এইমাত্র পাওয়া

বিবিসি বাংলার জরিপে ১১ নম্বরে তিতুমীর

অনলাইন ডেস্ক :

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি নিয়ে জরিপ করছে বিবিসি বাংলা। ২০০৪ সালে হওয়া ওই জরিপে শ্রোতাদের মনোনীত শীর্ষ বিশ বাঙালির তালিকায় ১১তম স্থানে উঠে রয়েছেন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব মীর নিসার আলী তিতুমীর। তিনি বাঁশের কেল্লা বানিয়ে ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলেন। যদিও সেই আন্দোলন করতে গিয়ে তিনি শহীদ হন। বিপ্লবী ও বিদ্রোহী মীর নাসির আলী বেশি পরিচিত শহীদ তিতুমীর হিসাবে। তিনি শুধু ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধেই লড়াই করেননি, তিনি বাংলার জমিদারদের বিরুদ্ধে কৃষকদের সংগঠিত করেছিলেন, প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন তার বাঁশের কেল্লা থেকে। ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে মীর নিসার আলী তিতুমীরের নাম উজ্জল হয়ে আছে। তিনি সর্বপ্রথম ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে লড়াই করে মৃত্যুবরণ করেছিলেন।

মীর নিসার আলী তিতুমীরের জন্ম ১৭৮২ সালে পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগণা জেলার বারাসত মহকুমার চাঁদপুর গ্রামে। বাবা সৈয়দ মীর হাসান আলী এবং মা আবিদা রোকেয়া খাতুন। গ্রামের স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষাগ্রহণের পর তিনি স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেন। কোরান ও হাদিস বিষয়ে অল্প বয়সেই তিনি পাণ্ডিত্য লাভ করেন। পবিত্র হজ্জ পালন করতে গিয়ে মক্কায় অবস্থানকালে তিতুমীর মুক্তি সংগ্রামের পথপ্রদর্শক সৈয়দ আহমদ শহীদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। ১৮২৭ সালে দেশে ফিরে গিয়ে তিনি সমাজ সংস্কারে আত্মনিয়োগ করেন। এ সম্পর্কে বাংলাদেশে ইতিহাসের অধ্যাপক আব্দুল মোমেন চৌধুরী জানান, তিতুমীর জীবন শুরু করেছিলেন একজন সমাজ ও ধর্মীয় সংস্কারক হিসাবে। তখন মুসলমান সমাজে যেসব বিদআত (এমন রীতি যা ইসলামসম্মত নয়) এবং শিরক্ (আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে উপাস্য হিসেবে সাব্যস্ত করা বা তার উপাসনা করা) ঢুকে গিয়েছিল, সেগুলোকে দূর করার উদ্দেশ্য নিয়েই তিনি তার কাজ শুরু করেছিলেন।

কিন্তু এই ধর্মীয় এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট পরে একটা অর্থনৈতিক এবং ব্রিটিশ বিরোধী প্রেক্ষাপটে পরিণত হয়েছিল। তিতুমীর হিন্দু ও মুসলমান কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করেন এবং জমিদার ও ব্রিটিশ নীলকরদের বিরুদ্ধে তাদের হাতে অস্ত্র তুলে নিতে উৎসাহিত করেন। ২৪ পরগণা ও নদীয়ার অনেক কৃষক তার ডাকে সাড়া দিয়ে তার আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন জানান, কৃষকদের নিয়ে তিতুমীরের আন্দোলন অল্প কিছুদিনের মধ্যেই গণ আন্দোলনে রূপ নেয়। ‘তিতুমীরের আন্দোলন, সংগ্রাম, কর্মকাণ্ড এবং জীবনাদর্শ সব কিছুকেই আমাদের মূল্যায়ন করতে হবে ঔপনিবেশিক পটভূমিতে।’ ‘এই বাংলায় ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি ১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধে জয়ী হবার সুবাদে প্রথম রাজনৈতিক ক্ষমতা গ্রহণ করে এবং সেখান থেকেই ক্রমাগত সারা উপমহাদেশে তাদের রাজ্যসীমা সম্প্রসারিত হয়। আবার এই বাংলা থেকেই ইংরেজ রাজত্বের বিরুদ্ধে শুরু হয় প্রতিরোধ আন্দোলন,’ বলেন সৈয়দ আনোয়ার হোসেন।

তিনি বলেন একাধিক এবং অসংখ্য প্রতিরোধ আন্দোলন হয়েছে বাংলায় ইংরেজ রাজত্বের বিরুদ্ধে। ‘ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনগুলির পটভূমিতে একটি উজ্জ্বল অধ্যায় হচ্ছে তিতুমীরের সংগ্রাম,’ব্যাখ্যা করেন অধ্যাপক হোসেন। প্রজাদের ওপর অত্যাচারের প্রতিকার তিতুমীর করতে চেয়েছিলেন শান্তিপূর্ণভাবে ও সমঝোতার মাধ্যমে। কিন্তু ব্যর্থ হয়ে বারাসাতে ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। কোম্পানির বিরুদ্ধে এটাই ছিল তার প্রথম বিদ্রোহ। তিনি ২৪ পরগণার কিছু অংশ, নদীয়া ও ফরিদপুরের একাংশ নিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা করেন। এই বিদ্রোহ ‘বারাসাতের বিদ্রোহ’নামে পরিচিত। এই বিদ্রোহে তিরাশি হাজার কৃষক সেনা তিতুমীরের পক্ষে যোগ দিয়েছিলেন। ‘তার আন্দোলনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য, শেষ পর্যন্ত পরিণত হয়েছিল উপনিবেশ বিরোধিতায়। এবং এই উপনিবেশ বিরোধিতা করতে গিয়ে, ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে নিজের শক্তি পরীক্ষা করতে গিয়ে, তিনি কখনও ভাবেননি যে তিনি অত্যন্ত দরিদ্র, ক্ষুদ্র একটি শক্তির প্রতিনিধিত্ব করছেন এবং তার বিপরীতে আছে বিরাট, বিশাল, শক্তিধর ইংরেজ রাজশক্তি,’বলেন অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন। বারাসাত বিদ্রোহের পর তিতুমীর বুঝতে পারেন ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধ অনিবার্য। ‘তার আন্দোলনের একটি বড় প্রতীকী তাৎপর্য ছিল অন্যায়, এবং শাসকবর্গের অসঙ্গত শোষণের বিরুদ্ধে একটি ন্যায়সঙ্গত অবস্থান নিয়ে দাঁড়ানো এবং প্রতিবাদে জ্বলে ওঠা।

সৈয়দ আনোয়ার হোসেন মনে করেন তিতুমীরের আন্দোলনের দ্বিমাত্রিক একটা তাৎপর্য রয়েছে। ‘তিনি শুধু উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলন করেছেন একথা বললে তাঁর অবদানকে কিছুটা সীমিত করা হয়, খণ্ডিত করা হয়। সমাজে অন্যায়, অবিচার, শোষণের বিরুদ্ধে যে বিদ্রোহ, আন্দোলন ও সংগঠন- সেসব ব্যাপারে তাঁর যে অবদান ছিল, ঐটিই সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক বলে আমার মনে হয়,’ বলেছেন সৈয়দ আনোয়ার হোসেন। আঠারোশ একত্রিশ সালে কর্নেল স্টুয়ার্টের নেতৃত্বে পদাতিক বাহিনী, অশ্বারোহী ও বন্দুকধারী সৈন্যদের একটি বিশাল বাহিনী পাঠায় ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি তিতুমীরের সঙ্গে লড়াইয়ের লক্ষ্যে।

নারিকেলবাড়িয়ায় ১৮৩১এর উনিশে নভেম্বর ভীষণ যুদ্ধ বাঁধে। ব্রিটিশ সৈন্যরা চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলে তাদের বাঁশের কেল্লা। তিতুমীর তাঁর অনুসারীদের অভয় দিয়ে বলেন মৃত্যুকে ভয় পলে চলবে না। এই লড়াই আমাদের শেষ লড়াই নয়। আমাদের কাছ থেকে প্রেরণা পেয়েই এ দেশের মানুষ দেশ উদ্ধার করবে। এই লড়াইয়ের পথ ধরেই একদিন দেশ স্বাধীন হবে।

ইংরেজদের কামানের গোলাবর্ষণে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা। তিতুমীর ও তাঁর চল্লিশজন সঙ্গী যুদ্ধরত অবস্থায় সেই বাঁশের কেল্লাতেই প্রাণ হারান। তিতুমীরের এই আন্দোলন, দেশপ্রেম আর আত্মত্যাগ সব স্বাধীনতাকামীদের মনে প্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে। প্রসঙ্গত, বিবিসির ওই জরিপে তিতুমীরের আগে ১২ থেকে ২০ তম স্থানে রয়েছেন যথাক্রমে লালন ফকির (১২), সত্যজিৎ রায় (১৩), অমর্ত্য সেন (১৪), ভাষা শহীদ (১৫), ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (১৬), স্বামী বিবেকানন্দ (১৭), অতীশ দীপঙ্কর (১৮), জিয়াউর রহমান (১৯) ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী (২০) সূত্র: বিবিসি বাংলা


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.