এইমাত্র পাওয়া

প্রাথমিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়

প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের পাহাড় জমে উঠেছে। ঘুষের টাকাসহ দুদকের হাতে ধরা পড়াসহ যৌন হয়রানির মতো অভিযোগে নিয়মিত তদন্ত হয়।

প্রতিমন্ত্রী, সচিব ও প্রাথমিক অধিদপ্তর থেকে ৫০টির বেশি অভিযোগ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কর্মকর্তারা শিক্ষকদের পেনশনের কাগজপত্র প্রস্তুত, নিয়োগ, বদলি, ডেপুটেশন, নারী শিক্ষকদের মাতৃত্বকালীন ছুটি, অর্জিত ছুটি মঞ্জুর করতে শিক্ষা অফিসারকে ঘুষ দিতে হয়। শুধু তাই নয়, শিক্ষার্থীদের কোচিং করাতে বাধ্য করা, নারী কেলেঙ্কারি, কেনাকাটায় দুর্নীতি, স্কুল পরিদর্শনের নামে উৎকোচ নেয়া, প্রশ্নফাঁস, পরীক্ষা খাতা মূল্যায়নে অনিয়ম, এনজিওদের অনৈতিক সুযোগ দেওয়াসহ ২৬ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রাথমিক মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া তথ্য ও যায়যায়দিনে নিজস্ব অনুসন্ধানে এমন তথ্য জানা গেছে।

অভিযোগে আরও আছে, টাকার বিনিময়ে নিয়োগ দেয়া, শিক্ষকদের অহেতুক হয়রানি, ডেপুটেশন বহাল রেখে আর্থিক সুযোগ-সুবিধা নেওয়া, টার্গেট করে নারী শিক্ষকদের যৌন হয়রানি, সিন্ডিকেট তৈরি করে উন্নয়ন কাজ করানো, প্রশ্নফাঁস, স্কুল পরিদর্শনের সময় বিভিন্ন উপঢৌকন নেয়া, পরীক্ষা হলে শিক্ষার্থীদের উত্তর বলে দেয়া, পরীক্ষার ফি ও প্রশ্নপত্র ছাপানোর নামে অতিরিক্ত টাকা আদায়, শিক্ষার্থীদের কোচিং করাতে বাধ্য করা, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে এমএমসিতে ভুয়া অভিযোগ, উন্নয়নের টাকা ভাগ-বাঁটোয়ারা করা হয়।

এ ব্যাপারে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আকরাম-আল-হোসেন বলেন, সারাদেশে প্রায় আড়াই লক্ষাধিক শিক্ষক-কর্মকর্তা রয়েছেন। বিশাল এসংখ্যক কর্মকর্তা-শিক্ষকদের প্রতিদিন নানা ধরনের ঘটনা ঘটে। তার মধ্যে যেসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর নিয়মিত ব্যবস্থা নিচ্ছে। এক কথায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয় জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, বেশিরভাগ অভিযোগকারী ঠিকানা দেন না। তারপরও অভিযোগের কন্টেন্ট থাকলেই সেটি তদন্ত পাঠানো হয়।

মন্ত্রী নিজ জেলা কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধে করা অভিযোগে বলা হয়েছে, অবৈধভাবে দপ্তরি-কাম-প্রহরী নিয়োগ করেছেন। গত বছরের ২১ আগস্ট এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে মন্ত্রণালয় আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তা উপেক্ষা করে ৪১টি স্কুলে দপ্তরি নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দিয়ে মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে ৯টি স্কুলে দপ্তরি নিয়োগ দেন। অবৈধভাবে নিয়োগকৃতদের বেতনভাতা দিতে গত ২ ডিসেম্বর অর্থ বরাদ্দের চাহিদা দিয়েছেন। চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার সহকারী শিক্ষা অফিসার বেলায়েত হোসেনের বিরুদ্ধে প্রধান শিক্ষকের চলতি দায়িত্ব প্রদানে প্রত্যেক শিক্ষকের কাছ থেকে ৩০-৪০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছেন। টাকা ছাড়া তিনি শিক্ষকদের বদলি করেন না। প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণির শিক্ষা সামগ্রী নিজেই সরববরাহ করেন। উপজেলার দুটি স্কুলে তিন লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে কোনো কাজ না করেই লুটপাট করেছেন। প্রতি বছর শিক্ষকদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নোট গাইড কিনতে বাধ্য করে সাত-আট লাখ টাকা কমিশন নেন। স্স্নিট গ্রান্ডসের বরাদ্দকৃত টাকা থেকে প্রত্যেক স্কুলে থেকে পাঁচ থেকে ১০ হাজার টাকা কমিশন নেন।

কক্সবাজার সদর উপজেলার সহকারী শিক্ষকর্মকর্তা আবু শামীমের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি স্কুল পরিদর্শনে গিয়ে প্রত্যেক স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে যাতায়াত বাবদ পাঁচশত টাকা করে নেন। পরিদর্শনে গিয়ে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ না পেলেও তুচ্ছ অভিযোগ তুলে তার সাথে দেখা করতে বলেন। দেখা করলে ঘুষ দাবি করেন। না দিলেই হয়রানি করতে কারণ দর্শানো নোটিশ দেন। টাকা ছাড়া শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার ও উত্তরপত্র মূল্যায়নের দায়িত্ব দেন না।

গত নভেম্বর মাসে সুনামগঞ্জের তৎকালীন ডিপিইও জিলস্নুর রহমানের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ে দায়ের করা অভিযোগে বলা হয়েছে, ডিপিইও শিক্ষা অফিসে সদর উপজেলা কর্মকর্তা ও সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা এবং কতিপয় শিক্ষক নেতার মাধ্যমে ডেপুটেশন-বদলি বাণিজ্যের আখড়ায় পরিণত করেন। মহিলা শিক্ষিকাদের টার্গেট করে এমএমসির (স্কুল ম্যানেজিং কমিটি) মাধ্যমে ভুয়া অভিযোগ দায়ের করেন পরে নিজেরাই তদন্ত করে আর্থিক ও দৈহিক সুবিধা আদায় করতে বাধ্য করতেন। প্রতিবাদ করলেই নানাভাবে হয়রানি করা হয়। তার ফাঁদে পা দিয়ে স্কুলে না গিয়েও নিয়মিত বেতন তুলতেন অনেকেই। ডিপিইও দুই বছরে বদলি ও নিয়োগ বাণিজ্য করে ৬০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। জেলার ১২৯টি স্কুলের পরীক্ষার ফি ও প্রশ্নপত্র ছাপানোর নামে কয়েক লাখ টাকা আদায় করে আত্মসাৎ করেন। এসব অভিযোগে সম্প্রতি সুনামগঞ্জের ডিপিইও জিলস্নুর রহমানকে অন্যত্র বদলি করা হলেও কোনো তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অন্যরা বহাল তবিয়তে আছেন।

যশোর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ওহিদুল আলম ও নড়াইলের ডিপিইও শাহ আলমের বিরুদ্ধে এক শিক্ষিকার সঙ্গে যৌন কেলেঙ্কারীর অভিযোগ করা হয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। অভিযোগে বলা হয়েছে, এ দুই কর্মকর্তা গত ২৯ নভেম্বর (শুক্রবার) যশোর শিক্ষা অফিসে নড়াইলের একজন সহকারী শিক্ষিকার সঙ্গে যৌন কর্মকান্ড করেন। পুরো ঘটনাটি শিক্ষা অফিসের সিসি ক্যামেরায় ধারণ করা আছে। এছাড়াও ওহিদুল আলম পিটিআই স্কুলের এক শিক্ষিকাকে নিজ অফিসের গেস্ট রুমে প্রায়ই নিয়ে আসেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগের ব্যাপারে নড়াইলের ডিপিইও শাহ আলম ঘটনার দিন যশোর শিক্ষা অফিসের গেস্টরুমে থাকার বিষয়টি স্বীকার করে যায়যায়দিনকে বলেন, `লিখে দেন কোনো সমস্যা নেই। ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে আমাদের ডিপার্টমেন্ট আছে। সচিব স্যারের সাথে দেখা করে খুলনায় চলে আসছি। স্যার (সচিব) সব জানেন।` অভিযোগের কপি পেয়েছেন যশোরের ডিপিইও মো. ওহিদুল আলম। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, এটা ষড়যন্ত্র। কিছু দুষ্ট লোকজন মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করেছে। ছুটির দিনে অফিস করার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, কাজের প্রয়োজনে ছুটির দিনেও অফিসে থাকি।

নওগাঁর ডিপিইও আমিনুল ইসলাম মন্ডলের বিরুদ্ধে গত বছরের ২১ জুন অনুষ্ঠিত প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের একাধিক অভিযোগ মন্ত্রণালয়ে জমা পড়েছে। তিনি ৩৪-৩৫টি কেন্দ্রে একই প্রশ্নে বিভিন্ন সময়ে পরীক্ষা নিয়েছেন। তিনি মন্ত্রণালয় শিক্ষকদের ডেপুটেশন বাতিল করলেও তিনি মোটা অংঙ্কের টাকা নিয়ে বহাল রাখেন। এমনকি জেলার আত্রাই উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার ডেপুটেশন বাতিলের পত্র গ্রহণ না করে শিক্ষকদের টাকার বিনিময়ে বহাল রেখেছেন। আত্রাই উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান মমতাজ বেগম লিখিত অভিযোগে নওগাঁ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার নারী কেলেঙ্কারীর একটি ভিডিও ক্লিপস অভিযোগের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছেন। অভিযোগ তিনি বলেন, আত্রাই উপজেলার একটি স্কুলের সহকারী শিক্ষক রোখসানা আফরোজ ১০ বছর ধরে ঢাকায় অবস্থান করেন। তিনি নিয়মিত স্কুলে যান না। অন্যকে দিয়ে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে নিয়মিত বেতন তুলছেন। সম্প্রতি সহকারী শিক্ষক নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষায় সহকারী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা জাভেদ আলী ও সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ওয়াহেদউলস্নার মাধ্যমে প্রত্যেক প্রার্থীর কাছ থেকে তিন থেকে চার লাখ টাকা করে ঘুষ নিয়েছে।

প্রাথমিক মন্ত্রণালয়ের অধীন উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা বু্যরোর সহকারী পরিচালক (অর্থ ও লজিস্টিকস) মোহাম্মদ খালেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, পিইডিইপি-৪ এর কাজ দেওয়ার কথা বলে এনজিওদের কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা করে নিয়েছেন। বদলি, নিয়োগ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিয়ে মালামাল সরবরাহের আগেই বিল জমা দিয়েছেন। বিনিময়ে ওই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ২৩ লাখ টাকা নিয়েছেন।

গাইবান্ধার সদর উপজেলার ইন্সট্রাক্টর মো. মাহাবুব রহমান স্কুল পরিদর্শনে গিয়ে শিক্ষকদের বিভিন্নভাবে হয়রানি ও অপদস্ত করেন। সরকারি বরাদ্দের অপচয়, প্রশিক্ষণে অনুপস্থিত থেকেও সম্মানি নেওয়া, প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া ৫০০ টাকা দিয়ে ব্যাগ কেনার বরাদ্দ থাকলেও অর্ধেক দাম দিয়ে ক্রয় করেন। শিক্ষকদের সম্মানি ভাতা থেকে জোর করে কেটে রাখেন। প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মালামাল ক্রয় না করে নিজেই সরবরাহ করেন।

নারায়ণগঞ্জের ডিপিইও অহীন্দ্র কুমার মন্ডলের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করে বলা হয়েছে, নারায়ণগঞ্জ সদর থানার ৬০ নং গোয়ালবন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ তিনজন সহকারী শিক্ষক স্কুল চলাকালীন কোচিং বাণিজ্য করছেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা তদন্ত করে প্রমাণ পেয়ে ব্যবস্থা নিতে ডিপিইওর কাছে সুপারিশ করেন। কিন্তু তিনি ব্যবস্থা না নিয়ে প্রত্যেক শিক্ষকের কাছ থেকে ১ লাখ টাকা করে নিয়েছেন। ঝিনাইদহ সদর উপজেলার শিক্ষা অফিসের অফিস সহকারী আব্দুল রউফের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ করছেন শিক্ষকরা। দুর্নীতির অভিযোগে ২০১৬ সালে অন্যত্র বদলি করা হলেও ফের এখানে চলে এসেছেন। ২০১৭ সালে শিক্ষকদের পিটিআই প্রশিক্ষণের সুযোগ করে দেওয়ার কথা বলে ৫০ জন শিক্ষকের কাছ থেকে ১০ হাজার করে পাঁচ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। পিটিআইতে প্রশিক্ষণরত ৪৬ জন শিক্ষকের কাছ থেকে বিভিন্ন সুবিধা দিতে সাড়ে সাত লাখ টাকা নিয়েছেন। নতুন জাতীয়করণ শিক্ষকদের কাছ থেকে শ্রান্তি বিনোদন ভাতা দেওয়ার কথা বলে ৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। দ্বিতীয় ধাপে সরকারি করা শিক্ষকদের বকেয়া বেতন আদায় করে দেওয়ার কথা বলে ১৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছেন। এভাবে নানাভাবে শিক্ষকদের কাছ থেকে অর্ধ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী থানার ভোরান্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পপি ব্যানার্জি ২০১৮ সালের ১৩ নভেম্বর ওই স্কুলে যোগদান করলেও সভাপতিকে ম্যানেজ করে ওই বছরে ১ নভেম্বর থেকে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেন। নিয়মিত স্কুলে হাজির না হওয়ার প্রতিবাদ করলে এসএমসির সহ-সভাপতি মোসলেহউদ্দিন বরুন শিকদারকে স্কুল থেকে বের করে দেন। তার বিরুদ্ধে থানায় জিডি করে হয়রানি করেন। ঠিকমত পাঠদান না করে অফিস কক্ষে অসৎ লোকদের নিয়ে আড্ডা দেন। এই শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ভর্তির জন্য অবৈধভাবে ৫০০ টাকা করে নেন। এছাড়া পরীক্ষা ফি ১৫০ টাকা, টেস্টিমোনিয়াল ও সার্টিফিকেট বাবদ প্রতি বছর ৫০০ টাকা করে আদায় করেন।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.