অনিন্দ্য আদিত্য বিশ্বাস: আঠারো শতকের ঢাকা, সে সময় এক প্রাণবন্ত অভিবাসী সম্প্রদায় ছিল আর্মেনীয়রা। সুদূর আর্মেনিয়া থেকে কেউ অস্তিত্বের তাগিদে, কেউবা ব্যবসা ভাগ্য খুলতে বসতি গড়ে তৎকালীন বাংলায়। সুজলা-সুফলা এই বাংলার মাটি ছিল বরাবরই উদার। ব্যবসা, ধর্মপ্রচার কিংবা জীবনধারণের তাগিদে যুগে যুগে এখানে এসেছে কত শত জাতি আর সম্প্রদায়। তুর্কি, আফগান, মুঘল, পর্তুগিজ, ফরাসি, ওলন্দাজ, ইংরেজ—এই সুদীর্ঘ তালিকায় একসময়ে ঢাকা শহরের প্রভাবশালী হিসেবে জায়গা করে নেয় আর্মেনীয়রাও। যদিও সংখ্যায় তারা ছিল তুলনামূলকভাবে কম। কিন্তু তাদের পদচারণা ঢাকার আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে এক গভীর ছাপ ফেলে গেছে। তাদের ফেলে যাওয়া স্মৃতিগুলো আজও এই শহরের অলিতে-গলিতে জীবন্ত হয়ে আছে।
“আর্মেনিয়া” একটি ফার্সি শব্দ। যার অর্থ “জমির মালিক”। বাংলা অভিধান ঘাটলে “ঠেলা, টোলা” ইত্যাদী আর্মেনিয়ান শব্দের সন্ধান পাওয়া গেলেও, আশ্চর্যজনকভাবে বাংলা সাহিত্যে আর্মেনিয়ানদের তেমন কোন অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। তবে, ১৮৯৩ সালে আর্মেনিয়দের সাহিত্য, রাজনীতি, সংস্কৃতি নিয়ে একটি সাময়িকীর সন্ধান পাওয়া যায়। তাও প্রকাশিত হয় স্বল্প সময়ের জন্যে। জনশ্রুতি আছে, ভিক্টোরিয়া পার্কে কাছে আর্মেনিয়ানদের একটি ক্লাব ছিল। অনুমান করা যায় সেখানে তাদের সাহিত্য আড্ডা বসতো।
বাংলায় আর্মেনীয় ব্যবসায়ীদের আগমন ঘটে ষোড়শ শতক থেকেই। মূলত রাফাভি রাজবংশের অধীনে ককেশাস বিজয়ের পর পারস্যে নির্বাসিত আর্মেনীয় ব্যবসায়ীরা ইরানি অভিযাত্রীদের সাথে বাংলায় আসেন। মোগল সম্রাট আকবরের বদ্যনতায় প্রথম ভারতে বসতি স্থাপন করেছিল তারা। তবে বাংলায় প্রথম পাকাপাকিভাবে বসবাসের অনুমতি পায় মোগল সম্রাট আরঙ্গজেবের আমলে ১৬৬৫ সালে। সেসময় মুর্শিদাবাদের অন্তর্গত সৈয়দাবাদে তারা বসতি স্থাপন করে। ১৯১৩ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তুরষ্কের অটোমান সাম্রাজ্যে কর্তৃক আর্মেনিয় গণহত্যা সংগঠিত হয়। বিংশ শতাব্দীর এই ভয়াবহ গণহত্যায় মারা যায় ১.৫ মিলিয়ন আর্মেনিয় আর শরণার্থী হন অগণিত। তবে, ঢাকায় আগত আর্মেনিয়রা শরণার্থী ছিল না।
ঢাকার বুকে তাদের মূল আকর্ষণ ছিল বস্ত্র ও রেশম বাণিজ্য। একটা সময়ে তারা গুজরাটি ও উত্তর ভারতীয় ব্যবসায়ীদের সাথে পাল্লা দিয়ে রেশম বাণিজ্যে আধিপত্য বিস্তার করেন। এমনকি লবণ, শিপিং ও পাট ব্যবসাতেও তাদের ছিল এক অগ্রণী ভূমিকা।
শুরুর দিকে আর্মেনীয়রা আরমানিটোলাতে বাস করতেন না। বরং ঢাকার মৌলভীবাজার ও নলগোলা এলাকায় তাদের বসতি ছিল। বসতি ছিল তেজগাঁও এলাকাতেও। কিন্তু, উনিশ শতকে এসেছে এই এলাকায় রেললাইন স্থাপন হলে। তারা চলে আসতে থাকে মালিটোলা, আর্মেনিটোলা এলাকায়।
১৭৮১ সালে পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় প্রতিষ্ঠিত হয় আর্মেনীয় অ্যাপোস্টলিক চার্চ অফ দ্য হোলি রেজারেকশন। এই গির্জার নামেই এলাকার নাম হয় আরমানিটোলা, যা আজও তাদের স্মৃতি বহন করে চলেছে। গির্জা নির্মাণের জমি দান করেন আগা মিনাস ক্যাটচিক। চার্চের বেলিফ্রি এবং ঘড়ি টাওয়ার তৈরি হয় ১৮৩৭ এর কোন একসময়ে। যার অর্থায়ন করেছিলেন জোহানেস ক্যারাপিয়েট সার্কিস। সার্কিস ছিলেন লবণ ব্যবসায়ী। ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে চুক্তিও করেছিলেন। বলা ভাল, ১৭৮৭ সালের ঢাকার ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় তিনি বিপুল অঙ্কের সহায়তা প্রদানও করেছিলেন। চার্চের বেলিফ্রি ঘড়িটি বন্ধ হয়ে যায় ১৮৮০ সালের দিকে। ব্যয়সংকোচন নীতির কারণে চার্চ ঘন্টাটি দীর্ঘদিন বন্ধ রেখেছিল। কিন্তু ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে টাওয়ারটি ধ্বংস হয়ে যায় । চার্চের ইতিহাসে স্মরণীয় ঘটনা ছিল এটা। সেই সাথে আরও এক দু:সাহসিক চুরির ঘটনা জানা যায় ১৯৮৫ সালের এক চিঠিপত্রের মাধ্যমে। জানা যায়, টাওয়ারের ৫টি ঘণ্টার মধ্যে একটি বড় ঘণ্টা নামিয়ে ঠেলাগাড়িতে চাপিয়ে এক চোর স্যাকরাদের কাছে বিক্রি করার চেষ্টা করেছিল। লোকশ্রুতি আছে টাওয়ারের ঘন্টা ৪ মাইল পর্যন্ত শোনা যেত। ঘন্টার শব্দ শুনে সময় ঠিক করে নিত বাসিন্দারা।
১৯১০ সালে চার্চের মেঝেতে মার্বেল পাথর বসানো হয়। তারপর যোগ হয় বৈদ্যুতিক আলো ও পাখা। এগুলো দান করেছিলেন মিঃ আরাথুন স্টিফেন। তার দাদা রেভারেন্ড হাইরাপিয়েট গ্রেগর বাশখুমিয়ান ছিলেন চার্চের প্রধান পুরোহিত। যিনি ১৮২৮ সাল থেকে ১৫ বছর ধরে গির্জার পৌরহিত্য করেছিলেন। চার্চ থেকে অবসর নেওয়ার সংবধর্নার সময় হঠাৎই মারা যান তিনি। তাকে সমাহিত করা হয়েছিল গির্জার উঠানেই। চার্চের ভেতরে আছে পোগোজ স্কুলের প্রধান শিক্ষক চিত্রকর সি. পোট (চার্লস পোর্ট) এর আঁকা বিখ্যাত তৈলচিত্র “দ্যা লাস্ট সাপার”। আর্মেনিয়দের অধিকাংশ ব্যাপস্টিক হলেও তেজগাঁওয়ের রোমান ক্যাথলিক চার্চের কবরস্থানে তাদের পুরোনো সমাধি আছে। এই সমাধিগুলোর শিলালিপি সবগুলো ১৭৪১ থেকে ১৭৯৬ সালের মধ্যে।
আর্মেনীয়রা শুধু ব্যবসায়ীই ছিলেন না। তারা ছিলেন শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবী। নিকোলাস পোগোজ, যিনি ১৮৪৮ সালে ঢাকায় আসেন, তিনিই দেশের প্রথম বেসরকারি স্কুল ‘পোগোজ স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ঢাকা পৌরসভা আইনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আরেকজন শিক্ষাবিদ আরাতুন, যিনি নরমাল স্কুলের অধ্যক্ষ হিসেবে তার ছাত্রদের বাংলা ভাষায় সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ানোর মাধ্যমে স্কুলটিকে খ্যাতি এনে দিয়েছিলেন।
ঢাকার নগরজীবনে আর্মেনীয়দের অবদান ছিল চোখে পড়ার মতো। ১৮৫৬ সালে স্টিফেন আরাতুন শিরকোর ঢাকায় প্রথম ঘোড়ার গাড়ি, যা ‘ঠিকা গাড়ি’ নামে পরিচিত ছিল, চালু করেন। এই ঘোড়ার গাড়িই একসময় ঢাকার প্রধান গণপরিবহনে পরিণত হয়েছিল। শাঁখারীবাজারে ‘সিরকো এন্ড সন্স’ নামের তাদের একটি দোকানে চা সহ বিভিন্ন ইউরোপীয় পণ্য বিক্রি হতো। এমনকি ‘মেসার্স আনানিয়া এন্ড কোম্পানি’র মাধ্যমে মদ বিক্রির ব্যবসাও তারা চালাতেন।
আর্মেনীয়দের স্থাপত্য নিদর্শন আজও ঢাকার বুকে দাঁড়িয়ে আছে। ফরাশগঞ্জের রূপলাল হাউস, আরমানিটোলায় নিকোলাস পোগোজের বাড়ি (বর্তমানে বুলবুল ললিতকলা একাডেমি), আনন্দ রায় স্ট্রিটের স্টেফানের বাড়ি এবং বাবুবাজার পুলের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত কাঁচাতুরের বাড়ি—এগুলো সবই তাদের নির্মিত। আর্মেনীয় গির্জার মূল ভবনের ভেতরের ১৪ ফুট প্রশস্ত আঙিনা, কাঠের তৈরি বেদি এবং গ্যালারিগুলো তাদের ধর্মীয় স্থাপত্যের চমৎকার উদাহরণ।
উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে আর্মেনীয়দের প্রভাব কমতে শুরু করে। ব্যবসা-বাণিজ্য মন্দা হতে থাকে, জমিদারি হাতছাড়া হয়। অনেকে ঢাকা ছেড়ে কলকাতায় পাড়ি জমান। ব্রিটিশদের বাণিজ্যিক একচেটিয়াত্ব ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কারণে তাদের জনসংখ্যা কমতে থাকে। ১৯৭১ সালের আগে বিভিন্ন বড় কোম্পানির ট্রেডিং লাইসেন্স বাতিল হলে অনেক আর্মেনীয় ঢাকা ছাড়তে বাধ্য হন। আরাতুনের উত্তরাধিকাররা খাজা আজিমুল্লাহের কাছে জমি বিক্রি করে কলকাতায় চলে যায়, লুকাস জমিদারি বিক্রি করেছিলেন আনন্দ চন্দ্র রায়ের কাছে, পোগোজ জমিদারি বিক্রি করে লন্ডন চলে যায়। তবে, পোগোজের বংশধরের কবর এখনও ওয়ারীর ঢাকা খ্রিস্টান কবরস্থানে পাওয়া যায়। আরেকজনের কথা বলা যায় মাইকেল জোসেফ মার্টিন। যিনি ছিলেন ঢাকার শেষ আর্মেনীয়, ২০২০ সালে কানাডায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি সাধ্যমত চেষ্টা করেছিলেন গীর্জার সম্পত্তি টিকিয়ে রাখতে। মামলা মোকদ্দমার মাধ্যমে দখল হওয়া গীর্জার সম্পত্তি পুন:রুদ্ধার করা, বিভিন্ন সামাজিক কার্যকলাপ, প্রতি বৃহস্পতিবার খাদ্য বিতরণ কর্মসূচী, দেশে- বিদেশে ছড়িয়ে পড়া ঢাকার পুরনো আর্মেনিয়ান পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করার মত গুরুদায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। মার্টিন নিজেও একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। ঢাকা ও খুলনায় বেশ কয়েকটি ব্যবসা ছিল তার।
আর্মেনিয়াকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে চায় নি পাকিস্তান। এর প্রতিবাদে কিংবা ঢাকার প্রতি ভালবাসার সুবাদে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর আর্মেনিয়ার ইয়েরেভানের জায়গাটির নাম রাখা হয়েছিল ‘বাংলাদেশ’।
যদিও বর্তমানে ঢাকায় কোনো আর্মেনীয়ান নেই। তবে, একসময় ঢাকায় প্রায় ৩০০ আর্মেনিয়ানদের সংখ্যার নজির পাওয়া যায়। ১৮৩২ সালে হেনরি ওয়ালটার্সের মারফত জানা যায়, ঢাকায় ১২৬ জন আর্মেনীয় ছিলেন। যার মধ্যে ৪৯ জন ছিলেন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ, ৩৭ জন প্রাপ্তবয়স্ক মহিলা, ২৫ জন ১৬ বছরের কম বয়সী ছেলে এবং ১৫ জন ১৬ বছরের কম বয়সী মেয়ে। বাড়ী ছিল ৪২টি। ১৮৭০ সালে সেই সংখ্যা কমে ১০৭ জনে দাঁড়ায়, যার মধ্যে একজন পুরোহিত, পাঁচজন জমিদার, তিনজন বণিক, একজন ব্যারিস্টার, পাঁচজন দোকানদার এবং চারজন সরকারি কর্মচারী ছিলেন। আর বাড়ী ছিল ৪০টি। ১৮৩৩ থেকে ১৯১৮ সালের মধ্যে চার্চের রেকর্ড অনুযায়ী, ২০০ টিরও বেশি মৃত্যু, ২৫০ টিরও বেশি ব্যাপটিজম এবং ৫০ টিরও বেশি বিবাহ নথিভুক্ত হয়েছিল।
আজ আর্মেনীয় না থাকলেও, তাদের ফেলে যাওয়া ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো আমাদের মূল্যবান সম্পদ। আর্মেনীয় চার্চ, তাদের সমাধিফলক, এবং অন্যান্য স্থাপত্য নিদর্শনগুলো আমাদের বহুসাংস্কৃতিক অতীতকে স্মরণ করিয়ে দেয়। বাংলাদেশ সরকার ও আর্মেনিয়া সরকারের যৌথ প্রচেষ্টায় এই ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলো সংরক্ষণ করা হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ঢাকার এই সমৃদ্ধ ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারে। তাদের এই নী:রব বিদায় হয়তো ঢাকার ইতিহাসের এক অধ্যায় শেষ করে দিয়েছে, কিন্তু তাদের অবদান চিরকাল এই শহরের স্মৃতির পাতায় উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।
লেখকঃ শিক্ষার্থী, ব্যবসা বাণিজ্য বিভাগ (উচ্চ মাধ্যমিক ২য় বর্ষ) নটরডেম কলেজ।
শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/৩০/০৭/২০২৫
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
