সুশিক্ষাতেই সুসন্তান

কানিজ ফাতেমা শাহীন||

আমার সন্তানের চোখে আমি পৃথিবীর সবচেয়ে রাগী মা। আবার আমরা ভাইবোন আমাদের মাকে নাম দিয়েছিলাম রানী এলিজাবেথ তার মেজাজমর্জির কারণে। ভাবছেন, আমি বা আমার মা বদমেজাজি? সন্তানকে মারধর করি কিংবা গালিগালাজ? মোটেই তা নয়। মাঝে মধ্যে পড়াতে গিয়ে কানমলা দিয়েছি কিংবা দু-একটা থাপ্পড়। শক্ত মার কি ও তা জানেই না। সন্তান যদি মুখের কথায়, চোখ রাঙানিতে ভয় না পায়, তার পিঠে বেত ভাঙলেও কি কাজ হবে? বরং উলটো হওয়ারই আশংকা। এটা আমার ধারণা (অবশ্য কিছু ব্যতিক্রমও আছে)। তাই সহজ পথই বেছে নিয়েছিলাম। প্রথমে দু-একবার বুঝিয়ে বলার চেষ্টা, না শুনলে চিৎকার করে বলা। এ পর্যন্তই! কৌশলটা কিন্তু আমার মায়ের কাছেই শেখা। মাও আমাদের ভাইবোনদের কখনো মারধর করেননি। তবু তার কথা মেনে চলেছি। বাড়িতে কড়া শাসন না থাকলেও খেয়াল রাখা হতো প্রতিটি আচরণ। কোথায় যাচ্ছি কী করছি!

সন্তানকে শুধু শিক্ষা নয়, সুশিক্ষা দেয়া প্রয়োজন। রেজাল্টের দিকে না দৌড়িয়ে ওকে গড়ে তুলতে হবে একজন মানবিক মানুষ হিসেবে। সন্তান যখন ধর্ষক হচ্ছে, খুনি হচ্ছে, গুন্ডা-মাস্তান কিংবা হিরোইনখোর- সে কি একদিনেই হচ্ছে? কখনোই নয়। ধীরে ধীরেই সে এ পথে এগুচ্ছে। কিন্তু আমরা কেউই তার দিকে নজর দিইনি। আর যখন নজরে আসে, তখন অনেক দেরি হয়ে যায়। জন্মের পর সন্তানের বেশির ভাগ সময় কাটে মায়ের সাথে। ছোট্ট শিশুটি খেলতে খেলতে বাবা-মায়ের দৈনন্দিন কাজকর্ম, কথাবার্তা, আচরণ অনুসরণ করে। শিশুরা কাদামাটির মতো, ওকে যে ছাঁচে ঢালা যায়, সে আকৃতিই নেবে। তাই ওর মনোজগত তৈরিতে পূর্ণ দৃষ্টি দেয়া উচিত। স্মার্টফোনের বদলে ওর সামনে ফুল, পাখি, পাহাড়, সমুদ্র ইত্যাদির ছবি সমৃদ্ধ সুন্দর বই দিই, ছবি আঁকার সরঞ্জাম দিই, ওকে নিয়ে ঘুরতে যাই পার্কে, গ্রামে কিংবা আত্মীয়স্বজনের বাড়ি, থিয়েটার, সিনেমা, চিত্র প্রদর্শনী, বইমেলাসহ বিভিন্ন জায়গায়। ওকে সুন্দর সুন্দর গল্প শোনাই। ওর সঙ্গে গড়ে তুলি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। যেন নির্ভয়ে সব কথা বলতে পারে।

শিশুকাল থেকে কৈশোরকালীন সময়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সে নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়। এ সময়ে ওর ভুল করাটাই স্বাভাবিক। একজন বন্ধুর মতো সেই ভুলগুলোকে শুধরে দিই। ধমক বা ভয় দেখিয়ে নয়। কৈশোরে ওকে সৃষ্টিশীল কাজে উদ্ধুদ্ধ করতে হবে। গান, ছবি আঁকা, খেলাধুলা কিংবা যেটাতে বেশি আগ্রহ। পড়ালেখার পাশাপাশি ব্যস্ত রাখতে হবে সৃষ্টিশীল কাজে। সংসারের প্রয়োজনে অনেক মাকে ঘরের বাইরেও কাজ করতে হয়। কর্মজীবী মায়ের সন্তানের জন্য নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। সন্তানের সবকিছু মনিটর করার পাশাপাশি সব সময় ওর প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখা দরকার। কোনো সমস্যা কিংবা অঘটন ঘটলে অবশ্যই ওর আচরণে প্রভাব পড়বে। যদি সন্তানের দিকে পূর্ণ সজাগ দৃষ্টি থাকে, তবে তা নজর এড়াবে না। মায়ের পাশাপাশি বাবার ভূমিকাও কম নয়। অনেক সময় মা একা বুঝে উঠতে পারেন না কী করা দরকার। সেক্ষেত্রে বাবাকেও এগিয়ে আসতে হবে। যে সংসারে বাবামায়ের সাথে সন্তানের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকে, সে সন্তানের খারাপ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

নিকেতন, ঢাকা থেকে


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.