জয়নুল আবেদীন স্বপন।।
প্রাথমিক শিক্ষাকে বলা হয় শিক্ষার ভিত্তি। এ স্তরেই শিক্ষার হাতেখড়ি হয়। শিশুর সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত করতে ভিত্তি মজবুত করতে হয় আগে। প্রাথমিক শিক্ষা আজ নানাভাবে বাধাগ্রস্ত। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রতিযোগিতায় নেমেছে কিন্ডারগার্টেন ও কোচিং সেন্টারগুলো। ভালো মানের কিছু কিন্ডারগার্টেন স্কুল রয়েছে, যাদের রেজাল্ট সরকারি স্কুলের চেয়ে ভালো। সেখানে বেশি বেতন দিয়ে ধনীদের সন্তানরা লেখাপড়া করে। তবে ভালো মানের কিন্ডারগার্টেনের সংখ্যা খুব কম। অধিকাংশ কিন্ডারগার্টেন পরিচালিত হচ্ছে ভাড়া করা বাড়িতে। শিক্ষার নিয়মনীতি না মেনে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা কোচিং সেন্টারে ছেয়ে গেছে দেশ। এসবের শিক্ষকদের নেই তেমন শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণ। বিজ্ঞাপন দিয়ে, অভিভাবকদের লোভ দেখিয়ে, বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঘুরে শিক্ষার্থী সংগ্রহ করছে কোচিং সেন্টারগুলো। ইচ্ছামতো সিলেবাস তৈরি করে বইয়ের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। আড়াই বছর বয়স থেকে তিন বছরের শিশুকে কেজি স্কুলে ভর্তি করে শিক্ষায় বৈষম্য সৃষ্টি করা হচ্ছে। প্রাইভেট পড়া নিয়েও ধনী ও গরিব শিশুকে ভিন্ন চোখে দেখে কেজি স্কুল।
শিক্ষার প্রথম ধাপেই প্রতারিত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। অনিয়মের মধ্যে শিশুর মেধা জাগ্রত ও বিকশিত হতে পারে না। কলুষিত পরিবেশে শিশুর কাছ থেকে ভালো আচরণ আশা করা যায় না। শিশুর জন্য আনন্দঘন অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। যেখানে খেলার মাঠ নেই, সেখানে প্রাণ নেই। এমন পরিবেশে কোমলমতি শিশুদের দৈহিক, মানসিক ও নৈতিক বিকাশ ঠিকমতো হয় না। একশ্রেণির অসাধু, অদক্ষ ও বেকার যুবক সরকারকে ফাঁকি দিয়ে কোচিং সেন্টার খুলে শিক্ষার নামে রমরমা বাণিজ্য করেই চলেছে। অবৈধ এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ না হলে শিশুরা মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হতেই থাকবে।
শিশুরা পিতামাতার অমূল্য সম্পদ। শিশুর সম্ভাবনা ও শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে শিশুবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। এ পরিবেশেই শিশুর বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ঘটবে। ঝিমিয়ে পড়া প্রাথমিক শিক্ষাকে জাগিয়ে তুলতে সরকার যুগান্তকারী ও সাহসী ভুমিকা হাতে নিয়েছে। বছরের প্রথম দিন থেকেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কোটি কোটি শিক্ষার্থীর হাতে পাঠ্যবই পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে শিক্ষায় আমূল পরিবর্তন আসছে। ইতিমধ্যে মন্ত্রিসভায় ‘স্কুলমিল নীতি ২০১৯’-এর অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এখন থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দেড় কোটি শিক্ষার্থী দুপুরে একবেলা পুষ্টিকর গরম খাবার পাবে। শিশুদের বয়স উপযোগী স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য পুষ্টিকর খাবার শিশুর অধিকার পূরণ করবে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের টিফিনের জন্য আর বাইরের দোকানের ভেজাল খাবার খেতে হবে না। দীর্ঘ সময় বিদ্যালয়ে শিশুদের অবস্থান করতে অসুবিধা হবে না।
ধনী ও গরিবদের সন্তানদের মিলেমিশে থাকার সুযোগ আছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের শিক্ষার ওপর নিয়মিত বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। বিভিন্ন দিকে এসব সুবিধা থাকায় কেজি স্কুলে শিক্ষার্থী কমে আসবে আশা করা যায়। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার বৃদ্ধি ও ঝরে পড়া হ্রাসে সরকারের এ উদ্যোগ প্রশংসনীয়। নতুন করে কেজি স্কুল যাতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে গড়ে না ওঠে সেদিকে নজর দিতে হবে। কেজি স্কুল ঠেকাতে সরকার নার্সারি শ্রেণি চালু করেছে। সহানুভূতির দৃষ্টিতে বিচার করে শিশুর প্রয়োজনগুলো আগে মেটাতে হবে। শিশুজীবনের সার্বিক বিকাশকে যদি শৈশবে নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে তার ভবিষ্যৎ খুব একটা সুন্দর হয় না।
জয়নুল আবেদীন স্বপন : শিক্ষক ও শিশু সংগঠক, শ্রীপুর, গাজীপুর
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
