অনলাইন ডেস্ক :
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া হাফ ম্যারাথনে অংশ নিয়েছেন নয় (বাংলাদেশ, জাপান, চীন, ভারত, নেপাল, ভুটান, কেনিয়া, মালদ্বীপ ও থাইল্যান্ড) দেশের ৫ শতাধিক রানার। এসব প্রতিযোগী দুই দলে বিভক্ত হয়ে ১০ এবং ২১ কিলোমিটার ম্যারাথনে অংশ নেন।
আখাউড়া উপজেলা পরিষদ থেকে রাধানাগর, মোগড়া বাজার, কর্নেল বাজার, আদমপুর, বাউতলা ও আখাউড়া চেকপোস্ট হয়ে উপজেলা পরিষদ পর্যন্ত ২১ কিলোমিটার ও ১০ কিলোমিটার ক্যাটাগরিতে আখাউড়া উপজেলা পরিষদ থেকে চেকপোস্ট হয়ে আবার উপজেলা পরিষদ পর্যন্ত দৌড়ে অংশ নেন দৌড়বিদরা। এ ম্যারাথনের আয়োজক ছিল আখাউড়া ছাত্র কল্যাণ পরিষদ।
আখাউড়া হাফ ম্যারাথনে অংশ নেওয়া প্রতিযোগীদের একজন বাংলানিউজের নিউজরুম এডিটর আয়শা আক্তার তৃষ্ণা। তিনি ১০ কিলোমিটার ক্যাটাগরিতে ম্যারাথনে অংশ নিয়ে সাফল্যের সঙ্গে শেষ করেন দৌড়।

দৈনিক আটঘণ্টা অফিসের নানা দায়িত্ব সামলে কীভাবে তিনি নিজেকে দৌড়বিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রয়াস চালাচ্ছেন সেসব বিষয় নিয়ে কথা বলেন আয়শা আক্তার।
তিনি বলেন, ‘আমি মানসিক চাপ কমানোর জন্য দৌড় শুরু করি। ‘আখাউড়া হাফ ম্যারাথনে’ অংশ নিয়ে বেশ ভালো অভিজ্ঞতা হয়েছে। এ ধরনের প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশ নিতে চাই। ’
‘আখাউড়া হাফ ম্যারাথনে’ অংশ নেওয়ার জন্য নিজেকে কীভাবে প্রস্তুত করেছেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, টানা আটঘণ্টা ডেস্কে বসেই কাজ করতে হয়। এতে স্বাভাবিকভাবে মনের ওপর চাপ পড়ে। কিন্তু কাজের পাশাপাশি নিজেকে সবদিক দিয়ে ফিট রাখাটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর ম্যারাথনে অংশ নেওয়ার বিষয়টি যখন চূড়ান্ত করলাম, তখন একটা উত্তেজনা কাজ করছিল। এতবড় ইভেন্টে অংশ নেবো উত্তেজনা কাজ করবে এটাই তো স্বাভাবিক। এরমধ্যেই প্রস্তুতি চলছিল পুরোদমে। প্রতিদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই বের হয়ে পড়তাম দৌড়াতে। গড়ে ৫ থেকে ৬ কিলোমিটার দৌড়াতাম, সঙ্গে থাকতেন বসুন্ধরা রানার্সের দৌড়বিদরা। প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য একটু বেশিই পরিশ্রম করতে হয়েছিল কয়েকদিন। ’

আখাউড়া ম্যারাথন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আখাউড়ায় দৌড়ানোর রুট ছিল দুটো। এগুলো যেমন মনোরম তেমনই সুন্দর। রাস্তার দুইপাশে ধান ও ক্যাপসিকাম ক্ষেত। ওই রুট দিয়েই টকটকে লাল-সবুজ মিশ্রিত জার্সি গায়ে ছুটেছেন ২১ ও ১০ কিলোমিটারের রানাররা। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছিলো যেন লাল-সবুজ পতাকার মিছিল যাচ্ছে। এর পাশাপাশি গ্রামবাসী রাস্তার দুইপাশে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে উৎসাহ দিয়েছেন রানারদের। যা আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে সবসময়। তবে, একটা মজার ঘটনাও কিন্তু ঘটেছে দৌড়ানোর সময়। দৌড়ে একটা জায়গায় এসে পৌঁছানোর পর দেখি রাস্তাটা একটু ফাঁকা। এমন সময় আমাকে দৌড়াতে দেখে মাঠ থেকে উঠে এলেন এক কৃষক। আমি দৌড়াচ্ছি, এরমধ্যে তিনি দৌড়ে এসে জানতে চাইলেন, ‘এই ছ্যামড়ি দৌড়াচ্ছিস কেন? কী হয়েছে তোর?’ তখন আমি তাকে হাসি দিয়ে বললাম, এটা খেলার দৌড়, পুরস্কার পাওয়ার জন্য। ’ এরপর তিনি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
দৌড় শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত আসার ক্ষেত্রে তৃষ্ণার পথচলা সহজ ছিলো না। দৌড়ানোর সময় মানুষ তাকিয়ে থাকতো, ছুড়ে দিতো কটু মন্তব্য। যদিও এসবকে তিনি মোটেও পাত্তা দেননি, এখনও দেন না। কিন্তু এ ধরনের আচরণে কষ্ট পাওয়াটাই স্বাভাবিক। স্মৃতি হাতড়ে সেসব দিনের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রথম প্রথম যখন দৌড় শুরু করি, তখন লোকজনের কটু কথায় কষ্ট পেতাম। এখন আর পাত্তা দিই না। কারণ আমি যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি তা তো আর নিজে নিজে এসে ধরা দেবে না। আমাকেই লক্ষ্যপানে ছুটে চলতে হবে অবিরাম। ’
দৌড় মানসিক প্রশান্তি দেবে, চাপমুক্ত রাখবে- এমন চিন্তা থেকেই দৌড় শুরু করেন তৃষ্ণা।

এ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বেশ কয়েকমাস হলো দৌড় শুরু করেছি। এর আগে আমি ৫ মিনিট হাঁটলেই হাঁপিয়ে যেতাম। এখন আমি ২১ কিলোমিটার দৌড়াতে পারি প্রায় ৩ ঘণ্টায়। একটা প্রক্রিয়ার মধ্যেই মূলত এটা সম্ভব হয়েছে। প্রথমে আমি প্রতিদিন বাসায় ইয়োগা ও দৌড়ের জন্য বিভিন্ন সংগঠনের ভিডিও দেখে শেখার চেষ্টা করেছি। এরপর আমি একাই দৌড় শুরু করি। হঠাৎ আমার বন্ধু দৌড়বিদ বাবর আলী আমাকে বললেন, ‘ তুমি তো বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় থাকো, ওখানে বসুন্ধরা রানার্সের টিম আছে। তুমি তাদের সঙ্গে জয়েন করো না কেন? না হলে একা একা দৌড়ালে খেই হারিয়ে ফেলবে। ’ তার দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই রকি ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি একদিন খুব ভোরে আসতে বললেন। সেদিন আমার প্রথম ক্লাস ছিলো ইয়োগা। আমাদের ইয়োগা গুরু হলেন নায়লা বাশার আপু অসাধারণ ও হাস্যোজ্জ্বল একজন মানুষ। এভাবেই শুরু। ’
‘এরপর নিয়মিত গ্রুপের ইভেন্টগুলোতে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে চলছিল প্রস্তুতি। মহামারির মধ্যে আখাউড়া ম্যারাথনে অংশ নেওয়াটা একটা চ্যালেঞ্জ ছিল। দৌড় শেষ করতে পেরেছি এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় পাওয়া। আমার স্বপ্ন, ধীরে ধীরে নিজেকে শীর্ষস্থানীয় নারী দৌড়বিদদের কাতারে নিয়ে যাওয়া। ’
প্রতিদিন আটঘণ্টা কাজ করতে হয় অফিসে। এরমধ্যে ২১ দিন পরপর করতে হয় নাইট ডিউটিও। অনলাইন সংবাদমাধ্যমে কাজ করেন বলে চাপটাও বেশি। সব সামলে দৌড়ানোর সময় ঠিকই বের করে নেন বাংলানিউজের এ নিউজরুম এডিটর।

তিনি বলেন, ‘আমার পেশা যেহেতু সাংবাদিকতা, এখানে সময় বের করা খুবই কঠিন। অফিসের ডিউটির টাইম বিবেচনায় করে আমাকে দৌড়ানোর জন্য সময় বের করতে হয়। তবে, সকালের সময়টাতেই বেশি দৌড়ানার চেষ্টা করি। এতে চাপটা কমে, দিনটা ভালো। যখনই সুযোগ আসে হাতে বিভিন্ন ইভেন্ট অংশ নিই। ইভেন্ট না থাকলে প্রায় প্রতিদিনই ৫ কিলোমিটার করে দৌড়াই, বাসায় শরীরচর্চা করি। ’
দৌড় শুরু করতে চাইলে কিছু বিষয়ের প্রতি অবশ্যই নজর দেওয়া উচিত। সে সম্পর্কে তৃষ্ণা বলেন, ‘দৌড় শুরু করার আগে আপনাকে লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। কতটুকু দৌড়াবেন তা যেন হয় পূর্বনির্ধারিত। প্রথমে আপনি চাইলে ২০ মিনিট দৌড়াবেন, আর ২০ মিনিট হাঁটবেন। ধীরে ধীরে তা সময় বাড়াতে পারেন। তবে, ভালো হয় নিয়মিত দৌড়ায় এমন কোনো দলের সঙ্গে যোগ দিতে পারলে। সবশেষে বলবো, নিয়মিত দৌড়ানো শুরু করুন, সুস্থ থাকুন।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
