এইমাত্র পাওয়া

বাড়তি টাকা না দিলে মেলে না টিকিট

পাটুরিয়া ঘাটে অতিরিক্ত টাকা ছাড়া মেলে না বিআইডব্লিউটিসির ফেরির টিকিট—এমন অভিযোগ পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে চলাচলরত ট্রাকচালকদের। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত গুরুত্বপূর্ণ নৌরুট পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ঘাট। আর এ ঘাটেই চালক, যাত্রী এবং পণ্যবাহী ট্রাকচালকদের পোহাতে হয় চরম দুর্ভোগ। সরকার নির্ধারিত রসিদে যে টাকার অঙ্ক লেখা থাকে তাতে মেলে না ফেরির টিকিট। সে জন্য গুনতে হয় বাড়তি টাকা। আর এর কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। ঘাটের যানজটের অবস্থা বুঝে বেড়ে যায় চাহিদা। তা কোনো কোনো সময় ৩০০ থেকে ৩ হাজার টাকা, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে আরো ওপরে উঠে যায়। সোমবার ইত্তেফাকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে এ অনিয়মের চিত্র। এ দিন বেলা ২টার দিকে টিকিট কাউন্টারে বাড়তি টাকায় টিকিট বিক্রি করছিলেন বিআইডব্লিউটিসির অফিস সহকারী হাসেম। সাংবাদিক দেখে ট্রাকচালককে টাকা ফেরত দিয়ে দ্রুত কাউন্টার ত্যাগ করেন তিনি। পরে দায়িত্বে থাকা সিনিয়র সুপারিনটেনডেন্ট গোলাম মোস্তফার সঙ্গে কথা বলতে গেলে তিনি এ প্রতিবেদকে টাকা দিয়ে ম্যানেজ করার চেষ্টা করেন। একই সঙ্গে তিনি এই অনিয়মের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘আমার চাকরির বয়স ৩০ বছরের বেশি। ১৯৬৭ সাল থেকে এখানে এভাবেই হয়ে আসছে। চালকরা খুশি হয়ে আমাদের অতিরিক্ত টাকা দিয়ে থাকে, যা আমরা সবাই মিলে ভাগ করে নেই।’

পরিবহনে কিছুটা শিথিলতা থাকলেও দুর্ভোগ চরমে পণ্যবাহী ট্রাকচালকদের। সিরিয়ালে রাখা, স্কেল, টিকিট পাওয়া থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে ভোগান্তি। উেকাচ দিয়েও রেহাই পাওয়া যায় না বলে জানান ট্রাকচালকরা। তারা জানান, বিআইডব্লিউটিসির অসাধু কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে বছরের পর বছর চলছে টিকিট কাউন্টারের এ অনিয়ম। উচ্চ মহলের নজরদারিতে দুয়েক দিন নিয়ম মানা হলেও পরে ফিরে যায় আগের অবস্থায়। বর্ষা মৌসুমে নদীভাঙন, পানি বৃদ্ধির ফলে তীব্র স্রোত, শুষ্ক মৌসুমে নাব্য সংকট, শীতকালে ঘন কুয়াশা, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া, কখনো ঘাটে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ। এ সব সমস্যা না থাকলেও তখন থাকে ফেরি স্বল্পতা। তা ছাড়া ফেরির দুর্বল ইঞ্জিন, ভাঙা পন্টুন, ঘাট নড়াচড়াও থাকে ড্রেজিং সংকট। একে পুঁজি করে বিআইডব্লিউটিসি অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে টিকিটপ্রতি নেওয়া হচ্ছে বাড়তি টাকা। ছোট মালবাহী গাড়িপ্রতি ২০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং বড় মালবাহী গাড়ির জন্য বাড়তি ৪০০ থেকে কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। বিআইডব্লিউটিসি অফিস সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন গড়ে এ রুটে ৫ থেকে ৮ হাজার যানবাহন পারাপার হয়। এর মধ্যে মালবাহী ট্রাক ৫০০ থেকে ৮০০। সেই হিসাবে প্রতি মাসে পাটুরিয়া ঘাটে কয়েক কোটি টাকা চাঁদাবাজি হয়। এ নিয়ে যাত্রী এবং শ্রমিকদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।

দেখা গেছে, টিকিট কাউন্টারে মানা হয় না সিরিয়াল। লেখা হয় না বোর্ডে। যার কাছ থেকে যত বেশি টাকা নিতে পারছে তাকেই আগে টিকিট দেওয়া হচ্ছে। মালবাহী বড় গাড়িতে ১ হাজার ৪৬০ টাকার টিকিটে নেওয়া হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ টাকা। মালবাহী ছোট গাড়ির জন্য ৭৬০ টাকার স্থলে নেওয়া হচ্ছে ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত। ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা ট্রাক ড্রাইভার আসলাম বাবু বলেন, ‘সকাল ৮টায় আমি ঘাটে পৌঁছেছি। নাওয়া-খাওয়া বাদ দিয়ে লাইনে দাঁড়িয়েছি। এখন দুপুর। তার পরও টিকিট পাই নাই। যারাই টিকিট নিচ্ছে সবার কাছ থেকে অতিরিক্ত ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা বাড়তি নেওয়া হচ্ছে। ২০০ টাকা বেশি দিছিলাম, নেয় নাই। পরে তাই নিয়ে গেছে বলে সিরিয়াল মিস হইছে।’ ট্রাক ড্রাইভার শাহিনুর বলেন, ‘এই রুটে আট বছর যাবত্ যাতায়াত করি। অতিরিক্ত টাকা ছাড়া কখনো ঘাট পার হইছি এমন হয় নাই’। সরকারি বিআরটিসি একাধিক চালকের সঙ্গে কথা বললে তারা বলেন, আমরা সরকারি গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিয়োজিত আছি। সরকারি গাড়ি চালাই, আমাদেরও কোনো ছাড় নাই। ঘাটে আসলে ঘুষ দিয়ে টিকিট নিতে হইব জানি। এখন ঘুষ দিয়েও টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না। ৪ ঘণ্টা যাবত্ টিকিট কাউন্টারে ঘুরছি, টিকিট নাই।’

বিআইডব্লিউটিসির মানিকগঞ্জ শাখার এজিএম তানভীর আহমেদ বলেন, আমাদের কাছে কোনো গ্রাহক অভিযোগ করেনি। ওপরে আমাদের অভিযোগ নম্বর দেওয়া আছে। অভিযোগের সত্যতা মিললে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.