শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কবে খুলবে ?

অলোক আচার্য।।
করোনায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে শিক্ষাব্যবস্থা। কয়েক কোটি শিক্ষা সাথে জড়িত শিক্ষার্থী ও শিক্ষক উভয়ই দীর্ঘদিন যাবৎ শিক্ষার স্বাভাবিক কার্যক্রম থেকে দূরে রয়েছে। কোটি কোটি শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রম প্রায় বন্ধ থাকায় তারা পাঠ্যবই থেকেই দূরে রয়েছে। শিক্ষায় এই অনাকাঙ্খিত পরিবেশ ইতিপূর্বে কোনোদিন হয়নি।

ফলে আমাদের প্রস্তুতিও ছিল না। আমাদের প্রধান লক্ষ্য করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং কোমলমতি শিক্ষার্থীদের করোনা ভাইরাস থেকে দূরে রাখা। এই লক্ষ্যে দেখা যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। পূর্ববর্তী শ্রেণির লেখাপড়া পরবর্তী শ্রেণিতে পাঠ সহজবোধ্য করতে সাহায্য করে। বিশেষ করে প্রাথমিকে চতুর্থ শ্রেণির সাথে পঞ্চম শ্রেণি এবং সপ্তম শ্রেণির সাথে অষ্টম শ্রেণির নিবিঢ় যোগসূত্র রয়েছে।

শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশই পূর্বের শ্রেণির গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ দিয়ে পরের শ্রেণিতে পড়া শুরু করেছে। করোনা ভাইরাসের কারণে দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় উচ্চ শিক্ষায়ও সংকট তৈরি হয়েছে। যেসব শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া শেষ করে চাকরির যুদ্ধে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিল তারা হতাশায় ভুগছে। দীর্ঘদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মনের ওপরও চাপ বাড়ছে। গত বছর অটোপাশ দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু এখন এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে। বছর বছর অটোপাশ দিয়ে শিক্ষার্থীর মূল্যায়নের পরিবর্তে অবমূল্যায়ন করা যায় না। ফলে যেকোনোভাবেই পরীক্ষা নিতেই হবে। তবে এই পরিস্থিতিতে সেই পদ্ধতি কি হবে তা আলোচনার দাবী রাখে। ঈদের পর এ মাসেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির বিবেচনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া সম্ভব হবে কি না এ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সবার মনে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া যে সময়ের দাবী এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু স্বাভাবিক পরিস্থিতি বলতে যা বোঝায় সেই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে কি না তা ভাবার বিষয়। কারণ করোনার কারণেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। অপেক্ষা করা হচ্ছে পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হওয়ার। কিন্তু বৈশি^ক পরিস্থিতি এমন যে এখন পরিস্থিতি ভালো বলে মনে হয় তো পরক্ষণেই খারাপ হয়। সুতরাং বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনার দাবী রাখে।

একটু বিশ্লেষণ করলেই দেখা যায়, গত এপ্রিল মাস থেকে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আঘাত করে বাংলাদেশ,ভারতসহ অন্যান্য দেশে। সেই ধাক্কায় করোনায় লাশের সারি বৃদ্ধি পায়। প্রতিদিন একশোর ওপরে মৃত্যু হয়। তারপর কতৃপক্ষ লক ডাউনের সিদ্ধান্ত নেয় যা এখনো বলবৎ রয়েছে। সে কারণে করোনা পরিস্থিতির ক্রমোন্নতি হতে থাকে। এখন কমেছে মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা। আমরা দেখেছি ইদ-উল-ফিতর উপলক্ষ্যে বিপুল সংখ্যক মানুষ রাজধানী থেকে গাদাগাদি করে মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে গ্রামে এসেছে।

যদিও এ বিষয়ে বারবার নিষেধ করা হয়েছে। দুরপাল্লার বাস বন্ধ রেখেও কার্যত কোনো ফল আসেনি। মানুষ গ্রামে পৌছেছে যে যেভাবে পেরেছে। করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পুরো দেশকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে যথেষ্ট। ঈদ শেষে আবার গাদাগাদি করেই কর্মস্থলে ফিরবে মানুষ। এর মধ্যে করোনার ভাইরাস বহনকারী যদি কেউ থাকেন তো তার মাধ্যমে তা গ্রামেও পৌছে যেতে পারে।

তাছাড়া শপিংমল,দোকানপাঠ,হাট-বাজার সবস্থানেই ছিল মানুষের উপচে পরা ভিড়। বিপরীতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যপারে অধিকাংশই ছিল চরম উদাসীন। ফলে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পরার মতো পরিস্থিতি আমরাই তৈরি করেছি। আমরা যদি পাশর্^বর্তী দেশ ভারতের করোনা পরিস্থিতির দিকে লক্ষ্য করি তাহলে দেখবো যে তাদের আজকের এই করুণ পরিস্থিতির জন্য জনাকীর্ণ কিছু কর্মকান্ড দায়ী।

ভারতে পাওয়া করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট যা বিশে^র প্রায় অর্ধশতাধিক দেশে পাওয়া গেছে। এই ডাবল মিউট্যান্ট ভ্যারিয়েন্ট অত্যন্ত বিপজ্জনক। আমাদের দেশেও ভারতের ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া গেছে। যা ছড়িয়ে পরা অস্বাভাবিক নয়। আর এর ক্ষতির তীব্রতা যে কতখানি তার প্রমাণ ভারত এবং অন্য প্রতিবেশী নেপালে দেখতে পারছি।

কয়েকদিন আগেও নেপালে করোনার তীব্রতা না থাকলেও এখন করোনায় বিপর্যস্থ নেপাল। এ থেকে আমাদের চিন্তা ভাবনা করার দরকার আাছে। করোনা ভাইরাসের টিকা নিয়ে সাময়িক সমস্যা তৈরি হলেও চীন ও রাশিয়া থেকে টিকা আনার প্রস্ততি এবং চীনের কিছু টিকা ইতিমধ্যেই আসায় কার্যক্রম চলবে। তাছাড়া দেশেই টিকা উৎপাদনের প্রস্তুতিও চলছে। ফলে টিকা কার্যক্রম পূর্ণ গতিতে চলবে। এটাই আশার বিষয়।

কারণ দেড় বছরেও একটি বড় অংশকেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যপারে অভ্যস্থ করা সম্ভব হয়নি। এদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার দাবি উঠছে। কারণ এত দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকাতে যে ক্ষতি হয়েছে তা পূরণ করা এখন পুরোপুরি সম্ভব নয়। কিন্তু আরও দীর্ঘদিন বন্ধ রাখলে এই ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বৃদ্ধি পাবে। শিক্ষার এই ক্ষতি আমাদের বহু বছর ধরে বহন করতে হবে। দেশে ৬০ হাজারের বেশি কিন্ডারগার্টেনের ১০ লাখ শিক্ষক এখন মহাসংকটে দিন পার করছে। এই শিক্ষকদের জীবিকার উৎস দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। বেকারত্বের বাজার করোনার কারণে বেড়েছে।

এর সাথে আরও যোগ হলে তা সংকট বৃদ্ধি করবে। কয়েকটি জরিপেও স্কুল খোলার পক্ষেই অভিভাবকরা বেশি সম্মতি দিয়েছেন। সম্প্রতি পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিচার্স সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্রাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) এর যৌথ গবেষণা জরিপে ৯৭ দশমিক ৭ শতাংশ প্রাথমিক শিক্ষার্থীর অভিভাবক স্কুল খুলে দিতে বলছেন। তারা সন্তানদের স্কুলে পাঠাবেন। আর মাধ্যমিকের ৯৬ শতাংশ অভিভাবক সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে সবকিছু নির্ভর করবে করোনা পরিস্থিতির ওপর।

একটি দীর্ঘসময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে শিক্ষার্থীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে দূরে আছে এবং অনেক শিক্ষার্থী বই থেকেও দিনের বড় অংশই দূরে থাকছে। এই দীর্ঘ বিচ্ছিন্ন সময়ে তাদের ভেতর একঘেয়েমিত্ব বিরাজ করছে। মানসিকভাবে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তাদের জীবন যাপনের এই দীর্ঘ পরিবর্তন মনের ওপরও দীর্ঘ প্রভাব ফেলছে। ফলে করোনা পরবর্তী সময়ে আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ হবে শিক্ষার্থীদের বইয়ে মনোযোগ ফেরানো। আর যে ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে শিক্ষা ব্যবস্থা সেটার সমাধানের আগে আমাদের ভবিষ্যত নিয়ে ভাবতে হবে।

কারণ এটা নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না কবে নাগাদ করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিকহতে পারে। আর যদি তাই হয় তাহলে তো মাসের পর মাস তাদের এভাবে রাখা যায় না। যদিও তাদের ব্যস্ত রাখতে নানামুখী কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। দূরশিক্ষণ এবং অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে এই ঘাটতি পূরনের চেষ্টা করা হয়েছে। তবুও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে এতে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। বিপরীত চিত্র হলো শিক্ষার্থীরা ঝুঁকছে মোবাইল গেমসে।

দিনরাত তারা এই ডিভাইস নিয়েই ব্যস্ত থাকছে। এখান থেকে তাদের বের করতে হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার বিকল্প নেই। পড়ালেখার বিকল্প উপায়গুলো প্রয়োগের চেষ্টা করা হলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিকল্প নেই। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় ফিরতে হবে। তাদের মানসিক একঘেয়েমিত্ব দূর করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার ফলে অভিভাবকদের মধ্যেই সন্তানকে নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে। তাদের ভবিষ্যতি নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা। এখন এই দুই বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

করোনাভাইরাস সংক্রমণ ৫ শতাংশের নিচে না আসা পর্যন্ত হয়তো তা সম্ভব হবে না। সবদিক বিবেচনায় কিভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া যায় তা নিয়ে বা খুলে দেওয়ার পর সম্ভাব্য কি ঘটতে পারে তা বিবেচনা করতে হবে এবং দেশের জন্য যা মঙ্গল সেই সিদ্ধান্তই নিতে হবে। সেখানে অপেক্ষা ছাড়া কিছুই করার নেই। বিকল্প পন্থায় শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা এগিয়ে নিতে জোর দিতে হবে।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.