তিন সপ্তাহ না খেলে সারা বছর ইলিশ মেলে

ইলিশ শুধু একটি মাছই নয়, আমাদের একটি আবেগের নাম– একটি ভালবাসার নাম। নিকট অতীতে ইলিশের শুধু মোট উৎপাদনই নয়, এর গড় আকারও বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ওয়ার্ল্ড ফিসের এক প্রকাশনা অনুযায়ী, গত ৫ বছরে ইলিশের গড় ওজন ৫৩৫ গ্রাম থেকে ৯১৫ গ্রামে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ এ সময়ে গড়ে ওজন বেড়েছে প্রায় ৪০০ গ্রাম। এছাড়া, এফএও-এর উপাত্ত থেকে দেখা যায়, ২০১০ থেকে ২০১৫ সালের মোট উৎপাদন তথ্যানুযায়ী, পৃথিবীর মোট ইলিশ উৎপাদনের প্রায় ৮৭ ভাগই বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়েছে যা  আগে ছিল প্রায় ৭৫ ভাগ।  দেশিও চাহিদা মিটিয়ে এটি বিদেশেও এখন রপ্তানি করা হচ্ছে।

মাছটির সংরক্ষণ ও টেকসই উৎপাদনের লক্ষ্যে গত দশক থেকে বিভিন্ন ধরণের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যেমন- অভয়াশ্রম স্থাপন, জাটকা মাছ সংরক্ষণ, কারেন্ট জাল নিষিদ্ধকরণ ইত্যাদি। এছাড়া, মাছটি যাতে ঠিকমতো প্রজনন করতে পারে সে জন্য প্রতি বছর বাংলাদেশের উন্মুক্ত জলাশয়ে ২২ দিন ইলিশ মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে, যা আগে ১১-১৫ দিন ছিল।  আশ্বিন ও কার্তিক মাসের বড় পূর্ণিমা ও অমাবস্যার সময় (অক্টোবর – নভেম্বর) ইলিশ মাছ বেশি ডিম দেয় ও প্রজনন করে বলে এই সময়টা নির্ধারণ করা হয়। এ বছর ১৪ অক্টোবর থেকে ৪  নভেম্বর, মোট ২২দিন বাংলাদেশে ইলিশ আহরণ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ, ক্রয়-বিক্রয়, মজুদ ও বিনিময় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

সাগর, মোহনা, নদী সব জায়গায় পরিযায়ী মাছটির বিচরণ। জীবন চক্রের প্রাথমিক পর্যায়ে (ডিম থেকে জাটকা) এরা নদী বা মোহনায় বিচরণ করে এবং পরবর্তীতে সাগরে চলে যায়। এরপর আবার, প্রজনন মৌসুমে পরিপক্ব ইলিশ উজানে বড় বড় নদীতে চলে আসে ও ডিম দেয়। বিভিন্ন গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, একটি পরিপক্ব মা ইলিশ বছরে প্রায় এক থেকে পঁচিশ  লাখ ডিম দিতে পারে। কিন্তু ইলিশের কোনো জনিত্রীযত্ন না থাকায় মোট ডিমের খুবই অল্প সংখ্যক থেকে রেনু উৎপন্ন হয়ে শেষ পর্যন্ত পরিণত ইলিশে রূপান্তরিত হয়। যদি এর হার হয় ০.০২ শতাংশও হয় তাহলে একটি মা ইলিশ থেকে গড়ে কয়েকশ নতুন ইলিশ আসতে পারে। সুতরাং একটি মা ইলিশ রক্ষার মানে সামনের বছর কয়েকশ নতুন ইলিশ প্রাপ্তি। তাই প্রজনন মৌসুমে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে এই মাছ যাতে অবৈধভাবে আহরণ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ, ক্রয়-বিক্রয়, মজুদ ও বিনিময় না হয় সে জন্য সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তর কাজ করে যাচ্ছে। এসব কার্যক্রমের মধ্যে আছে ইলিশ প্রজনন এলাকায় (নদী ও মোহনায়) টহল, বাজার ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং বিভিন্ন স্থানে পরিবহন পরীক্ষণ। কিছু বেসরকারি সংস্থা ও নাগরিক উদ্যোগও এখানে অবদান রাখেন। এরপরও প্রায়ই অবৈধভাবে ইলিশ শিকার, পরিবহণ ও বাজারজাতের খবর শোনা যায়। যেহেতু ইলিশ মাছ পদ্মা ও মেঘনার মতো বড় নদীগুলোতে ডিম ছাড়ে তাই সার্বক্ষণিক এত বড় এলাকায় পাহারা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এই সুযোগে অনেক অসাধু জেলে অধিক মুনাফার আশায় নদীতে অবৈধভাবে ইলিশ আহরণ করে থাকে। ডিমওয়ালা ইলিশ খেতে সুস্বাদু ও লোভনীয় হওয়ায় অনেক অসচেতন নাগরিক এই সময়ে ইলিশ মাছ কিনে থাকেন। কিছু অসাধু ক্রেতা ও ব্যবসায়ী এই সময়ের ইলিশ সংরক্ষণও করে থাকেন। যেহেতু এই সময়ে ইলিশ খাওয়া নিষিদ্ধ নয় এবং আইন করে মাছটি খাওয়া নিষিদ্ধ করে তা পুরোপুরি প্রয়োগ করাও বাস্তবিক কারণে সম্ভব নয়, তাই ইলিশের ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ধরে রাখতে নাগরিক হিসাবে আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারি। সেটি হল এই প্রজনন মৌসুমে ইলিশ মাছ না কেনা ও না খাওয়া।

সরকার নির্ধারিত সময়ে ইলিশ মাছ যদি আমরা না কিনি ও না খাই তাহলে এ মাছের বাজারে চাহিদা থাকবে না এবং মাছ বিক্রিও হবে না। ফলে এই  নিষিদ্ধ সময়ে অবৈধভাবে ইলিশ মাছ ধরতে জেলেরা  নিরুৎসাহিত হবে। যদি বিশেষ কারণে কারও কারও এ সময় ইলিশ মাছ খেতেই হয় তাহলে নিষিদ্ধ সময়ের আগে কিনে রাখতে পারেন।

এক সময় মনে হতো, পহেলা বৈশাখ উদযাপন ইলিশ ছাড়া চলবে না। কিন্তু গত কয়েক বছর নানান প্রচারণার ফলে এ সময় মানুষ আর আগের মতো ইলিশ কেনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েন না। একইভাবে সঙ্গবদ্ধ প্রচারণা চালালে ও ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারলে ইলিশের এই প্রজনন মৌসুমে মানুষ এটি কেনা থেকে বিরত থাকবে বলে প্রত্যাশা করা যায়। এই প্রচার কাজ ও সচেতনতা সৃষ্টির একটি স্লোগান হতে পারে ‘তিন সপ্তাহ না খেলে, সারা বছর ইলিশ মেলে’।

অধ্যাপক মো মনিরুল ইসলাম

মৎস্যবিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.