করোনা সংক্রমণে প্রায় ১৫ মাস বন্ধ থাকায় দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নানা কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। কোথাও ভবনের ভেতরেই চলছে পশুপালন। আবার কোথাও গড়ে তোলা হয়েছে ব্যবসায়িক পণ্যের গুদাম ঘর। অনেক এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বসবাস করছেন নির্মাণ শ্রমিকরা।
সন্ধ্যা নামলেই মাদকসেবীদের আখড়ায় পরিণত হয় কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। অনেক জায়গায় বখাটে ছাত্রছাত্রীরা নিয়মিত আড্ডাও দিয়ে থাকে। এছাড়া কোনো এলাকায় প্রতিষ্ঠানের মাঠে এমনকি বারান্দায় চলছে সবজির চাষ। ধুলোর আস্তর পড়েছে আসবাবপত্রে।
ব্যবহার না করায় নষ্ট হয়ে পড়ে আছে ফ্যান ও বৈদ্যুতিক বাতি। প্রতিষ্ঠানের মাঠে ও আশপাশ এলাকায় জন্মেছে ঝোপঝাড়। একদিকে পশুপালন আরেকদিকে দিনের পর দিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন না করায় শ্রেণি কক্ষের ভেতরে তৈরি হয়েছে নোংরা-পুঁতিগন্ধময় পরিবেশ।
সরেজমিন পরিদর্শনে দেশের বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ চিত্র মিলেছে।
সংক্রমণ পরিস্থিতির উন্নতি হলে ১৩ জুন দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেওয়া হতে পারে। কিন্তু পাঠদানের জন্য এগুলো কতটা প্রস্তুত আর বাস্তব অবস্থা কেমন- তা সরেজমিন পরিদর্শনের উদ্যোগ নেয় যুগান্তর। এর অংশ হিসাবে গত কয়েকদিন স্থানীয় প্রতিনিধিরা বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় সশরীরে যান।
সব প্রতিষ্ঠানেই যে বেহাল দশা বিরাজ করছে তা নয়। যেসব স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় অধ্যক্ষ বা প্রধান শিক্ষক নিয়মিত যাননি এবং আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেননি সেখানে উল্লিখিত পরিস্থিতি দেখা গেছে। ওইসব উপজেলা বা জেলার শিক্ষা কর্মকর্তারাও এ ক্ষেত্রেও উদাসীন ছিলেন।
কেননা, করোনায় শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও প্রতিষ্ঠানের অফিস খোলা রাখার ব্যাপারে সরকারি নির্দেশনা ছিল। নিয়মিত অফিস খোলা রাখা হলে প্রতিষ্ঠানের আসবাবপত্রসহ স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণ যথাযথভাবে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে ভিন্ন পরিস্থিতি। পিরোজপুরের স্বরূপকাঠিতে ৯০ শতাংশ ক্লাসরুমে মাকড়সার বাসা ও ময়লা-আবর্জনায় ভরে গেছে।
ভোলায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাঠে ও ভবন ঘেঁষে গজিয়েছে ঘাস ও বনজঙ্গল। ব্যবহার না করায় নষ্ট হয়ে পড়ে আছে ফ্যান ও বৈদ্যুতিক বাতি। হাজিরহাট মহিলা মাদ্রাসার মাঠ দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে দোকান। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মাঠে রাখা হয়েছে সড়কের নির্মাণ সামগ্রী। পটুয়াখালীর কালাইয়া হায়াতুন্নেছা বালিকা বিদ্যালয়ের শ্রেণি কক্ষে এক সহকারী শিক্ষক ধান, ডাল, বাদামসহ বিভিন্ন কৃষি পণ্যের গুদাম তৈরি করেছেন।
একই ধরনের গুদাম তৈরি করা হয়েছে ধুলিয়ার চর চাঁদকাঠি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে। বরগুনার আয়লার পাতাকাটা ইউনিয়নে গাবতলী চৌদ্দঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বেতাগীতে ঝিলবুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে গরু রাখা হচ্ছে। এরমধ্যে প্রথমটিতে ওই প্রতিষ্ঠানের এক সহকারী শিক্ষিকার স্বামী গরুর ঘর তৈরি করেন।
প্রতিষ্ঠানটিতে বখাটেদের তাসের আড্ডা, মাদকসেবনও চলে। আর মাঠে ধান শুকান আশপাশের নারীরা। এই একই ধরনের কর্ম চলছে পটুয়াখালীর দশমিনা, রাঙ্গাবালিসহ অন্যান্য উপজেলার স্কুল-মাদ্রাসায়ও।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলমগীর মুহম্মদ মনসুরুল আলম বলেন, বিভিন্ন স্থানে স্কুলেরই সংস্কার ও মেরামত কাজ চলছে। এজন্য তারা সেই কাজের সামগ্রী রেখেছে। এ ক্ষেত্রে তারা নিয়মের লঙ্ঘন করেছে। যেহেতু আমরা ১৩ জুন স্কুল খোলার চিন্তা করছি, এ কারণে এলজিইডিকে চিঠি দিয়ে ওইসব সামগ্রী সরিয়ে ফেলার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। তবে অন্য কোনো কাজের নির্মাণ সামগ্রী স্কুলে রাখা হয়েছে কিংবা গরু-ছাগল লালন-পালনের তথ্য আমাদের জানা নেই। সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে আমরা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।
তিনি আরও বলেন, ৩০ মার্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার কথা ছিল। এ উপলক্ষ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার নির্দেশনা ছিল। যদিও পরে বাস্তব কারণে খোলা হয়নি, কিন্তু পরিষ্কার করে থাকলে নাজুক পরিস্থিতি থাকার কথা নয়। আমরা মাঠপর্যায়ে এ ব্যাপারে খোঁজখবর নেব।
আর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ গোলাম ফারুক বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে দুদফা পরিচ্ছন্ন কাজ হয়েছে। এখন তৃতীয় দফার প্রস্তুতি চলছে। প্রস্তুতির নির্দেশনায়ই শ্রেণিকক্ষসহ গোটা ভবন, মাঠ-আশপাশ এলাকা পরিষ্কার করার বিষয়টি উল্লেখ আছে। সুতরাং, কোথাও নাজুক দশা থাকার কথা নয়। এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য সংশ্লিষ্টরা দায়ী থাকবেন। তাদের চিহ্নিত করা হবে।সূত্র:যুগান্তর
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
