এইমাত্র পাওয়া

সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগে প্যানেলের দাবী

শিক্ষাবার্তা ডেস্ক :
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড আর শিক্ষিত দক্ষ জনগোষ্ঠী  একটা দেশের মূল চালিকাশক্তি। শিক্ষিত তরুণদের যথাযথ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা সরকারের প্রধান দায়িত্ব
এতে করে দেশের বেকারত্ব লাঘব হবে তেমনি শিক্ষিত তরুণ রা হয়ে উঠবে দক্ষ জনশক্তি। দেশের শিক্ষিত শ্রেণীর কর্মসংস্থানের বিরাট একটা অংশ পূরণ হয় সরকারি চাকুরীর মাধ্যমে আর সরকারী চাকরি ক্ষেত্রে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক পদে বিপুল সংখ্যক শিক্ষিত  শ্রেণী নিয়োগ লাভ করে বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষিত তরুণীরা (৬০% মহিলা)  নিয়োগ লাভ করে থাকে এতে করে মেয়েদের কর্মসংস্থানের পথ সুগম হয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ উপজেলা ভিত্তিক হয়ে থাকায় দেশের সকল জেলা উপজেলার মেধাবী চাকরি প্রার্থীরা নিজেদের মেধার প্রমাণ দিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবনে প্রবেশ করে। কিন্তু নানা জটিলতায় দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। ২০১৪ সালের রাজস্ব খাত ভুক্ত সহকারী শিক্ষক নিয়োগে আবেদন কারী  প্রার্থীরা সব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এই সময়ে। প্রায় তিন-চার বছর ধরে পুল প্যানেল এই দুই ধরনের শিক্ষক নিয়োগ  নিয়ে জটিলতা ও আইনি যুদ্ধ চলেছে। পুলভুক্ত শিক্ষকদের মামলায় উচ্চ আদালতের নির্দেশে গত চার  বছর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ ছিলো। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তহীনতা, পূর্বাপর না ভেবে প্রার্থীদের প্যানেল করা ও পুল গঠন করে শিক্ষক নেওয়া এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এ অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এই জটিলতায় সব চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ২০১৩-১৪ সালে শ্রমবাজারে প্রবেশ কারী চাকরি প্রার্থীরা।
১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৪ ইং তারিখে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরাধীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের রাজস্বখাত ভুক্ত সহকারী শিক্ষক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি  প্রকাশিত হয়। দীর্ঘ ৪ বছর পর ২০১৮ সালে এপ্রিল -জুনে লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত এবং জুলাই  মাসে লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয় এতে উত্তীর্ণ ২৯৫৫৫ এবং নিয়োগের জন্য মনোনীত হয় ৯৭৬৭ জন, ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত সারা দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদ ছিলো ২০০০০ হাজারের অধিক। ২০১৪ স্থগিত নিয়োগ থেকে ১০০০০ শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার কথা বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রকাশিত  হয়েছিলো অথচ নিয়োগ প্রদান করা ৯৭৬৭ জনকে।
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির ৮ নং কলামে শূন্যপদের ভিত্তিতে নিয়োগ প্রদান করার বিষয় সুস্পষ্ট  উল্লেখ থাকলেও ২০১৪ স্থগিত নিয়োগের ক্ষেত্রে শূন্য পদ পূরণের নিয়ম যথাযথ ভাবে প্রয়োগ হয় নি।অথচ ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হবার ১ বছর পর জাতীয় দৈনিক “প্রথম আলো ” এর, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী ঐ সময় প্রায় ৪০ হাজার নিয়মিত পদ শূন্য ছিলো। এত বিপুল সংখ্যক পদ শূন্য থাকার পরও পুল শিক্ষকদের রীট জনিত কারনে ৪ বছর ধরে নিয়োগ কার্যক্রম বন্ধ ছিলো। ৪ বছর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত না হবার ফলে যেমন হাজার হাজার চাকরী প্রার্থীরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত ২০১৪ স্থগিত  নিয়োগে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীরা  বিধি মোতাবেক শূন্য পদ পূরণ না করাতে। তাই মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে যখন ২০১৪ স্থগিত নিয়োগ থেকে সব থেকে বেশি সংখ্যক শূন্য পদ পূরণ করার প্রয়োজন ছিলো।
অপরদিকে ২০১৮ সালের ৩০ জুলাই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হবার পর বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক এ  প্রকাশিত হয় যে ২০১৮ সালের নিয়োগ থেকে ১০-১২ হাজার শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হবে।(“দৈনিক শিক্ষা” এর ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮) এর তথ্য অনুযায়ী তৎকালীন সময়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের  মহাপরিচালক আবু হেনা মো. মোস্তফা কামাল বলেন, সহকারী শিক্ষক নিয়োগে অনলাইন আবেদন কার্যক্রম শেষ হয়েছে। টেলিটক মোবাইলের মাধ্যমে আবেদন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ১ আগস্ট থেকে শুরু হয়ে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত এ আবেদন প্রক্রিয়া চলে।
মহাপরিচালক আবু হেনা বলেন, ১২ হাজার সহকারী শিক্ষক নেয়া হলেও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনেকের আগ্রহ থাকায় সারা দেশে ১৮ লাখ ৮৬ হাজার ৯২৭ আবেদন জমা পড়ে।
অথচ ২০১৮ সালের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি থেকে ১৮১৪৭ জনকে শূন্য পদের ভিত্তিতে নিয়োগ প্রদান করা হয়।
২০১৯  সালে অনুষ্ঠিত বিতর্কিত  নিয়োগ পরীক্ষা  থেকেই  ডিসেম্বর(২০১৯) মাসে চুড়ান্ত ভাবে  ১৮১৪৭ জনকে নিয়োগ প্রদান করা হয় শূন্য পদের চাহিদার ভিত্তিতে। ১৬ মাসের ভিতর নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়া নিয়োগে যদি ৬ হাজারের অধিক পদে বেশি নিয়োগ প্রদান করা যায় তাহলে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হবার ৪ বছর পর নিয়োগ সম্পন্ন হওয়া নিয়োগে কেন শূন্য পদ পূরণ করা হলো না? মানবিক দিক বিবেচনা করে ২০১৪ স্থগিত নিয়োগ থেকে বেশি সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ প্রদান করার প্রয়োজনীয়তা  ছিলো কারন শতভাগ স্বচ্ছতার সাথে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত  হয়েছিলো  সেখানে উল্টো বিমাতা সুলভ আচরণের শিকার হতে হয় ২০১৪ স্থগিত নিয়োগে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের।
এশিয়া-প্যাসিফিক এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল আউটলুক-২০১৮ অনুযায়ী এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মধ্যে সরকারি খাতে কর্মসংস্থান সবচেয়ে কম বাংলাদেশে। দেশটিতে মোট কর্মসংস্থানে সরকারি খাতের অবদান মাত্র ৩ দশমিক ২ শতাংশ।
অথচ মধ্যম আয়ের দেশের মোট শ্রমশক্তির নূন্যতম ১০% কর্মসংস্থানের সুযোগ হয় সরকারী চাকুরিতে সেখানে আমাদের দেশে মাত্র ৩.২% কর্মসংস্থানের সুযোগ হয় সরকারী খাতে। দেশের উচ্চ শিক্ষিত তরুণদের ২৮% সরাসরি কোন কাজের সাথে জড়িত না, এত বিপুল সংখ্যক উচ্চ শিক্ষিত তরুণদের নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা ও সুস্পষ্ট নয়। ২০১৫ সাল থেকে প্রতি বছর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে বলা হচ্ছে ৩৫০০০০ হাজারের বেশি পদ সরকারী প্রতিষ্ঠানে শূন্য অবস্থায় আছে অথচ সরকার থেকে শূন্য পদ পূরণের কোন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। লাখ লাখ পদ শূন্য থাকার ফলে প্রশাসনিক কাজে গতিশীলতা নেই। শূন্য পদ পূরণ হলে উচ্চ শিক্ষিত মেধাবী চাকরী প্রার্থী রা যেমন বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতো তেমনি সরকারী সকল কাজে গতিশীলতা আসতো।
শিক্ষাখাতে লোকবলের অভাবে সুষ্ঠ ভাবে মানসম্মত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রদান বাধা গ্রস্থ হচ্ছে। ২০১৪ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া (নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি) বন্ধ থাকার ফলে সারাদেশে ব্যাপক আকারে শিক্ষক সংকটের সৃষ্টি হয় অথচ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর শিক্ষক সংকট দূরীকরণে কার্যকরী কোন ভূমিকা পালন করে নি এতে করে ২০১২-২০১৪ সালে স্নাতকোত্তর পাশ করা চাকরী প্রার্থী রা প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছে। কেননা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পদে বেশি সংখ্যক চাকরী প্রার্থীর সরকারী সেক্টরে কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষিত তরুণীদের (৬০%), নারীর ক্ষমতায়নের জন্য তাদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার বিকল্প নেই অথচ ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৮ সালের ৩০ জুলাই পর্যন্ত সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে (সাধারন কোটা) নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয় নি।এর ফলে ঐ সময়ে শ্রমবাজারে প্রবেশকারী উচ্চশিক্ষিত তরুণ/তরুণীদের চাহিদা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত।২০১৪ সালের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় ২০১৮ সালের এপ্রিল -জুন সময়ের হিসেবে ৩ বছর ৮ মাস পর এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করতে ৪ বছর সময় লেগে যায়। এই যে ৪ বছর একজন চাকরী প্রার্থীর জীবন থেকে ঝরে গেলো তার ক্ষতিপূরণ কিন্ত চাকরী প্রার্থী রা পায় নি।এমতাবস্থায় ২০১৪ স্থগিত নিয়োগ থেকে বেশি সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে কিছু টা হলেও চাকরী প্রার্থীদের ক্ষতিপূরণ করা যেতো কিন্ত প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর শূন্য পদ পূরণ তো দুরের কথা, চাকরী প্রার্থীদের  রীতিমত বঞ্চিত করে ১০০০০ থেকেও ২৩৩ জন কম নিয়োগ প্রদান করে পরবর্তী নিয়োগের জন্য পদ সংরক্ষণ করে। ২০১৪ স্থগিত (২০১৮) সালে অনুষ্ঠিত নিয়োগে লিখিত  পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের সাথে কেন এত অমানবিক আচরণ করা হলো?  অথচ ২০১৮ সালের নিয়োগ (২০১৯) অনুষ্ঠিত নিয়োগ থেকে শূন্য পদের ভিত্তিতে ১৮০০০ এর বেশি শিক্ষক নিয়োগ প্রদান করা হয়। ২০১৪ সালের স্থগিত নিয়োগে লিখিত পরীক্ষা উত্তীর্ণ সকলেই মেধাবী ছিলো এতে কোন সন্দেহ নাই। ২০১৪ সালের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৯০% প্রার্থীর পরবর্তী নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হবার পুর্বে চাকরীতে আবেদন করার বয়স শেষ হয়ে গিয়েছিলো বয়সের বাধার কারণে।
যেহেতু ২০১৪ স্থগিত নিয়োগে লিখিত পরীক্ষায় সকল প্রার্থী নিজ যোগ্যতা বলে মৌখিক পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হয়েছিলো সেই হিসেবে তারা সকলেই শিক্ষকতার মত মহান পেশায় নিয়োগ পাবার যোগ্য।
তাই ২০১৪ স্থগিত নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ সকল প্রার্থীকে প্যানেলের মাধ্যামে নিয়োগ দিয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ প্রদান করা এবং বিশেষ করে নারীর ক্ষমতায়ন বাস্তবায়ন হোক মুজিববর্ষের অঙ্গীকার
লেখক: 
আকতারউজ্জামান

Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading