ শিক্ষা মানবাত্মার খোরাক। শিক্ষা না পেলে মানবাত্মা মারা যাবে। মানবতা মারা গেলে মানুষ পশুতে পরিণত হবে। অতএব স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে হলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হোক এবং অভিভাবকদের উৎকণ্ঠা উদ্বেগ দূর করা হোক।
লেখক-
মোহাম্মদ আলী শেখ
সহকারী অধ্যাপক
কাদের ডিগ্রী কলেজ
বোয়ালমারী,ফরিদপুর।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.