শাহাব উদ্দীন মাহমুদ সালমী।।
বিনামূল্যে মাধ্যমিক পর্যন্ত বই বিতরণ, দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ছাত্রীদের অবৈতনিক শিক্ষা, শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতাবৃদ্ধির জন্য দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণ, শিক্ষা ক্ষেত্রে ডিজিটাইজেশন ইত্যাদি ক্ষেত্রে সরকারের আন্তরিকতা ও ঈর্ষনীয় সাফল্যে মাধ্যমিক শিক্ষক সমাজ আশান্বিত হয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত দু:খের ও পরিতাপের বিষয় হল শিক্ষানীতি জাতীয় সংসদে ২০১২ সালে অনুমোদিত হওয়ার ছয় বছর অতিক্রান্ত হলেও শিক্ষানীতি প্রস্তাবিত ‘স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর’ বাস্তবায়নে কোনো অগ্রগতি নেই। ফলে শিক্ষাব্যবস্থার মেরুদন্ড মাধ্যমিক স্তর- দুর্বলতার খোলস থেকে রেরুতে পারছেনা।
ব্যানবেইজের ২০১৭ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৫,৭৩২ টি বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৩৪৯ টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ২,৫৩৩ টি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ১,২৩৪ টি স্কুল এন্ড কলেজসহ সর্বমোট ১৯,৮৪৮ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
এই বিপুল সংখ্যক প্রতিষ্ঠানের পরিদর্শন, পরীবিক্ষণ ও মূল্যায়নের দায়িত্ব পালন করেন School & Inspection branch। এর সাথে রয়েছে উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ ২,৫৫৭টি, স্নাতক কলেজ ১,১২৬টি, স্নাতক(সম্মান) কলেজ ৫৬৮টি ও স্নাতকোত্তর কলেজ ১৬৮টি সহ মোট ৪,৪১৯ টি উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে সর্বমোট ২৪,২৬৭টি প্রতিষ্ঠান নিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত হয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। অথচ ইতোপূর্বে মাত্র ১,২৬৪ টি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা ‘কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর’ ও ৯,৬৫৬ টি মাদ্রাসার জন্য আলাদা ‘মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর’ গঠিত হলেও জাতীয় শিক্ষানীর প্রস্তাবনা অনুযায়ী “মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর” প্রতিষ্ঠা অজানা কারণে আটকে আছ।
পাহাড় সম সমস্যা নিয়ে সরকারি মাধ্যমিক চলছে। দীর্ঘ ২৮/৩০ বছর ধরে সরকারি মাধ্যমিকে চাকরি করে কোন প্রমোশন ছাড়াই অধিকাংশ শিক্ষক অবসরে যাচ্ছেন। অথচ উপ-পরিচালক, বিদ্যালয়য় পরিদর্শক, সহকারী বিদ্যালয় পরিদর্শক, সহকারী পরিচালক, জেলা শিক্ষা অফিসার, প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষকের শত শত পদ দীর্ঘদিন যাবত খালি পড়ে আছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বদান্যতায় ০৭/০২/২০১৮ খ্রি. সিনিয়র শিক্ষক (৯ম গ্রেড-নন ক্যাডার) পদ সৃষ্টি হয়। সিনিয়র শিক্ষক পদে প্রায় ৫০০০ এর অধিক শিক্ষক পদোন্নতি পেতেন। কিন্ত দীর্ঘ ২ বছর অতিক্রান্ত হলেও উক্ত পদগুলোতে পদোন্নতি আটকে আছে অজানা কারণে। তদোপরি ২০০৯ সালের পে-স্কেল অনুযায়ী শিক্ষকদের টাইমস্কেল/সিলেকশনগ্রেড ঝুলে আছে বছরের পর বছর। দীর্ঘ ১৫ বছর চাকরি করার পর একটি টাইমস্কেল/সিকেশগ্রেডও পাননি অনেক শিক্ষক। মাউশি’র পক্ষে এত চাপ সামলানো দুরহ হয়ে পড়ছে। মাধ্যমিকের জন্য যদি “স্বতন্ত্র মাধ্যমিক অধিদপ্তর” প্রতিষ্ঠা করা হয়, তাহলে কাজে গতিশীলতা আসত এবং সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলোর সুফল মাধ্যমিকের ছাত্র-শিক্ষকেরা পেত।
‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০’ অনুযায়ী মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পর্কিত কিছু সুপারিশ যা বাস্তবায়নে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারছেনা। জাতীয় শিক্ষানীতির মাধ্যমিক শিক্ষা বিষয়ক অংশ পর্যালোচনা করলে নিম্নোক্ত বিষয়াদি পরিলক্ষিত হয়। উক্ত বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়ন করা হলে মাধ্যমিক স্তরে গতির সঞ্চার হতো যা সরকারের রূপকল্প ২০৪১ সালের উন্নত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারত। জাতীয় শিক্ষানীতির উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো-
১। শিক্ষা প্রশাসনে বর্তমানে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরকে দুইটি পৃথক অধিদপ্তর যথাক্রমে ‘মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর’ ও ‘উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণা অধিদপ্তর’ গঠন করা হবে। (জাতীয় শিক্ষানীতি পৃষ্ঠা- ৬৪)
২। মাধ্যমিক স্তর হবে (৮ম-১২শ) এবং প্রয়োজনীয় যোগ্যতা সম্পন্ন বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ করা হবে।
(জাতীয় শিক্ষানীতি পৃষ্ঠা- ১৩)
৩। খেলাধুলার সরঞ্জাম ও সমৃদ্ধ গ্রন্থাগারের ব্যবস্থা করা হবে। গ্রন্থাগার সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য গ্রন্থাগারিক পদ সৃষ্টি করে নিয়োগ দেয়া হবে। (শিক্ষনীতি পৃষ্টা- ৬৬)
৪। শিক্ষক শিক্ষার্থীর অনুপাত পর্যায়ক্রমে ২০১৮ সালের মধ্যে ১:৩০ এ উন্নীত করা হবে। (শিক্ষনীতি পৃষ্টা- ৬৬)
৫। মেধাবীদের শিক্ষকতায় আগ্রহী এবং সঠিক দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষে সকল স্তরের শিক্ষকদের মর্যাদার বিষয় গভীরভাবে বিবেচনাপূর্বক পুনর্বিন্যাস করা হবে। (জাতীয় শিক্ষানীতি পৃষ্ঠা – ৫৮)
৬। সকল স্তরের শিক্ষকদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো প্রণয়ন করা হবে। (জাতীয় শিক্ষানীতি পৃষ্ঠা – ৫৮)
৭। মেধা দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নির্বাচিত শিক্ষকদের শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে পদায়ন করা হবে।
(জাতীয় শিক্ষানীতি পৃষ্ঠা – ৫৯)
৮। আধুনিক যুগোপযোগী ও বাস্তবমুখী শিক্ষা প্রশাসন গড়ার লক্ষে মাধ্যমিক ও কলেজ শিক্ষা প্রশাসনকে প্রয়োজনানুসারে সংস্কার করা হবে। (জাতীয় শিক্ষনীতি পৃষ্টা- ৬৬)
৯। মাধ্যমিক শিক্ষা প্রশাসনে ক্ষমতা, দায়িত্ব, ও কর্তৃত্বকে বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যন্ত বিকেন্দ্রীকরণ করা হবে। জেলা শিক্ষা অফিসারের পদটি জেলার অন্যান্য কর্মকর্তার সঙ্গে সুসামঞ্জস্য করা হবে। (জাতীয় শিক্ষনীতি পৃষ্টা- ৬৬)
১০। একাডেমিক তত্ত্বাবধান ও পরিবীক্ষণ জোরদার করার লক্ষে বিদ্যালয়ের সংখ্যানুপাতে বিদ্যালয় পরিদর্শকের পদ সৃষ্টি করতে হবে। (জাতীয় শিক্ষনীতি পৃষ্টা- ৬৬)
১১। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের সংখ্যানুপাতে সরকারি স্কুল, কলেজ, টি টি কলেজ, মাদ্রাসা শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ জেলা শিক্ষা অফিস, আঞ্চলিক অফিস ও অধিদপ্তরে প্রয়োজনানুসারে কর্মকর্তার সংখ্যা বৃদ্ধি করা হবে। (জাতীয় শিক্ষনীতি পৃষ্টা- ৬৬)
বিশাল আকারের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তদারকিসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চালাতে গিয়ে বর্তমানে ‘মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর’ হিমসিম খাচ্ছে, ক্ষেত্র বিশেষে ব্যর্থ হচ্ছে। নানাবিধ কাজের সামাল দিতে গিয়ে সরকারের কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন ব্যাহত হচ্ছে। তাই মাউশির কাজের গতি আনয়ন তথা সরকাররের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০’ এর প্রস্তাবনা অনুযায়ী মানসম্মত আধুনিক, যুগোপযোগী ও বাস্তবমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষে ‘স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর’ প্রতিষ্ঠা করা সময়ের দাবী। এটি যাদি বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে মাধ্যমিকের শিক্ষকদের কাছে এটিই হবে মুজিব বর্ষের শ্রেষ্ঠ উপহার। আশা এবং বিশ্বাস, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।
লেখক: কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক
বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি (বাসমাশিস)
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
