বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয় এমন রিপোর্ট করবেন না

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাংবাদিকদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে মানুষের কল্যাণে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, সাংবাদিকতা যেন নীতিহীন না হয়। কারণ নীতিহীন সাংবাদিকতা কোনো দেশের জন্যই কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। জাতিকে বিভ্রান্ত করতে পারে এমন কোনো সংবাদ পরিবেশন করবেন না। গতকাল রবিবার গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) রজতজয়ন্তী উদ্যাপন অনুষ্ঠানে দেওয়া প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘এমন রিপোর্ট করবেন না, যেটা মানুষের মধ্যে বা সমাজে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয় বা মানুষ বিপথে যায়। সেদিকেও আপনাদের বিশেষভাবে দৃষ্টি দিতে আমি অনুরোধ জানাচ্ছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কোথাও দুর্নীতি হলে তার সঙ্গে দল বা সরকারের কেউ জড়িত কি না, সেই চিন্তা না করে সরকার সবার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেয়। অথচ একটা সময় দেশে যতই দুর্নীতি হোক, অন্যায়-অনিয়ম হোক, সেটা ধামাচাপা দেওয়া হতো। কিন্তু আমরা তা করছি না। আমি চিন্তা করি, যেখানে অন্যায় হয়েছে তার বিরুদ্ধে আমাদের ব্যবস্থা নিতে হবে। হ্যাঁ, এটা নিতে গিয়ে অনেক সময় দোষটা আমাদের ওপরই এসে পড়ে। আওয়ামী লীগ সরকারই বোধ হয় দুর্নীতি করছে। ঘটনা তা নয়।’

এদেশে দুর্নীতির বীজ বপন করে গেছে পঁচাত্তর-পরবর্তী অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী সরকারগুলো—এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘জাতির পিতাকে হত্যার পর যারা অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেছিল, তারাই এ দেশে দুর্নীতির বীজ বপন করে গেছে। প্রথমে জিয়াউর রহমান, এর পরে এরশাদ, এর পরে খালেদা জিয়া। তারা দুর্নীতিটাকে প্রশ্রয় দেওয়া শুধু না, নিজেরা দুর্নীতির সাথে জড়িত ছিল এবং দুর্নীতিকে লালন-পালনই করে গেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারে আসার পর আমরা কিন্তু সেটা কখনো করছি না। যেখানে দুর্নীতি পাচ্ছি, সে আমার দলের যত বড় নেতা হোক, কর্মী হোক, আমরা কিন্তু সাথে সাথে ব্যবস্থা নিচ্ছি। হ্যাঁ, তাতে আমাদের বিরোধী যারা, তাদের লেখার সুযোগ হচ্ছে বা বলার সুযোগ হচ্ছে যে আওয়ামী লীগ দুর্নীতি করছে। কিন্তু এই কথাটা কেউ চিন্তা করছে না যে আওয়ামী লীগ দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে না; সে যেই হোক, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে।’

প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিক সমাজের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনাদের বলব, আপনারা দায়িত্বশীলতা নিয়ে, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে, মানুষের কল্যাণের কথা চিন্তা করে কাজ করবেন। বিভিন্ন পত্রিকায় অনেক সময় অনেক ঘটনা আসে, সেসব রিপোর্ট পড়ে সাথে সাথে আমরা অনেক অসহায় মানুষের পাশে যেমন দাঁড়াই, আবার অন্যায় ঘটনা ঘটলে তার প্রতিকারও করতে পারি।’ তিনি বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার জন্য সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘অনেক সময় আপনারা অনেক ঝুঁকি নিয়ে রিপোর্ট করেন, সেজন্য আপনাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’

প্রধানমন্ত্রী নিজেকে সাংবাদিক পরিবারেরই একজন সদস্য উল্লেখ করে বলেন, জাতির পিতা নিজেও তার জীবনে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে সাপ্তাহিক মিল্লাত ও ইত্তেহাদ পত্রিকায় এবং দেশ বিভাগের পর দৈনিক ইত্তেফাকে সাংবাদিকতা করেন এবং নতুন দিন নামে আওয়ামী লীগের জন্য নিজেও একটি পত্রিকা বের করেন। বঙ্গবন্ধু সাপ্তাহিক বাংলার বাণীও বের করেন উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, ‘সাংবাদিকতার সঙ্গে তার (বঙ্গবন্ধু) সব সময় একটা সম্পর্ক ছিল। সেদিক থেকে আমি দাবি করতে পারি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সন্তান হিসেবে আমি নিজেও সাংবাদিক পরিবারেরই একজন সদস্য।’

প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনকালে জাতির পিতার সংবাদপত্রশিল্পেরও পুনরুজ্জীবনের তথ্য উল্লেখ করে বলেন, ‘স্বাধীনতার পর এমন অবস্থা হয় যে এসব পত্রিকা চালানো মালিকদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবই উদ্যোগ নিয়ে সাংবাদিকদের সরকারি চাকরি দিয়েছিলেন। কিন্তু সেটাকে অন্যভাবে দেখা হয় যে উনি সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দিয়েছেন। দুর্ভাগ্য, এটা আমার নিজের দেখা, যারা সরকারি চাকরি পেয়েছিল তারাই বেশি সমালোচনা করত।’

জাতির পিতা আমাদের দেশ স্বাধীন হওয়ার ৯ মাসের মধ্যে যে সংবিধান প্রণয়ন করেন, এর ৩৯ অনুচ্ছেদে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার উল্লেখ রয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই চিন্তা, বিবেক এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতাটা ভোগ করতে গেলে অপরের প্রতি যে দায়িত্ববোধ, দেশের প্রতি যে দায়িত্ববোধ, রাষ্ট্রের প্রতি যে দায়িত্ববোধ, সেই দায়িত্ববোধটাও থাকতে হবে।’ প্রধানমন্ত্রী এ সময় সংবাদপত্রশিল্পের উন্নয়নে তার সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আগে একটি মামলা হলেই চট করে সাংবাদিকদের গ্রেফতার করা হতো। আমরা কিন্তু সেক্ষেত্রেও পেনাল কোড সংশোধন করেছি, যাতে সাংবাদিকদের হয়রানির সম্মুখীন হতে না হয়।’ জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাই তার সরকারের মূল লক্ষ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘রাজনীতি করি মানুষের কল্যাণের জন্য। আর চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই।’

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে রজতজয়ন্তীর মূল অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম গণভবন থেকে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন। ডিআরইউর সাবেক সভাপতি ও রজতজয়ন্তী উদ্যাপন কমিটির চেয়ারম্যান শাহজাহান সরদার, ডিআরইউর সভাপতি রফিকুল ইসলাম আজাদসহ সংগঠনটির বর্তমান ও সাবেক সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ সদস্য সাংবাদিকবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.