একটি অপমৃত্যু ও ননএমপিও জীবনের করুণ কাহিনী

মো.সাজ্জাদ হোসেন।।
প্রিয় পাঠক,শিরোনাম দেখে অনেকে শিউরে উঠতে পারেন। আবার অনেকে হয়তবা ভাবতে পারেন লেখক কোন কল্প কাহিনী নির্ভর গল্প লিখেছে। বাস্তবতাও অনেক সময় কল্প কাহিনীতে পরিণত হয়। কল্প কাহিনীও বাস্তবতার কাছে হার মেনে নেয়। আত্মহত্যা মহাপাপ। সকল ধর্মমতে এটি নিষিদ্ধ। মহাপাপের এই কাজটি কোন ব্যক্তি সুস্থ মস্তিষ্কে করতে পারেনা। রাকিবুল ইসলাম জুয়েল(৩০), রাজশাহী জেলার বাঘা উপজেলার বাজুবাঘা ইউনিয়নের জোতরাঘব গ্রামের কৃষক এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সিদ্দিকুর রহমানের সন্তান। দুই বোনের অভিভাবক তুল্য একমাত্র ভাই। বাবা মায়ের আদর,স্নেহের গর্বিত সন্তান। পড়ালেখার পাঠ শেষ করে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিল মহান পেশা,জাতি গড়ার কারিগর শিক্ষকতা পেশাকে।

শিক্ষকতা সেবামূলক একটি মহান পেশা। নিজের অর্জিত জ্ঞান বুদ্ধি বিলিয়ে দিয়ে ছাত্র-ছাত্রী অভিভাবকসহ সকল মহলে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করা যায়। ঘরে বাহিরে সবখানেই শিক্ষকের জয়জয়কার। শিক্ষক সকল সভ্যতার ফুল ফোঁটায়। শিক্ষক মানেই গুরু। গুরু হলো এই পৃথিবীর সবচাইতে সম্মানী ব্যক্তি। পথে ঘাটে বের হলেই প্রচুর সম্মান পাওয়া যায়। বয়সের ভেদাভেদ না করে পৃথিবীর সকল ব্যক্তিই শিক্ষককে যথেষ্ট সম্মান করে। রাকিবুল ইসলাম জুয়েল ৪-৫ বছর আগে কৃষি ডিপ্লোমা শেষ করে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন শিক্ষকতা পেশাকে। বাড়ি থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে পটুয়াখালী কৃষি ডিপ্লোমা ইন্সটিটিউট এ যোগদান করেছিলেন শিক্ষক হিসেবে। ভেবেছিলেন শিক্ষকতা একটি মহান পেশা। সবাই শিক্ষককে সম্মান করে। আর কিছু না পাই শিক্ষকতাই সম্মানতো পাওয়া যাবে।

এমপিও কিংবা ননএমপিও সেটা কোন ব্যাপার নয় পেটের প্রয়োজন তিন বেলা খাবার। সেটা নিশ্চয় শিক্ষকতা পেশাই পাওয়া যায়। ভালোবেসে বিয়েও করেছিলেন। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস। ননএমপিও শিক্ষকের সাধের ঘর সংসার ছয় মাসও টেকেনি। ননএমপিও শিক্ষকের কষ্টের জীবনের সাথে নিজেকে আর জড়িয়ে না রেখে প্রিয়তমা স্ত্রী সকল প্রেম ভালবাসাকে ছিন্ন করে চলে গেছে। বাস্তবতা বড়ই কঠিন। সেটা রাকিবুল ইসলাম জুয়েল স্যারের মেনে নিতে হয়ত অনেক কষ্ট হয়েছে। ননএমপিও চাকুরি জীবনের যন্ত্রণা। প্রিয়তমা স্ত্রীর সাথে বিচ্ছেদ,বাবা মায়ের বড় সন্তান হিসেবে ,ছোট বোনদের অভিভাবক হয়ে তাদের জন্য কিছু না করতে পারার কষ্ট। সব কিছু মিলিয়ে হতাশাগ্রস্থ জীবন। হতাশাগ্রস্থ জীবনে সুখ খুঁজে পাওয়া খুবই দুস্কর। হতাশাগ্রস্থ জীবন নিয়ে বেঁচে থেকে কি হবে। বুধবার ( ৭ মে) আনুমানিক রাত তিনটার সময় বাসার পাশেই আম গাছের ডালে ওড়না পেঁচিয়ে গলায় পরে পৃথিবীর সমস্ত মায়া মমতা ত্যাগ করে পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় নিয়ে চলে গেছেন।

বাবা মায়ের আদর ¯েœহ,ছোট বোনদের ভালবাসা,ছাত্র-ছাত্রীর প্রতি মায়া মমতা কোন বন্ধনই তার অসহ্য যন্ত্রনার বিরুদ্ধে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। মা,বাবা ছোট বোন আর কেউ পথ চেয়ে বসে থাকবে না। প্রিয় ছাত্র-ছাত্রী,প্রিয় কর্মস্থল,প্রিয় সহকর্মী সবাইকে ছেড়ে আজ অন্য পৃথিবীর বাসিন্দা। মা বাবার আদর স্নেহ মাখা চেনা মুখ আজ অচেনা। হতাশাগ্রস্থ জীবনের নির্ঘুম রজনী আর কাটাতে হবেনা। কারও মুখাপেক্ষি হয়ে আর চেয়ে থাকতে হবেনা। কারও কাছে চাইতে হবেনা আমার অধিকার আমাকে ফিরিয়ে দাও। আমার কাজের পারিশ্রমিক তোমাদেরকে দিতেই হবে। আমি বিনা বেতনে না খেয়ে কেন মারা যাব।

জুয়েল স্যারের মৃত্যু রাষ্ট্রের কাছে অনেকগুলো প্রশ্ন রেখে গেছে। আমাকে আত্মহত্যা কেন করতে হলো ? আমার মৃত্যুর জন্য কে দায়ী ? আমি নিজেই আমার মৃত্যুর জন্য দায়ী ? না এই সমাজ,এই রাষ্ট্র দায়ী। তিরিশ বছরের টকবগে যুবক এই সমাজ এবং রাষ্ট্রকে কি দিতে চেয়েছিল ? বিনিময়ে রাষ্ট্রের কাছে কি চেয়েছিল। তরুণ প্রজন্ম রাষ্ট্রের সম্পদ। এই সম্পদগুলো কেন নষ্ট হবে কেন অকালে ঝরে যাবে ?

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে অনেক ত্যাগ তিতিক্ষার মাধ্যমে পাওয়া স্বাধীন দেশ। প্রিয় স্বাধীন দেশে কেন জুয়েল স্যারের মত তরুণ শিক্ষক অকালে ঝরে যাবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলাদেশ গড়ার কারিগর শিক্ষক সমাজের মধ্য থেকে আরও একটি নক্ষত্রের বিদায়। জাতি নির্মাণের দক্ষ কারিগররা আজ অনাহারে। বছরের পর বছর বিনা বেতনে শ্রম দিতে গিয়ে আজ তারা ক্লান্ত,পরিশ্রান্ত। করোনা মহামারীতে ননএমপিও শিক্ষক সমাজ বড় অসহায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য সন্তান।

আপনি সবার মনের কথা বোঝেন। আপনার দক্ষ নেতৃত্বে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়ে গেছে। বিশে^র অন্যান্য পরাশক্তিধর দেশের তুলনায় আপনি সফল রাষ্ট্রনায়ক। করোনা মহামারীতে আপনার নেয়া প্রতিটি পদক্ষেপ বিশ^বাসীর কাছে প্রশংসিত হয়েছে। আপনার অক্লান্ত পরিশ্রমে দেশবাসী অনেকটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে শুরু করেছে। ননএমপিও শিক্ষক সমাজ বড় আশা নিয়ে আপনার মুখপানে চেয়ে রয়েছে। হে মানবতার মা,বিশ^নেত্রী আপনি ননএমপিও শিক্ষক সমাজকে রক্ষা করুণ।
লেখক- প্রভাষক,হিসাব বিজ্ঞান
লাউর ফতেহপুর ব্যারিস্টার জাকির আহাম্মদ কলেজ
নবীনগর,ব্রাহ্মণবাড়িয়া।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.