প্রফেসর ড. আবদুল খালেক।।
রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশে নেই বললেই চলে, তবে সামাজিক অস্থিরতা দেশে স্পষ্ট দৃশ্যমান। আশা করা গিয়েছিল, করোনার তাণ্ডব দেখে মানুষের বিবেক জাগ্রত হবে, অপরের ক্ষতি করা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখবে। মৃত্যুকে হাজির-নাজির দেখে মানুষ ভয়ে আর কোনো পাপ কাজে লিপ্ত হবে না। প্রতিবেশীদের দুঃখে একে অপরের পাশে গিয়ে দাঁড়াবে, বিত্তশালীরা তাদের অর্থের দম্ভ দেখানো থেকে বিরত থাকবে।
কিন্তু সে আশা দুরাশাই রয়ে গেল। দেশে সামাজিক অস্থিরতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। পত্রপত্রিকাসহ অন্যান্য প্রচারমাধ্যমের দিকে তাকালেই আমরা তা উপলব্ধি করতে পারি।আধুনিককালে আগের তুলনায় সামাজিক বন্ধন অনেক শিথিল হয়ে গেলেও মানুষ কখনো সমাজবিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে পারে না। ‘সমাজ’ শব্দটি আমাদের মধ্যে এখনো ব্যাপকভাবে প্রচলিত।
আমরা সব সময় বলে থাকি গ্রাম্য সমাজ, নাগরিক সমাজ, ছাত্রসমাজ, শিক্ষক সমাজ, নিরক্ষর সমাজ, পেশাজীবী সমাজ ইত্যাদি। সমাজের মধ্যে সামাজিক অবক্ষয় ঘটেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এ কথাও ঠিক, সমাজব্যবস্থা একই জায়গায় থেমে থাকবে, তা হওয়ার নয়। সমাজ গতিশীল।
অনেকটা বহমান নদীর মতো। গতিশীল নদী আঁকাবাঁকা পথেই সামনের দিকে ধাবিত হয়। নদী কোথাও ভাঙছে আবার কোথাও চর জেগে উঠছে। নদীর মতো সমাজও ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, পেছনের দিকে ফিরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
আমাদের সমাজের সবাই নষ্ট হয়ে গেছে, খারাপ হয়ে গেছে—এ কথা মনে করার মতো কোনো ঘটনা দেশে ঘটেনি বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। সমাজে যা-কিছু খারাপ ঘটনা আমাদের চোখের সামনে ঘটছে, সেগুলো অধিকাংশই বিচ্ছিন্ন ঘটনা।বলা হচ্ছে, দেশের তরুণ সমাজ একেবারে ধ্বংসের মুখোমুখি। এই তরুণ সমাজ দেশের নারী সমাজের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নারী ধর্ষণ এখন নৈমিত্তিক ঘটনা। অভিযোগগুলো একেবারে ভিত্তিহীন নয়। তবে বাংলাদেশে এ ধরনের যৌন হয়রানির ঘটনা নতুন—এমন কথা কিন্তু বলা যাবে না। আগে দেশের প্রচারমাধ্যম খুব একটা শক্তিশালী ছিল না। খবর প্রচারের আধুনিক প্রযুক্তি মানুষের হাতের কাছে না থাকায় গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কোনো মেয়েটি কীভাবে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে তা প্রচারের কোনো সুযোগ ছিল না; লোকে জানতেও পারত না।
কিন্তু আজ আধুনিক প্রযুক্তি প্রতিটি মানুষের হাতের মুঠোয়। নিভৃত গ্রামের কোনো নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে মুহূর্তের মধ্যে তা ছড়িয়ে পড়ে দেশ-বিদেশে তথা সমগ্র বিশ্বে।১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল ৭ কোটির মতো। বর্তমানে সে সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ কোটি।
এর মধ্যে যুক্ত হয়েছে আরো ১০-১২ লাখ বহিরাগত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। জনসংখ্যা যেমন বেড়েছে, পাশাপাশি নারী নির্যাতনের সংখ্যাও যে বেড়েছে তাতে সন্দেহ করার কোনো সুযোগ নেই। তবে পরিসংখ্যান নিয়ে দেখা দরকার জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি নারী নির্যাতনের আনুপাতিক হার কোন পর্যায়ে আছে। আনুপাতিক হার যত নগণ্যই হোক, এটি দেশবাসীর কাম্য নয়।
যৌন হয়রানি, নারী ধর্ষণ বা যে কোনো প্রকার নারী নির্যাতনের ঘটনা শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসতে হবে, সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।চট্টগ্রাম অঞ্চলের কোনো এক থানার ওসি ‘প্রদীপ’ ও লিয়াকত ভয়ংকর এক কাণ্ড ঘটিয়ে দিয়েছে। একজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক অফিসারকে হত্যার অভিযোগে তারা জেলখানায় বন্দি।
সিলেটে পুলিশ হেফাজতে একজন আসামির মৃত্যু ঘটেছে, এক্ষেত্রেও পুলিশ সমাজ থেকে কোনো রকম সমর্থন হত্যাকারীদের পক্ষে আসেনি এবং সরকার হত্যকারীদেরকে বিচারের আওতায় নিয়ে এসেছে। এটাকেও আমরা বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে চিহ্নিত করতে পারি।
এসব ক্ষেত্রেও সামাজিক আন্দোলনের প্রয়োজন আছে।আমাদের সমাজের যারা অগাধ বিত্তশালী, যারা প্রচণ্ড ক্ষমতার অধিকারী, মনে করা হতো তাদের অপরাধের বিচার কেউ করতে পারবে না। এমনকি বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের কোনো নেতা বা কর্মী অপরাধ করলে তারও কোনো বিচার হবে না। কিন্তু এক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গরত্ন শেখ হাসিনা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের কোনো নেতা বা কর্মী সে যত প্রতাপশালী বা বিত্তশালীই হোক না কেন, অপরাধ করলে শাস্তি তাকে পেতেই হবে।
বঙ্গরত্ন শেখ হাসিনা কথা বলে চুপচাপ বসে থাকেননি। কাজের মধ্য দিয়ে তার কথার সত্যতা প্রমাণ করেছেন। ঢাকার সংসদ সদস্য হাজি সেলিম একজন বিত্তশালী মানুষ, প্রভাব-প্রতিপত্তিতেও তার কমতি নেই। তার সন্তান ইরফান সেলিম ভেবে নিয়ে ছিলেন তিনি বিচারের ঊর্ধ্বে।
কিন্তু তার সে দম্ভ ধুলোয় মিশে গেছে। ইরফান সেলিমকে জেলখানায় ঢুকিয়ে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে। সব সংসদ সদস্য বা বিত্তশালী সমাজকে ঢালাওভাবে এর জন্য দায়ী করা যাবে না।বিশ্ববিদ্যালয়ে বিরাজমান অস্থিরতার দিকে দৃষ্টি দিতে পারি।
করোনা ভাইরাসের আক্রমণ থেকে শিক্ষার্থীদেরকে রক্ষা করার স্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসকক্ষের পঠন-পাঠন বন্ধ রয়েছে, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ তাদের মেধাচর্চা থেকে বিরত রয়েছেন, এমন কথা বলা যাবে না। সে মেধাচর্চা দুই রকমের।
কেউ গবেষণার মাধ্যমে মেধার চর্চা করছেন, কেউ উপাচার্য হটানোর কলাকৌশলে ব্যস্ত রয়েছেন। পত্রপত্রিকার খবরাখবর থেকে মনে হচ্ছে এ মুহূর্তে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে বেশ অস্থিরতা বিরাজ করছে তাদের উপাচার্যদের কেন্দ্র করে।আমি পত্রপত্রিকায় লেখালেখির মাধ্যমে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে বারবার আবেদন জানিয়েছি, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপাচার্যকে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিকবার উপাচার্য না করাই ভালো।
তা করতে গেলে সমস্যা হবে। সমস্যা যে হয়, তার দু-একটি উদাহরণ প্রসঙ্গক্রমে তুলে ধরছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর আ আ ম স আরেফীন সিদ্দিকীর মতো বিজ্ঞ উপাচার্য খুব বেশি পাওয়া যাবে না। তিনি অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বের অধিকারী একজন সংস্কৃতিমান পরিশীলিত মানুষ।
কিন্তু এত সব যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দ্বিতীয় টার্মের শেষের দিকে তাকে মারাত্মক প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রচণ্ড প্রতিবাদের মুখে তাকে সিদ্ধান্ত পালটাতে হয়েছিল।সম্প্রতি একই রকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে চলেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের ক্ষেত্রে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু শিক্ষকের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দ্বিতীয়বার উপাচার্য হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রফেসর ড. আবদুস সোবহানের বিষয়ে ইউজিসিকে একটি তদন্ত কমিটি পর্যন্ত গঠন করতে হয়েছে। জানা গেছে তদন্তের কাজ শেষ এবং রিপোর্ট শিক্ষা মন্ত্রনালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির কথা শুনলে আমার খুব মর্মপীড়া হয়। কারণ, আমিও একসময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলাম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপাচার্যের অসম্মান হলে সে অসম্মান আমাদের সব উপাচার্যের।
উপাচার্যদের আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগসমূহ মিথ্যে বলে প্রমাণিত হলেই আমরা খুশি হব।সমাজের নানা স্তরে সামাজিক অস্থিরতা আছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই, আর এ সমস্যা নতুন নয়। ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এবং জাতীয় চার নেতাকে নৃশংসভাবে হত্যার মাধ্যমে যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছিল এবং তাদের হাতে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি দেশে চালু হয়েছিল তার শিকড় সমাজের অতি গভীরে প্রোথিত হয়ে আছে।
বঙ্গবন্ধু হত্যা এবং জাতীয় চার নেতা হত্যার বিচার ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে বন্ধ রাখা হয়েছিল। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার তারা হতে দেয়নি, ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার বিচার বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার করেনি বরং লক্ষ করা গেছে, কোনো কোনো সন্ত্রাসী কার্যকলাপের সঙ্গে তত্কালীন সরকারের যোগসূত্র ছিল। সমাজের নৈতিক চরিত্রে যদি একবার অবক্ষয় শুরু হয়ে যায়, তার জন্য সমগ্র সমাজকে ভুগতে হয় দীর্ঘকাল।
বিগত জোট সরকারের আমলে পূর্ণিমা নামের মেয়েটির ওপর কী ভয়ংকর যৌন নির্যাতন চালানো হয়েছিল, সে ঘটনা কারো ভুলে যাওয়ার কথা নয়। জোট সরকারের কাছ থেকে পূর্ণিমা কোনো ন্যায়বিচার পায়নি।
জোট সরকারের আমলে সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতির যে বিস্তার ঘটেছিল, তা নির্মূল করতে সময় লাগবে।তবে বিচ্ছিন্ন হলেও দেশ ও সমাজের জন্য ঘটনাগুলো অত্যন্ত ক্ষতিকর। দেশের সরকার যেখানে ধর্ষণকারী তথা নারী নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে, এক্ষেত্রে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা তুলনামূলকভাবে সহজ।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সরকারের কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি তীব্র সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে পারলে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের অভিশাপ থেকে দেশ ও সমাজ মুক্ত হবে।
লেখক : সাবেক উপাচার্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
