এইমাত্র পাওয়া

করোনাকালীন সময়ে ছাত্র-ছাত্রীদের টিউশন ফি আদায় ও মানবিক আচরণ

জি. এইচ.কিবরিয়া।।

বাংলাদেশে প্রথম করোনা শনাক্ত হয় ৮ মার্চ ২০২০ইং। ২৬ মার্চ ২০২০ইং থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর অনেকটাই স্থবির হয়ে যায় দেশের অর্থনীতির চাকা। দেশের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে দেখা দেয় চরম অস্থিরতা। মানুষের চোখে মুখে ফুটে ওঠে অনিষ্চয়তার ছাপ।

চরম উৎকন্ঠায় ও অস্থিরতার মধ্যে কেউ কেউ পরিবার-পরিজন নিয়ে হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন আবার কেউ কেউ পরিবার-পরিজন নিয়ে পাড়ি জমিয়েছেন গ্রামের বাড়ীর উদ্দেশ্যে। শহর থেকে গ্রাম সর্বত্র একই হা-হা-কার, অস্থিরতা আর অনিষ্চয়তা।

গত ১৭ই মার্চ ২০২০ইং থেকে সব ধরণের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে আছে। কয়েক দফায় ধাপেধাপে বাড়ানো হয়েছে বন্ধের সময়সীমা। জেলা প্রশাসকদের সাথে এক ভিডিও কনাফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘যখন এটা (করোনাভাইরাস) থামবে, আমরা তখনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলবো।’ এরই মধ্যে বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের কারণে শিক্ষার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চলমান ছুটি আগামী ৬ আগস্ট ২০২০ইং পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

করোনার কারণে গত ১৭ মার্চ ২০২০ইং থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের মধ্যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে টিভিতে ও অন-লাইনে ক্লাস সম্প্রচার করা হচ্ছে।

এবার আসা যাক আসল ঘটনায়, করোনাভাইরাসের সতর্কতার অংশ হিসেবে প্রাথমিকভাবে ৩১শে মার্চ ২০২০ইং পর্যন্ত বাংলাদেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। দ্বিতীয় ধাপে বাংলাদেশে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি মোকাবেলায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটি বাড়িয়ে ৯ই এপ্রিল ২০২০ইং পর্যন্ত করা হয়।

এরই মধ্যে দেশী-বিদেশী দু’একজন অভিভাবক আমাদেরকে অনলাইনে ক্লাশ চালু করা যায় কিনা সে ব্যাপারে চিন্তা ভাবনা করতে বলেন। তাৎক্ষণিক আমাদের কলেজের অধ্যক্ষ মহোদয়ের সাথে আলোচনা করি। তিঁনি আমাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশ দেন।

আমি ও আমার সহকর্মীদের সহায়তায় সকল ছাত্র-ছাত্রীদের ই-মেইল আইডি সংগ্রহ করি এবং আমরা সকলে মিলে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে সকল ছাত্র-ছাত্রীদের অনলাইনের মাধ্যমে ক্লাসে অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করার জন্য ছাত্র-ছাত্রীদের অনলাইন নিবন্ধন সম্পন্ন করি । সকল ছাত্র-ছাত্রীদের নিকট ই-মেইলের মাধ্যমে তাদের ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড প্রেরণ করি।

প্রতিষ্ঠান বন্ধের মধ্যেও বিভিন্ন ব্যাচের দেশী-বিদেশী প্রায় সহস্রাধিক ছাত্র-ছাত্রীদের তাদের ই-মেইল আইডি সংগ্রহ করা নতুন নিবন্ধিত ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড এবং তাদের ক্লাসের পাঠ্য বিষয়গুলো যথাযথ ভাবে নিবন্ধন করে সকল ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে যথাযথভাবে প্রেরণ করা সত্যি একটি কঠিন কাজ ছিলো। এই দুরূহ কাজ সম্পন্ন হয়েছে আমাদের দৃঢ় মনোবল ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি দায়বদ্ধতায় এবং ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষা কার্যক্রমকে মানবিক দৃষ্টি কোন থেকে বিবেচনা করায়।

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে ২৬শে মার্চ ২০২০ইং থেকে ৩০শে মে পর্যন্ত ৬৬ দিন সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার। সকল ছাত্র-ছাত্রীদের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে করোনাকালীন পুরো সময় জুড়ে একটি দিনও সাধারণ ছুটি ভোগও করিনি।

যখন সবাই জীবনের মায়ায় পরিবারের সাথে ‘হোম কোয়ারেন্টাইনে’ ছিলেন ঠিক তখন আমরা বিপরীত মেরুতে সমস্ত শিক্ষকগণ ছাত্র-ছাত্রীদের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে করোনাকালীন সময়ে ছাত্র-ছাত্রীরা যাতে পড়াশুনায় পিছিয়ে না পড়ে সে জন্য প্রতিদিন অনলাইনের মাধ্যমে নিরবিচ্ছিন্নভাবে পাঠদান করে যাচ্ছেন শুধুমাত্র মানবিকতার কারণে।

শিক্ষকগণ ছাত্র-ছাত্রীদের নিজের সন্তান সমতুল্য মনে করেন বলেই অনেকে নিয়মিত বেতন না পেয়েও হাসি মুখে পাঠদান করে যাচ্ছেন। এমনকি এ কার্যক্রমের সাথে সংশ্লিষ্ট অনেক সহকর্মী করোনায় আক্রান্তও হয়েছেন।

আমরা জানি শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। আর সে মেরুদণ্ড তৈরির নিখুঁত কারিগর হলেন আমাদের সম্মানিত শিক্ষকগণ। আজ করোনাকালীন সময় আমরা ক’জন অভিভাবক শিক্ষকের খোঁজ নিয়েছি একবারও কি নিরবে ভেবে দেখেছেন!

কারিগরেরই যদি সোজা হয়ে দাঁড়ানোর(অর্থনৈতিক) মেরুদণ্ড না থাকে তাহলে তিঁনি জাতির মেরুদণ্ড তৈরী করবে কি করে? শিক্ষকদের ও পরিবার আছে আর পরিবারের ভরণপোষণের ভার তাঁর উপরই বর্তায়। শিক্ষক যদি এত কষ্ট করে মাস শেষে বেতন না পান তাহলে তাঁর পরিবার চলবে কি করে? আজ প্রায় চার মাস অতিবাহিত হতে চলেছে এরমধ্যে প্রায় ৯৮% ছাত্র-ছাত্রী একটি টাকাও টিউশন ফি দেয়নি।

উল্টো বেতন মওকুফের জন্য আবেদন করেছে। অভিভাবকবৃন্দ মানব বন্ধন করছেন। এই পেশার সাথে জড়িত অনেক বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, কর্মকর্তা–কর্মচারী ইতিমধ্যে চাকুরী হারিয়েছেন, এমনকি অনেকে দীর্ঘদিন যাবৎ বেতন পাচ্ছেন না। এই পরিবারগুলোর নিরব কান্না দেখার কেউ নেই!

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অধিকাংশ বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাত্র-ছাত্রীদের ভর্তি আর টিউশন ফি দিয়েই চলে। আর সেই টিউশন ফি যদি না পাওয়া যায় তাহলে প্রতিষ্ঠান চলবে কি করে? শিক্ষকের বেতনই বা দিবে কি করে? আমাদের সকলেরই একটু ভেবে দেখা উচিৎ।

আসুন এই করোনাকালে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা পরিষদ, ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবক সহ আমরা যার যার অবস্থান থেকে মানবিক আচরণ করি! একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ বিনির্মানের জন্য।
লেখক-
ব্যবস্থাপক ও বিভাগীয় প্রধান
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ
ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.