মেধা ও জ্ঞান বিকাশের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না করে ও শিক্ষার মানোন্নয়ন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা না করে যেমন খুশি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষা বিস্তার সম্প্রসারণ আর মেধা সৃষ্টির বিকাশ একসঙ্গে চলতে পারে না। দেশে বর্তমানে ৫৩টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে জেনারেল বিশ্ববিদ্যালয় ১৫টি, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আটটি, মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় পাঁচটি, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় পাঁচটি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ১৫টি, স্পেশালাইজড বিশ্ববিদ্যালয় চারটি, অফ ক্যাম্পাস বিশ্ববিদ্যালয় তিনটি। এগুলোর মধ্যে আটটি বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরো কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষিবিষয়ক ডিগ্রি প্রদান করা হচ্ছে। পত্রপত্রিকার তথ্য মতে, আরো চারটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বছর দুই আগে খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় খোলা হয়েছে, যেখানে কোনো ভৌত অবকাঠামো তৈরির আগেই ছাত্র ভর্তি করা হয়। বাংলাদেশে যেসব পুরনো কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আছে তার মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সবচেয়ে পুরনো, যেটি ১৯৬১ সালে স্থাপিত হয়েছে। সেখানেও অদ্যাবধি পর্যাপ্ত আধুনিক গবেষণাগার তৈরি সম্ভব হয়নি। নানা প্রতিবন্ধকতা ও সুযোগের অভাবে মানসম্পন্ন লেখাপড়া নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। উচ্চশিক্ষায় মেধা সৃষ্টি দেশের মূল চালিকাশক্তি। বিজ্ঞানভিত্তিক মেধা সৃষ্টি না হলে কোনো উন্নয়নই টেকসই হবে না।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে স্বীকৃত। ক্রমবর্ধমান জ্ঞানচালিত বিশ্ব অর্থনীতিতে টিকে থাকতে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন গবেষণা এবং পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির প্রয়োজন। কাজেই এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে উচ্চশিক্ষায় মেধা সৃষ্টিই দেশের সার্বিক উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। অথচ আমাদের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মানোন্নয়নের বাস্তব কোনো পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বিগত প্রায় ছয়-সাত বছর ধরে বিশ্বব্যাংকের ঋণের হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে অপরিকল্পিতভাবে পরিচালিত হেকেপ প্রকল্পের তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য প্রভাব মেধা সৃষ্টিতে পড়েছে বলে অনেকেই মনে করেন না। আমাদের বড় সমস্যা হলো, কারো কোনো দায়বদ্ধতা বা জবাবদিহি নেই কোনো ক্ষেত্রেই। নেই ছাত্র-শিক্ষক মূল্যায়নের উপযুক্ত পদ্ধতি।
কৃষি একটি উচ্চতর বিজ্ঞান। সাধারণ বিজ্ঞানের মতো নয়। কৃষিশিক্ষায় দক্ষতা বাড়াতে যেমন আন্ত গবেষণাগার প্রয়োজন, তেমনি মাঠ গবেষণাগারও অত্যন্ত জরুরি। বতর্মানে যে আটটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আছে তাতে মেধা সৃষ্টির জন্য অত্যন্ত জরুরি উপাদানগুলোও নেই। শিক্ষকের অপ্রতুলতা, শিক্ষার আধুনিক টুলসসহ সব ধরনের যন্ত্রপাতির অপ্রাপ্ততা বিরাজমান। এ ছাড়া দেশের সব কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়েরও মান ও মেধা নিয়ন্ত্রণের জন্য যে বিষয়গুলো বিশ্বের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিংয়ে ব্যবহার করা হয় তার প্রায় সবগুলো ফ্যাক্টরই নিদারুণভাবে উপেক্ষিত, যেমন—একাডেমিক খ্যাতি ৪০, চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানের খ্যাতি ১০, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত ২০, আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্ক ১০, শিক্ষকদের গবেষণার উদ্ধৃতি ৫, গবেষণার পেপার উদ্ধৃতি ৫, আন্তর্জাতিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ৫+৫=১০, পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষক সংখ্যা ৫।
বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই এসবের তোয়াক্কা করে না বা চিন্তা-চেতনার মধ্যেও আছে বলে মনে হয় না। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থা আরো করুণ। দেশে বর্তমানে আটটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। তাদের মধ্যে বেশির ভাগেই যথেষ্ট গবেষণাগার ও ফিল্ড ল্যাব নেই, লেখাপড়াসংক্রান্ত আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তিরও অভাব। বর্তমানে সব কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর প্রায় চার হাজার গ্র্যাজুয়েট বের হয়। বিভিন্ন কারণেই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মানসম্পন্ন মেধাবী গ্র্যাজুয়েট তৈরি করা যাচ্ছে না। উচ্চতর শিক্ষায় মেধা সৃষ্টি করতে না পারলে দেশের কোনো উন্নয়নই টেকসই হবে না। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা অগ্রসর হতে পারব না। শোনা যাচ্ছে, আরো চার-পাঁচটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় চালু করা হবে। সংগত কারণেই নতুন কোনো কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় না খুলে বর্তমানে যা আছে সেগুলো আরো সমৃদ্ধ করা দরকার। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে আগামী ৫০ বছরে দেশের কোথায় কতজন কৃষিবিজ্ঞানী প্রয়োজন হবে তা নির্ধারণ করে সে মোতাবেকই কৃষি গ্র্যাজুয়েট তৈরি করতে হবে। যদি আরো অধিকসংখ্যক গ্র্যাজুয়েট দরকার হয়, তবে নতুন কোনো বিশ্ববিদ্যালয় না খুলে নির্বাচিত কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার সব সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে ছাত্র সংখ্যা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। তাতে সরকারের যেমন অনেক সাশ্রয় হবে, একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গুণগত মানও বাড়বে। এই মুহূর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বা শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে মেধাসম্পন্ন বিশ্বমানের গ্র্যাজুয়েট তৈরির ওপর জোর দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, এখন বিশ্বে চরম প্রতিযোগিতার সময়, বিশ্ব র্যাংকিংয়ে স্থান করতে না পারলে বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা যাবে না। কাজেই সব বিশ্ববিদ্যালয়ে কিউএস র্যাংকিংয়ের জন্য নির্ধারিত যে ফ্যাক্টরগুলো আছে, তা যাতে যথাযথ প্রয়োগ করা যায় সে পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। সব স্তরে জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা না গেলে কোথাও কোনো উন্নয়ন করা সম্ভব নয়। প্রাইভেট সেক্টরে সার্টিফিকেট বিক্রির যে হিড়িক পড়েছে তার লাগাম টেনে ধরতে হবে। কাজেই বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি না করে মেধা ও মান বাড়ানোই সময়ের দাবি।
লেখক : সাবেক উপাচার্য, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং অধ্যাপক, পশু প্রজনন ও কৌলিবিজ্ঞান বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
শেয়ার করুন এই পোস্ট
- Share on Facebook (Opens in new window) Facebook
- Share on X (Opens in new window) X
- Share on WhatsApp (Opens in new window) WhatsApp
- Share on Telegram (Opens in new window) Telegram
- Share on X (Opens in new window) X
- Share on Pinterest (Opens in new window) Pinterest
- Print (Opens in new window) Print
- Email a link to a friend (Opens in new window) Email
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
