মানব অস্তিত্বে প্রকৃতিবাদ এবং অনিয়ন্ত্রিত মানবিক আচরণ

মো. শহিদুল ইসলাম।।

বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির আলোকে প্রয়োজন এবং অপ্রয়োজন শব্দ দুটি অত্যন্ত গুরুত্বের দাবিদার। বর্তমান মানব সমাজ খুবই একমুখী হয়ে পড়েছে। আর এই একমুখী বিষয়টি সুখ বা বিনোদন বা স্বাচ্ছন্দ্য নির্ভর; আরো ভালোভাবে বললে বলা যায় আরাম-আয়েশ।এই আরাম-আয়েশ এর জন্য পৃথিবীর সব অঞ্চলের মানুষ অপরিকল্পিত পথে ছুটে চলেছে।

নগরায়ন এবং প্রযুক্তি দুটোই মানুষের আরাম আয়েশের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ ভাবা হয়। অন্যদিকে প্রকৃতি বা পরিবেশ সম্পর্কিত ভাবনাগুলোকে খুবই হালকা বলে ভাবা হয়। পৃথিবীতে মানব সভ্যতার সূচনা থেকে আজ পর্যন্ত যদি বিশ্লেষণ করা হয় তবে যুদ্ধ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, বিভিন্ন অস্ত্রের পরীক্ষা, মহাকাশ অভিযান বিষয়গুলোকে যেমনভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে বা হচ্ছে তার তুলনায় প্রাকৃতিক পরিবেশ ও মানবিক পরিবেশ সংক্রান্ত ভাবনা বা কর্মকাণ্ড ছিল একেবারে তলানিতে। যার ফলাফল এই তথাকথিত অত্যাধুনিক সময়ে এসেও ভোগ করতে হচ্ছে বিশ্ববাসীকে।

মানুষ অনেক কল্পনাপ্রবণ আর স্বপ্নবিলাসী। প্রমাণ স্বরূপ বলা যায় মহাকাশ অভিযানের কথা, চাঁদে অবতরণ, মঙ্গল গ্রহে বসবাসের চিন্তা, কৃত্রিম মানব তৈরি এবং যন্ত্র কেন্দ্রিক মানবসভ্যতার বিকল্প তৈরি করার চেষ্টা ইত্যাদি। একটি কথা খুব স্পষ্টভাবেই বলতে চাই, প্রতিযোগিতাপূর্ণ অসীম চাহিদাই মানব সভ্যতা ধ্বংসের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াবে। আমরা সমুদ্রের নিচে হোটেল মোটেল তৈরি করছি, আকাশচুম্বী ভবন নির্মাণ করে বিনোদনের ব্যবস্থা করছি, সমুদ্রের, বনের প্রাণী গুলোকে ধরে একুরিয়ামে, চিড়িয়াখানায় রাখছি, শিকার করছি অবাধে এবং সর্বোপরি প্রাকৃতিক সিস্টেমগুলোর প্রতি হস্তক্ষেপ করছি মারাত্মকভাবে।

একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে, প্রকৃতি আপনা হতে যেমনভাবে সজ্জিত তাকে সেভাবে থাকতে দেওয়াই হলো আমাদের জন্য কল্যাণের, প্রয়োজন অনুসারে যথাযথ ব্যবহার করাটাও বুদ্ধিমানের কাজ। মনে রাখতে হবে, প্রকৃতি একটি জটিল এবং বৈচিত্রময় পদ্ধতিতে চলে। এত জটিল ও বৈচিত্রময় যে আমরা কখনোই একে নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না। কাজেই প্রকৃতিকে প্রাধান্য দিয়েই প্রতিটি কাজের পরিকল্পনা করতে হবে। আমরা প্রকৃতির উপর যতটা নির্ভরশীল, প্রকৃতি আমাদের উপর তেমনটা নির্ভরশীল নয়। এর উল্টোটি হলে আমরা আদৌ ভালো থাকতে পারব না। ইতোমধ্যে যা বারবার প্রমাণিত হয়েছে এবং হচ্ছে। এতোসব বলে আমি সংস্কৃতি ও সভ্যতার উন্নয়নে বাধা প্রদান করছি না।

কিন্তু আমার প্রশ্ন এই উন্নয়নের মাপকাঠি কী হওয়া উচিত? এত এত উন্নয়নের জয়গান থাকা সত্ত্বেও আমরা কি পারি ভালো থাকতে? আসলে ভালো থাকার জন্য কী দরকার আমাদের? আমরা কি প্রকৃত ভাল থাকার চিন্তা করি আদৌ? ইতিহাসের পাতায় স্থানকৃত পরিবেশ বিপর্যয় ও মহামারী থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদেরকে নতুন করে এই পৃথিবী সাজাতে হবে। মহাকাশ-অভিযান, বিলাসিতা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যেখানে পৃথিবীর অনেক মানুষ খেতে পায় না, নেই পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সেবা ও শিক্ষাব্যবস্থা সেখানে কী করে আমরা ভিন্ন পথে এত অর্থ খরচ করি? বরং সারা পৃথিবীর প্রাকৃতিক ও মানবীয় পরিবেশ সুস্থ রেখে সম্ভব হলে পরবর্তী পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা, না হলে না করা এমনটিই হওয়া দরকার। আগে দরকার এই পৃথিবী এবং তার অধিবাসীর ভালো থাকা। এই পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষকে অভুক্ত রেখে, অস্বাস্থ্যকর রেখে ভিন্ন কিছু করার চিন্তা আমাদের বোকামি ছাড়া আর কিছুই না এবং যা মানব জাতির চূড়ান্ত ধ্বংসের জন্যেও যথেষ্ট ভূমিকা পালন করবে ।

আমরা নিজেদের তথা মানব জাতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার কথা কখনোই ভাবিনি এবং ভাবি না। যদি ভাবতাম তাহলে যেসব করলে মানব সমাজ ভালো থাকবে সেগুলো করতাম। কিন্তু তা না করে আমরা মানব জাতিকে বিপন্ন বা বিপদাপন্ন করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ‘পরিবেশ শৃংখল’ বিবেচনা করলে বোঝা যায়, বিভিন্ন রাসায়নিক বা অন্যান্য অস্ত্রের ব্যবহার, ক্ষতিকর উপাদান প্রয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন, বিভিন্ন ধরনের দূষণ এসবই কোনো না কোনোভাবে মানুষ জাতির অস্তিত্বকে হুমকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে ।

প্রকৃতপক্ষে যা নিয়ে ভাবা বা কাজ করা উচিত, সেগুলো উপেক্ষা করে আমরা ছুটে চলেছি সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে। গোড়া মজবুতহীন গাছের ডালপালা যত বেশি হবে তার ধ্বংস ততই দ্রুত হবে। আমাদের তাই হয়েছে। সংবেদনশীল প্রাকৃতিক পরিবেশকে শ্রদ্ধা করে কোথায় নিজেদের সমন্বিত ভালো থাকার কথা চিন্তা করব উল্টো আমরাই আমাদের ক্ষতি করছি। আর প্রকৃতিও খুব সহজেই আমাদের ঘায়েল করছে একের পর এক।

কভিড-১৯ খুব স্পষ্ট করেই বুঝিয়ে দিচ্ছে প্রকৃতির শক্তিমত্তার কথা। বন ধ্বংস, অপরিকল্পিত নগরায়ন,সম্পদ অপচয়, বর্জ্য, জীবাণু অস্ত্র, কার্বন ডাই অক্সাইড ইত্যাদি বৃদ্ধির মাধ্যমে আমরা আমাদের পাগলামি, বোকামি যত বাড়াবো আর তা যত অত্যাধুনিক কৌশল অবলম্বন করেই হোক না কেন পরিণামে খারাপ বৈ ভালো হবে না।

বিভিন্ন সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্যোগগুলো (৪৩০ খ্রিষ্টপূর্ব: এপিডেমিক অব এথেন্স, ৫৪১ খ্রিষ্টাব্দ: দ্য প্লেগ অব জাস্টিনিয়ান, ১৩৩৪ সাল: দ্য গ্রেট প্লেগ অব লন্ডন, ১৩৪৬ সাল: দ্য ব্ল্যাক ডেথ, ১৫১৯ সাল: স্মলপক্স এপিডেমিক অব মেক্সিকো, ১৬৩৩ সাল: স্মলপক্স এপিডেমিক অব আমেরিকা, ১৭৯৩ সাল: ইয়েলো ফিভার এপিডেমিক অব আমেরিকা, ১৮৬০ সাল: দ্য থার্ড প্লেগ প্যানডেমিক, ১৯১০ সাল: দ্য প্লেগ এপিডেমিক অব ফার্স্ট ডিকেড, ১৯১৬ সাল: দ্য পোলিও এপিডেমিক অব আমেরিকা, ১৯১৮ সাল: দ্য ইনফ্লুয়েঞ্জা প্যানডেমিক বা দ্য গ্রেট ফ্লু প্যানডেমিক, ১৯৭০ সাল: স্মলপক্স এপিডেমিক অব ইন্ডিয়া, ১৯৮৪ সাল: এইচআইভি ভাইরাস, ২০০৩ সাল: সার্স এপিডেমিক, ২০০৯ সাল: সোয়াইন ফ্লু এপিডেমিক, ২০১০ সাল: কলেরা এপিডেমিক অব হাইতি, ২০১২ সাল: হাম, ২০১৪ সাল: ইবোলা এপিডেমিক, ২০২০ সাল: কোভিড-১৯ প্যানডেমিক ইত্যাদি) এই শিক্ষাই দেয় যে, ব্যক্তিকভাবে অথবা একা ভালো থাকা কখনোই সম্ভব নয়।

মানব সমাজ যদি ভালো থাকে তবে সবার ভালো থাকা আপনা-আপনি নিশ্চিত হবে। দরিদ্র, অসুস্থ বলে অবহেলা করে ধনীরা, স্বাস্থ্যবানরা কখনোই ভালো থাকতে পারবে না। আর যদিও ভালো থাকা যায় তা হবে খুবই অল্প সময়ের জন্য এবং অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্য দিয়ে। কভিড-19 এটিই স্মরণ করিয়ে দেয় যে, একা নয় বরং গোটা মানবজাতির সমন্বিতভাবে ভালো থাকতে হবে, উন্নত হতে হবে আর উন্নত বলতে যথাযথ মানবিক আচরণ, খাদ্যাভ্যাস, প্রাকৃতিক পরিবেশবান্ধব কর্মকাণ্ড ইত্যাদি বোঝাবে।

পরিশেষে বলতে চাই মানব সমাজ যদি ধ্বংসযজ্ঞে মেতে উঠে হোক তা মানবিক পরিবেশ বা প্রাকৃতিক পরিবেশ সংক্রান্ত, চূড়ান্ত ক্ষতির সম্মুখীন কিন্তু হবে প্রকৃতি আর প্রকৃতি তার সামান্য ক্ষতিও মেনে নেয় না বরং পূর্ণ জবাব দেয়, প্রকৃতি বড়ই প্রতিশোধপরায়ণ। তাছাড়া নানা রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন ভূমিকম্প,দাবানল,টর্নেডো, সুনামি, ইত্যাদি মোকাবেলা করা এখনো আমাদের জন্য অনেক কষ্টকর অধিকাংশ ক্ষেত্রে দুঃসাধ্য।

এতে মানবসৃষ্ট দুর্যোগ যোগ হলে অবস্থা কী হয় বা হতে পারে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।সুস্থ্য মানব সমাজ গঠন উপেক্ষা করে যত উন্নয়ন করি না কেনো তা আসলে কাজে দিবে না। কাজেই পৃথিবীর সার্বিক পরিবেশ ঠিক রাখার জন্য সবার দ্রুত সাড়া প্রদান করতে হবে। যুদ্ধ, দূষণ, অপরিণামদর্শি রাজনীতি বিষয়গুলো নিয়ে নতুন করে ভাববার সময় হয়েছে। এতে যত বিলম্ব করব, বিপর্যয় তত দ্রুতই আমাদের গ্রাস করে ফেলবে।

সময় নষ্ট না করে সমন্বিতভাবে সুস্থ থাকার যাবতীয় প্ল্যান তৈরি করতে হবে এখনই। বোকামি ও পাগলামি করার কোন সুযোগ আর নেই। মানুষে মানুষে হানাহানি করে সময় নষ্ট না করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে এখনই। কারণ তাৎক্ষণিকভাবে কোনো দুর্যোগ মোকাবেলা করা খুবই দুরূহ বিষয়। অপরিহার্যভাবে সময় এসেছে প্রয়োজন এবং অপ্রয়োজন বিষয়গুলি নিয়ে চিন্তা করার, গোটা বিশ্বের মানবসভ্যতার সার্বিক কল্যাণের জন্য কাজ করার।

অন্যথায় পৃথিবীতে মানুষ থাকবে কিন্তু সেই মানুষ হবে অক্ষম, মেধাহীন, রোগগ্রস্ত যা মানব সমাজকে চূড়ান্ত ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিবে। আর নয় যুদ্ধ, সাম্প্রদায়িক সংঘাত, অযথা সম্পদ ব্যয় ও অপরিকল্পিত প্রকৃতি শাসন। এবার পৃথিবীকে বাসযোগ্য করতে হবে। আমাদের এই পৃথিবীকে সাজাতে হবে নতুন করে আমাদেরই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যে, মানবজাতির জন্যে প্রকৃতি কে সাথে নিয়ে ।

লেখক-
প্রভাষক (ভূগোল), রংপুর ক্যাডেট কলেজ।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.