নিউজ ডেস্ক ।।
বাল্যকাল থেকেই নতুন কিছু করার শখ নাছিমা আক্তারের। কিশোর বয়সে রঙিন কাগজে ফুল কিংবা খেলনা বানিয়ে সাজাতেন ঘর।সেই শখ থেকেই কাগজ ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে তিনি তৈরি করছেন নানান রঙের কলম। অল্প দিনেই ‘শুভ পরিবেশবান্ধব কলম’ নামের এই কলম বেশ সাড়া ফেলেছে। যা এখন যশোরের বিভিন্ন এলাকার শিক্ষার্থীদের হাতে হাতে।
শখ থেকে নিজ বাড়িতে তৈরি করা এসব পরিবেশবান্ধব কলমই এখন পরিবারের উপার্জনের প্রধান মাধ্যম নাছিমার। উৎপাদনের তুলনায় চাহিদা অনেক বেশি থাকলেও পুঁজির স্বল্পতায় আটকে আছেন তিনি। পুঁজি পেলে নিজের ব্যবসাটি আরো বৃহৎ পরিসরে চালিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন এই গৃহবধূর।
যশোর শহরের লোনঅফিস পাড়া এলাকার বাসিন্দা নাছিমা আক্তার। স্বামী মীর রবিউল আলম বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ হয়ে একরকম ঘরেই আছেন তিনি। তাদের মেয়ে অনার্সে পড়াশোনা করছেন আর ছেলে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
নাছিমা আক্তার জানান, ছোট বেলায় শখ করেই কলম বানানো শেখেন তিনি। কিন্তু বাস্তব জীবনে এই শখ তার কাজে লাগবে কখনো ভাবেননি। প্রতিদিন হাতে প্রায় ৩০০ পিস কলম তৈরি করতে পারেন। আর প্রতি পিস কলমের বিক্রয়মূল্য মাত্র পাঁচ টাকা। তার প্রতিদিন ৩০০ পিস কলম তৈরিতে খরচ হয় প্রায় ৯০০ টাকা। যা বিক্রি করে লাভ থাকে প্রায় ৫০০ টাকা। আর এই আয় দিয়েই অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসা আর দুই সন্তানের লেখাপড়ার খরচসহ সংসার চলছে তার।
নাছিমা আরো জানান, রঙিন কাগজে তৈরি পরিবেশবান্ধব এই কলম অন্য কেউ এখনও তৈরি করেনি। যে কারণে এটি বাজারে পাওয়া যায় না। প্রাথমিকভাবে তিনি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিক্রি করছেন। শিক্ষার্থীদের মধ্যেও কলমটির ব্যবহার বেড়েছে। ফলে উৎপাদন বাড়াতে পাড়লে কলমগুলো বাণিজ্যিকভাবে বাজারে বিক্রি করা যেতো। নাছিমা আক্তারের ছেলে মীর নাঈম আলম শুভ তার কাজে সহায়তা করছেন। যার নামেই কলমের নামকরণ করা হয়েছে ‘শুভ পরিবেশবান্ধব কলম’।
তিনি আরো জানান, গত বছরের জুনে পরিবারে অর্থনৈতিক সংকট চরম আকার দেখা দিলে সব সংশয় দূরে সরিয়ে নাছিমা প্রথম একশ’ পিস কলম নিয়ে উপস্থিত হন যশোর সদরের বাহাদুরপুর স্কুলে। সেখানকার প্রধান শিক্ষককে তার তৈরি কলম দেখিয়ে সেগুলো বিক্রির অনুমতি চান। প্রধানশিক্ষক তার বক্তব্যে সন্তুষ্ট হয়ে খুব অল্পসময়ের মধ্যে সেগুলো শিক্ষার্থীদের কাছে বিক্রি করে দেন। ওই শিক্ষকই তাকে পরামর্শ দেন, কলমগুলোতে যেন পরিবেশবান্ধব সিল লাগিয়ে দেওয়া হয়। এরপর থেকে তিনি ‘শুভ পরিবেশবান্ধব কলম’ সিলটি যুক্ত করে করে কলম বিক্রি করে সংসারের হাল ধরেছেন।
‘শুভ পরিবেশবান্ধব কলম’ প্রথমদিকে যশোরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করতেন নাছিমা। করোনার কারণে স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় কলম বিপণনে একটু সমস্যা হচ্ছে। তবে এখন তিনি বিভিন্ন অফিসসে এবং ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে কলম সরবরাহ করছেন।
তার মতে, দেশে প্রতিদিন হাজার হাজার প্লাস্টিকের কলম ব্যবহৃত হয়। সেইসব কলম মাটিতে ফেলে দেওয়া হয়, যা অপচনশীল। এ থেকে পরিবেশ নষ্ট হয়, মাটি ও বাতাস নষ্ট হয়। কিন্তু তার তৈরি কলমে কাগজের ব্যবহার হয়, কাগজ পচনশীল। সেকারণে ভোক্তাদের আগ্রহ রয়েছে বেশ।
নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি তিনি ইতোমধ্যে এলাকার দুই নারীকে রঙিন কাগজ থেকে কলম তৈরি শিখিয়েছেন। এই কলমের মাধ্যমে তিনি এলাকার নারীদের বেকারত্ব দূর করার স্বপ্ন দেখছেন। তবে স্বল্প পুঁজির কারণে তার কলম তৈরি ও বিপণনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নাছিমার স্বপ্ন, তার হাতে তৈরি ‘শুভ পরিবেশবান্ধব কলম’ দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার। এজন্য সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছেন তিনি।
যশোরে বেসরকারি ঋণদাতা সংস্থা গড়বো সমাজ কল্যাণ সংস্থার নির্বাহী পরিচালক আফজাল হোসেন মানিক জানান, তার সংস্থা বরাবরেই নতুন উদ্যোক্তার সাহস ও তাদের সফলতা এগিয়ে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন সময়ে স্বল্পসুদে এবং বিনাসুদে ঋণ দিয়ে থাকে। শহরের লোন অফিস পাড়ার নাছিমার ‘শুভ পরিবেশবান্ধব কলম’ তৈরি কথা শুনে তাকে বিনাসুদে ঋণ দেওয়া হয়েছে। আমাদের মতো আরো সংস্থা যদি তাকে সহযোগিতা করে তাহলে সে আরো অনেক দূরে যাবে।
যশোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন বলেন, দেশে প্রতিদিন হাজার হাজার প্লাস্টিকের কলম ব্যবহৃত হয়। সেইসব কলম মাটিতে ফেলে দেওয়া হয়, যা থেকে পরিবেশ নষ্ট হয়। কিন্তু নাছিমার তৈরি কলমে কাগজের ব্যবহার হয়, ফলে এটি পরিবেশবান্ধব। পরবর্তীতে জেলা পুলিশ চাহিদা অনুযায়ী নাছিমার কাছ থেকে কলম সংগ্রহ করবে।সুত্র বাংলানিউজ
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
