এইমাত্র পাওয়া

সংশোধিত এমপিও নীতিমালায় প্রভাষকদের বৈষম্যের অবসান চাই

মোঃ মোস্তফা কামাল।।

শিক্ষার মান উন্নয়নে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের মধ্যে অন্যতম হলো বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা 2010 প্রণয়ন। ওই নীতিমালা দেখেই বুঝা গেল দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংখ্যা বৃদ্ধি ,শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টার নিদর্শন।

এতে কিছু অসংগতি ধরা পড়ায় শিক্ষকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার কমিটি করে দেন নতুন নীতিমালা প্রণয়ন হয় নীতিমালা 2018, কিন্তু এ নীতিমালায়ও অসঙ্গতি ও বৈষম্য দুরে কাজের কাজ কিছুই হয়নি এবং বিশেষ করে প্রভাষকদের কাঙ্ক্ষিত নীতি প্রণীত না হওয়ায় মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রী ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের আন্তরিক উদ্যোগে একে সংশোধনের জন্য আবার সংশোধনী কমিটি করে দেয়া হয়।

উক্ত কমিটির কাছে বিভিন্ন মাধ্যমে শিক্ষা ও শিক্ষক বিরোধী বিষয় সমূহ তুলে ধরা হয়। কমিটি দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর গত 23 নভেম্বর 2020 তারিখে যে সংশোধিত নীতিমালা প্রকাশ করে এতে সরকারের গৃহীত অনেক প্রশংসনীয় শিক্ষাবান্ধব নীতিমালা যোগ হলেও প্রভাষকদের ক্ষেত্রে বৈষম্য সৃষ্টিকারি অবমূল্যায়নকারী, শিক্ষকদের স্বার্থবিরোধী দুইটি বিধি সরকারের বিপুল আয়োজন কে ম্লান করে দেয়। বিধি ২টি হলো-

১।উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ ও মাদ্রাসার আলিম স্তরের প্রভাষকদের পূর্বে বিদ্যমান সহকারী অধ্যাপক এর পদবী কেড়ে নিয়ে জৈষ্ঠ্য প্রভাষক নাম দেয়া হয়।
2।ফাজিল-কামিল মাদ্রাসার প্রভাষকদের 50% সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি সু-খবর হলেও এটি জাতীয়ভাবে না করে পূর্বের মত বৈষম্যসৃষ্টিকারী পদ্ধতি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে 50% দেয়ার কথা বলার কারণে এটিও পূর্বের অনুপাত প্রথার বৈষম্যকে পূনর্বহাল করা হলো।

(কলেজের আগের নীতিমালায় ডিগ্রী কলেজের প্রভাষকদের পদোন্নতিও ফাজিল-কামিল মাদ্রাসার প্রভাষকদের সহকারী অধ্যাপক পদে পদন্নোতির মত ছিল।ওনাদের সংশোধিত নীতিমালা এখনো প্রকাশিত হয় নাই।তাই ওটি সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত জানার সুযোগ হয়নাই)

প্রকাশিত সংশোধনীতে উক্ত ২টি বিধি বৈষম্যকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।এতে শিক্ষকের দাবীর প্রতিফলন হয়নি বরং অনেকে একে “ভাতে না মেরে জাতে (সম্মানে) মারা” বলেছেন,কেউ কেউ “কাটা গাঁয়ে নুনের ছিটাও বলেছেন”।এটি প্রভাষকদেরকে আরো অবমূল্যায়িত ও মর্মাহত করেছে।বঞ্চিত প্রভাষকগণ একে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

 অবমূল্যায়নকারী ও প্রভাষকদের স্বার্থবিরোধী দুইটি বিধির পর্যালোচনা:

১।পূর্বের নীতিমালায় ছিল উচ্চমাধ্যমিক কলেজ,ডিগ্রী কলেজ, আলিম,ফাযিল ও কামিল মাদরাসার(সকল স্তরের) প্রভাষকগণ এমপিওভূক্তির ৮ বছর পূর্তিতে ৫:২অনুপাত অনুযায়ী সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেতেন।সংশোধিত নীতিমালায় সব প্রভাষকের জন্য ৫০% হারে পদোন্নতির নিয়ম রেখে একই বেতন কোড-৬ , সমপরিমাণ-বেতন-৩৫৫০০টাকা বেতন ঠিক রেখে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি করে শুধু উচ্চমাধ্যমিক কলেজ ও আলিম স্তরের প্রভাষকদের জন্য সব ঠিক রাখলেও তাদেরকে পদবী দেয়া হয় “জৈঠ্য প্রভাষক” অন্যদের মত তাদেরকে সহকারী অধ্যাপকের সুযোগসুবিধা দিলেও তাদের সম্মানজনক পদবী “সহকারী অধ্যাপক” কেড়ে নিয়ে “জৈঠ্য প্রভাষক” নামে নামকরণ করা হয়।এতে তাদের অর্থিক সুবিধাগত সব ঠিক রাখলেও সম্মানজনক পদবী বাদ দিয়ে অবমূল্যায়ন করা হলো।

এতে ওই স্তরের শিক্ষকদের উৎসাহের পরিবর্তে হতোদ্যম করে দেয়া হলো। যা শিক্ষার মানোন্নয়নে চরম বাধা।
শিক্ষার মানোন্নয়নে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে একই অর্থ দিয়ে একজনকে অবমূল্যায়ন করে শিক্ষাখাতে উপকারের পরিবর্তে ক্ষতি করে লাভ কি? রাষ্ট্র যেহেতু অর্থ ব্যয় করছে কমিটির সদস্যগণ তাদের পদবী টা দিতে সমস্যা কোথায়?

তাছাড়া পদবীগত এই অবমূল্যায়নের কারণে উচ্চমাধ্যমিক কলেজও আলিম মাদরাসার সকল প্রভাষক এবং ফাযিল-কামিল স্তরের পদোন্নতি বঞ্চিত সকল প্রভাষকগণ অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ হতে পারবেন না। কামিল মাদ্রাসার মুহাদ্দিস হতে পারবেন না।একই সমান যোগ্যতা,অভীজ্ঞতা থাকার তার সহকর্মী পদোন্নতি পেলেও তাকে প্রভাষক স্তরেই থাকতে হবে।

 এক দেশ দুই নীতি, দুর্গতি না প্রগতি:
উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ এর নীতিমালায় হাই স্কুলের সহকারি শিক্ষক থেকে উঠে আসা সহ-প্রধান শিক্ষক/ প্রধান শিক্ষকগণের উচ্চ মাধ্যমিক কলেজের অধ্যক্ষ/উপাধ্যক্ষ হওয়ার নীতি কোন কালেই ছিলনা এখনো নাই।

কিন্তু একই স্তরের আলিম মাদ্রাসার নীতিমালায় হাইস্কুল লেভেলের দাখিল মাদরাসার সহকারী মৌলভী থেকে আসা সহঃসুপার/সুপারদেরকে উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ লেভেলের আলিম মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষ ও অধ্যক্ষের সুযোগ দেয়া হলো তাও আবার এই স্তরের শিক্ষকদের পদমর্যাদা অবমূল্যায়ন করে এবং তাদের উপাধ্যক্ষ হওয়ার পথ রুদ্ধ করে। এটি মাদ্রাসার এই স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে সন্দেহ নেই। এক দেশে দুই নীতি এটি কী মাদরাসা শিক্ষার জন্য দুর্গতি না প্রগতি? সরকার যেখানে শিক্ষা ব্যাবস্থাকে এগিয়ে নিতে চাইছেন সেখানে এর মাধ্যমে আলিম মাদরাসাকে পিছিয়ে দেয়ার মত এই নীতি কেন?

 অধিক যোগ্য, অধিক পদমর্যাদা ও একই স্কেল হওয়ার পরও প্রভাষকগণ বঞ্চিত:
প্রভাষকগন উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ কিংবা স্নাতক/স্নাতকোত্তর কলেজ স্তরে পাঠদান করান। তাদের নিয়োগকালীন কাম্য যোগ্যতা এবং পাঠদানেরত থেকে দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে মাধ্যমিক স্তরের দাখিল মাদ্রাসার সহ-সুপার ও সুপারদের চেয়ে বেশী। ওনাদের কর্মজীবনের শুরু সহকারী মৌলভী দিয়ে, নিয়োগকালীন কাম্যযোগ্যতা ছিল ফাজিল পাস। সুপার/সহ-সুপার হওয়ার পর বেতন কোড-৭ ও ৮, উনাদের আলিম স্তরে পাঠদানের প্রাতিষ্ঠানিক কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই সরাসরি এই স্তরের অধ্যক্ষ/উপাধ্যক্ষ হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা হলো।তাদের ক্ষেত্রে সহকারী অধ্যাপকের কোন শর্ত আরোপ করা হয় নাই।

কিন্তু আলিম স্তরের কিংবা ফাজিল স্তরের প্রভাষক যাদের বেতন কোড- 7 ও৮ , তাদের কর্মজীবন শুরু প্রভাষক দিয়ে নিয়োগকালীন কাম্যযোগ্যতা ছিল কামিল/এম,এ পাস।পদবীগত ভাবেও তারা অধিকতর উচ্চস্তরের। এই স্তরে পাঠদানে তাদের সারাজীবন কাটলেও এই স্তরের জন্য তারা অধিক অভিজ্ঞ ও যোগ্যতা সম্পন্ন হওয়া সত্বেও তাদের বঞ্চিত করে নিম্নস্তরের যাদের একাদশ দ্বাদশ শ্রেণীতে পাঠদানের প্রাতিষ্ঠানিক কোন অভিজ্ঞতা নেই তাদের সুযোগ দিয়ে মাদ্রাসা শিক্ষাকে পিছিয়ে দেয়া হলো।

এমনিতেই মানুষ মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে নাক সিটকায়। এই স্তরের শিক্ষার্থীরা এইচএসসি সমমান আলিম পাশ করে ইসলামিক স্কলার ও দেশ সেরা পাবলিক ইউনিভার্সিটি তে সুযোগ পেয়ে কর্মজীবনের রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে দেশ সেবার সুযোগ পায়।

তাদের বেড়ে ওঠা ও শিক্ষাদান কাদেরহাতে তুলে দেয়া হলো।কাউকে সুযোগ দিতে চাইলে দেওয়া হোক তবে অধিকতর যোগ্যদের হাত-পা বেঁধে প্রতিযোগিতা থেকে পিছিয়ে দেয়া ঠিকনয়। বিষয়টি মাদরাসা শিক্ষানুরাগীদের কাছে দৃষ্টিকটু মনে হচ্ছে।

2। ফাজিল-কামিল মাদ্রাসার প্রভাষকদের 50% সহকারী অধ্যাপকেরপদ জাতীয় ভিত্তিক না করে প্রতিষ্ঠান ভিত্তিক জৈষ্ঠ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতি দেয়ার কারণে এটিও পূর্বের অনুপাত প্রথার বৈষম্যকে পূনর্বহাল করা হলো।

পদোন্নতি/প্রমোশন মূলত কর্মজীবনকে গতিময় করার জন্য পুরষ্কার হিসেবে দেখা হয়, প্রভাষকদের পদোন্নতিতে পূর্বে যে অনুপাত প্রথা ছিল তা গতিময়তার তার পরিবর্তে স্থবিরতা সৃষ্টি করেছিল। তাই প্রভাষকগণ একে কালাকানুন আখ্যা দিয়ে পরিবর্তনের জন্য দীর্ঘ দিন বিভিন্ন দেন-দরবার করে আসছিলেন।

অবশেষে সংশোধনীতে প্রভাষকদের প্রতিষ্ঠানে জৈষ্ঠ্যতার ভিত্তিতে 50% সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির ব্যবস্থা সুখবর হলেও এটি বাস্তবায়ন দেশের অন্যান্য ধারার মত না করে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিতে করার কারণে পূর্বের অনুপাত প্রথার মতই বৈষম্যকে জিইয়ে রেখে বৈষম্যের পাহাড় তৈরি করে রাখছে। ফলে এ খাতে সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও শিক্ষার মানোন্নয়নে যথার্থ ভূমিকা রাখবে না কারণ এটি মেধা কিংবা পরিশ্রমের পুরস্কারস্বরূপ নয়। বাই চান্স কিংবা দৈবক্রমে পাওয়া।এতে কত ভয়াবহ বৈষম্যের সৃষ্টি করছে তার চিত্র তুলে ধরছি-

 মাদরাসা বনাম মাদরাসা ঘরে ঘরে বৈষম্য:

ফাজিল-কামিল মাদরাসার প্রভাষকদের 50% সহকারী অধ্যাপক প্রতিষ্ঠানভিত্তিক অনুপাত প্রথার মত বাস্তবায়ন হওয়ায় মাদ্রাসায় মাদ্রাসায় তথা ঘরে ঘরে বৈষম্যকে জিইয়ে রেখে অভিশাপের দীর্ঘশ্বাস বইয়ে দিচ্ছে।
একটি বাস্তব দৃষ্টান্ত:
আমাদের পাশেই একটি ফাজিল মাদরাসায় ৬ জন প্রভাষকের সবাই তরুণ। তাদের মধ্যে ইতিপুর্বে একজনের 8 বছর পূর্ণ হওয়ার সহকারী অধ্যাপকের স্কেল পেয়েছেন। 50% সহকারী অধ্যাপক হিসেবে তারা তিনজন সহকারী অধ্যাপক স্কেল পাবেন। বাকি দুইজন এক বছর পূর্ণ হওয়ার অপেক্ষায় আছে। এক বছর পূর্ণ হলে এই প্রতিষ্ঠানে বাকি দুজন সহকারী অধ্যাপক হবেন।

অপরদিকে পাশ্ববর্তী আরেকটি ফাজিল মাদরাসায় সাতজন প্রভাষক। এখানে পূর্ব থেকে দুজন সহকারী অধ্যাপকের স্কেল পাচ্ছেন। 50% হিসেবে বাকি পাঁচজন থেকে আর ১ জন সহকারী অধ্যাপক হতে পারবেন। এই 5 জন শিক্ষকের একেকজনের চাকরির বয়স 15 থেকে 20 বছর। তাদের মধ্যে সৌভাগ্যবান একজন অন্যদের থেকে 2/1 দিন আগে যোগদানের কারণে সহকারী অধ্যাপক এর স্কেল পেয়ে যাবেন।

বাকী ৪ জন কি অপরাধ করলো? কোন দোষে চারজন চির বঞ্চিত হবেন? উক্ত প্রতিষ্ঠানের বাকি চারজনের চাকরিকাল 20 বছর হলেও অত্যধিক মেধাবী ও অভিজ্ঞ হলেও বঞ্চিত হয়ে প্রভাষক পদ থেকে বিদায় নিবেন। একই রকম পাঠদান করিয়ে সম যোগ্যতা সম্পন্ন সম বয়স হয়েও কেন ওনারা আর্থিক, মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবেন? কী যোগ্যতা অর্জন করলে তারা সৌভাগ্যবান হবেন এমন কোন প্রচেষ্টা্র কী সুযোগ আছে?

অপরদিকে পাশের ওই প্রতিষ্ঠানে সহকারী অধ্যাপকের দুটি পদ খালি। কেবলমাত্র ওই প্রতিষ্ঠানের প্রভাষকদের পদোন্নতি দিয়ে পূরণ করা হবে’ অন্য প্রতিষ্ঠানে যতই যোগ্য লোক থাকুক তারা বঞ্চিত থাকবে। এরা সাত বছর পূর্ণ করে এক বছরের অপেক্ষায় আছে।এরা কোন সোনার চামচ মুখে দিয়ে জন্মেছে ? আর ওদেরকে হতভাগ্য করে রেখেছে কারা?

এপারের অভিজ্ঞ ও প্রবীণ শিক্ষকরা ওপারের দিকে তাকিয়ে আছে। 20 বছর অভিজ্ঞ হয়েও ওপাড়ে যাওয়া ওনাদের পক্ষে সম্ভব নয় ।তাদের হাত-পা যে শর্তের বেড়াজালে বন্দি। উনারা তৎকালীন হিন্দু সমাজের “বিধবা বিবাহের আইনের” অপেক্ষায় থাকা বিধবা মা- মেয়ের মতোই দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আর গতি কোন গতি নেই। এ কেমন নির্মমতা! একি শিক্ষার উন্নয়ন? বাংলাদেশের মহান সংবিধানে দেশের কোন নাগরিককে এভাবে বঞ্চিত করার সুযোগ কী আছে?

ছাত্র সহকারি অধ্যাপক হবে, প্রবীণ শিক্ষক প্রভাষকেই শৃঙ্খলিত রবে:
ছাত্র তার মেধা যোগ্যতায় শিক্ষককে ডিঙিয়ে আরো অনেক উপরে গেলে এ যে শিক্ষকের সফলতা ,এতে শিক্ষকের হৃদয় আনন্দে নেচে উঠে। কিন্তু এমনটি না হয়ে যদি উল্টোটি হয় তা হলে কেমন হয়? অনুপাত প্রথার অভিশাপে দীর্ঘদিন এমনটি চলছিল। শুনেছিলাম এমন নীতির পরিবর্তন হবে।সংশোধিত নীতিমালায় ফাজিল কামিল স্তরের শিক্ষকদের জন্য 50%সহকারী অধ্যাপকের পদ সৃষ্টি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হলেও আদিম পদ্ধতিতে এর বাস্তবায়নের কারণে পূর্বের অভিশপ্ত রীতিই রয়ে গেল। শিক্ষার মানোন্নয়নে এটি কোন ভূমিকা রাখবে না।কারণ এই পদোন্নতি বাই চান্স। এমনিতে পাওয়া। মেধা কিংবা শ্রমের ভিত্তিতে মূল্যায়িত পুরস্কার নয়।কোটায় পাওয়া সুবিধার মত।

সংশোধিত নীতিমালার বিষয় নিয়ে যখন গত 25 নভেম্বর রাত 8 টায় দৈনিক শিক্ষার লাইভ দেখছিলাম।তখন ফাজিল মাদ্রাসার এক প্রভাষক বন্ধু আমাকে ফোন করে নীতিমালার ব্যাপারে আলাপকালে জানালো তার এক উস্তাদ 25/26 বছর ধরে আলিম মাদরাসায় প্রভাষক পদে আছেন। তিনি নিজে একটি ফাজিল মাদরাসায় প্রভাষক পদে সাত বছর চলছে। একবছর পরেই তিনি সহকারী অধ্যাপক হবেন। এভাবে শুধু আলিম মাদরাসাই নয় সকল ফাযিল-কামিল মাদরাসার পদোন্নতি বঞ্চিত হাজার হাজার প্রভাষকের বঞ্চনা ও অবমূল্যায়নের চিত্র।

সমস্যার সমাধান কল্পে সহকারী অধ্যাপকের পদোন্নতিতে দেশে বিদ্যমান পদ্ধতি অনুসরণ:
শিক্ষাসেক্টরের এই বৈষম্য দূরীকরণে শিক্ষকদের দাবী ছিল নির্দিষ্ট অভীজ্ঞতা ও যোগ্যতায় সকল শিক্ষককে সহকারী অধ্যাপক , সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদে পদোন্নতির সুযোগ দিলে এই বঞ্চনা দূর হতো। অথবা বাংলাদেশে আরো অন্য শিক্ষা সেক্টরে সহকারী অধ্যাপকের পদোন্নতি যেভাবে দেয়া হচ্ছে সেভাবে হলেও এত বৈষম্য ও বঞ্চনা থাকতনা। সহকারী অধ্যাপকের পদোন্নতি দেয়ার বাংলাদেশের ২ টি প্রতিষ্ঠানের নমুনাঃ

১) পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুসরণ:

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে ৩ বছর সক্রিয় শিক্ষকতা এবং গবেষণার মাধ্যমে প্রভাষক থেকে সকল শিক্ষকের সহকারী অধ্যাপকের পদে যাওয়ার সুযোগ থাকে। ওখানে কোন % নাই।শর্ত থাকে গবেষণার ও প্রকাশনার।যাতে সব শিক্ষকের সুযোগ থাকে সহকারী অধ্যাপক হওয়ার। যোগ্যতা ও মেধা থাকার পর কেউ বঞ্চিত হয়না বরং এর মাধ্যমে শিক্ষক ও শিক্ষার মানোন্নয়নে ও জাতি গঠনে শিক্ষকের আত্ন নিয়োগের সুযোগ থাকে এবং রাষ্ট্রের ব্যয়িত অর্থ শিক্ষার উন্নয়নেই ব্যবহৃত হয়।কেউ কপাল দোষ আর শর্তের বেড়াজালে বঞ্চিত থাকতে হয়না। আর বৈষম্যের প্রশ্নই আসেনা।

২) বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের পদোন্নতি অনুসরণ:

সহকারী অধ্যাপকে পদোন্নতির আরেকটি পদ্ধতি হল বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষকদের “এসিআর ও ব্যাচ ভিত্তিক জৈষ্ঠতা যাচাই-বাছাই” করে “মাউশি” থেকে সহকারী অধ্যাপকের পদোন্নতির তালিকা প্রকাশ করা হয়।এর মাধ্যমেও যোগ্যতা ও মেধার দ্বারা সহকারী অধ্যাপক হওয়ার সবার সুযোগ থাকে। ওখানে কিছুটা বঞ্চনা থাকলেও কাউকে প্রাতিষ্ঠানিক অনুপাত প্রথার মত বঞ্চিত হতে হয়না।

মোটকথা পদোন্নতিতে এমন পদ্ধতিকে যেন অনুসরণ করা হয় যাতে মেধাবীদের ও অভীজ্ঞদের অবমূল্যায়ন না করা হয়।

বেসরকারী শিক্ষকদের সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদ থেকে বঞ্চিত করণ:

দীর্ঘদিন পর ২০১০ এর নীতিমালার ১১ এর “জ” বিধিতে- সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপকে পদোন্নতির ব্যাবস্থা রাখা হয়েছিল কিন্তু ২০১৮ এর নীতিমালায় এটি বাদ দেয়া হয়।দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সিংহভাগ শিক্ষাদান বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের দ্বারা হলেও শিক্ষার উন্নততর ও আধুনিক সুবিধা থেকে বেসরকারী শিক্ষকগণ বঞ্চিত। তাই শিক্ষার মানোন্নয়নে বেসরকারী কলেজ ও মাদরাসার শিক্ষকদের দক্ষ ও গবেষক তৈরীর লক্ষ্যে তাদের জন্যও সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদ পূণর্বহাল ও সৃজন করা হোক।

 সংশোধিত নীতিমালায় “এমফিল ও পিএইচডি” র প্রতি অনুপ্রেরণা:

ইতিপূর্বে বেসরকারী কলেজ ও মাদরাসায় এমফিল ও পিএইচডি গবেষকদের প্রাতিষ্ঠানিক কোন মূল্যায়ন ছিলনা ফলে বেসরকারী শিক্ষদের মাঝে এমফিল ও পিএইচডি করার আগ্রহ তৈরী হতনা। অথচ আন্তর্জাতিকভাবে শিক্ষাকে মূল্যায়ন করা হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সাফল্য, আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্ক, গবেষণা প্রবন্ধের সাইটেশন, পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সংখ্যা।অর্থাৎ- গবেষণার ভিত্তিতেই শিক্ষার মান নির্নয় করা হয়।

এটি বেসরকারি কলেজ মাদরাসাগুলোতে অবহেলিত ছিল কিন্তু আশার বিষয় হলো সংশোধিত নীতিমালায় স্বল্প পরিসরে হলেও আলিম,ফাযিল,কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ/উপাধ্যক্ষ পদের এমফিল ও পিএইচডিধারী প্রার্থীদের অভীজ্ঞতার বয়স শিথিল করা হয়েছে।আমি মনে করি সকল প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপকদের পদন্নোতিতে বিষয়টি অগ্রাধিকার দিলে গবেষণার মানসিকতা সম্পন্ন শিক্ষক গড়ে উঠার পরিবেশ তৈরী করবে যার সুফল জাতির সন্তানেরা ভোগ করবে।

পরিশেষে আবারও মিনতি করছি- প্রভাষকদের অবমূল্যায়নকারী বিধিসমূহ বাদ দিয়ে প্রভাষকদের মাঝে বৈষম্য দূর করতে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি প্রতিষ্ঠান ভিত্তিক ৫০% না করে জাতীয়ভাবে মেধা ও যোগ্যতাকে মূল্যায়ন করে সংশোধিত নীতিমালার সুফলসমূহ সকল শিক্ষকদের ভোগ করে জাতির সন্তানদের যোগ্য করে গড়ে তোলার সুযোগ দেয়ার জন্য শিক্ষকের সন্তান মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষাপ্রশাসনের সংশ্লিষ্ট দরদী কর্তৃপক্ষের সদয় বিবেচনাকামনা করছি।

লেখক- প্রভাষক,খাড়াতাইয়া ইসলামিয়া ফাযিল মাদরাসা

বুড়িচং-কুমিল্লা।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.