প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর ১৯ শতাংশ মানসিক রোগে আক্রান্ত

দেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৯ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত। আর শিশু-কিশোরদের মধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশ এ সমস্যায় ভুগছে। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত মানসিক রোগে আক্রান্ত রোগীর গ্রামে অবস্থান, পরিবারে বাবা-মায়ের শিক্ষার অভাব এবং মানসিক রোগের পারিবারিক ইতিহাসের সঙ্গে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার যথেষ্ট সম্পর্ক রয়েছে। এ ছাড়া জন্মগত বা জন্ম পরবর্তী অসুস্থতা কিংবা আঘাত, মা ও নবজাতকের অযত্ন এবং অপুষ্টি বাংলাদেশে শিশুদের বুদ্ধির অক্ষমতার হার বৃদ্ধির মূল কারণ বলে তারা চিহ্নিত করেছেন।
বাংলাদেশে মানসিক সমস্যার ব্যাপকতা বিবেচনায় এ সংখ্যক জনগোষ্ঠীর মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে সরকার একটি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য নীতি চ‚ড়ান্ত করতে যাচ্ছে। যার নাম দেয়া হয়েছে ‘জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য নীতি-২০১৯’। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে প্রস্তাবিত এ নীতির খসড়া। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে এ নীতি খসড়ার ওপর মতামত চেয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ। গত ৬ ফেব্রুয়ারি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) কাছে আগামী ১১ ফেব্রুয়ারি মধ্যে সুনির্দিষ্ট মতামত চেয়ে চিঠি দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
সরকারের সর্বশেষ মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ-২০১৯-২০ (অপ্রকাশিত) বলছে, দেশের প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ১৯ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত। তাদের মধ্যে ৯০ ভাগের বেশি কোনো ধরনের চিকিৎসা নেন না। এ ছাড়া শিশুদের মধ্যে ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ এ সমস্যায় ভুগছে। তাদেরও প্রায় ৯৫ শতাংশ কোনো ধরনের চিকিৎসা গ্রহণ করে না। তবে আশার কথা হচ্ছে, মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে যে ৮ শতাংশ চিকিৎসা গ্রহণ করেন, তাদের মধ্যে ৮০ শতাংশ বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা নিচ্ছেন।
৩৬ পৃষ্ঠার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য নীতি-২০১৯ খসড়ায় বলা হয়, দেশে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার প্রাদুর্ভাব প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ৩১ শতাংশ এবং শিশুদের মধ্যে ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে ২২ দশমিক ৯ শতাংশ ঘটছে। আরেকটি জরিপের তথ্য দিয়ে খসড়া নীতিতে বলা হয়, ১৮ বছর ও তদূর্ধ্ব জনসংখ্যার ৩ দশমিক ৩ শতাংশ মাদকাসক্তিতে ভুগছে। আরেকটি জরিপে দেখা গেছে, নানাবিধ দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অসুস্থতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ৪২ শতাংশ গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত। নীতিমালায় আরো বলা হয়, তরুণদের মতো বয়স্কদের মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। স্নায়ুবিধ ব্যাধি ৬ দশমিক ৬ শতাংশ ক্ষেত্রে ডিসএবিলিটি এডজাস্টেড লাইফ ইয়ার্স-এর কারণ হিসেবে বিবেচিত। ষাটোর্ধ্ব প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশ ব্যক্তি কোনো না কোনো মানসিক ব্যাধিতে ভোগেন।

আর্থ-সমাজিক বঞ্চনা, নিরক্ষরতা, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, পরিবারে কারো মৃত্যু, পারিবারিক অসঙ্গতি, বড় পরিবার (অধিক সংখ্যক সন্তান জন্মদান), যৌতুক, আর্থিক স্বাবলম্বিতার অভাব, এবং কর্মসংস্থানের ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও চ্যালেঞ্জ, নারীর প্রতি ঐতিহ্যগত পারিবারিক প্রত্যাশা নারীদের মানসিক রোগের সঙ্গে আঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

খসড়া নীতিমালায় বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক অবস্থার পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে। নীতিমালার এ অংশে বলা হয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ৭০ শতাংশ সদস্য রাষ্ট্রের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য একক নীতি বা পরিকল্পনা রয়েছে; ৫৭ শতাংশের একটি স্বতন্ত্র মানসিক স্বাস্থ্য আইন রয়েছে। তবে অনেক দেশে নীতিমালা ও আইনগুলো মানবাধিকার রক্ষণের সঙ্গে পুরোপুরিভাবে সম্পৃক্ত নয়, বাস্তবায়ন দূর্বল এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তি ও তার পরিবারের সদস্যদের অর্ন্তভুক্তি কেবলই আংশিক। এতে আরো বলা হয়, জনসাধারণের মানসিক স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় নিম্ন এবং মধ্যম আয়ের দেশে খুবই অল্প, মাথাপিছু ২ ডলারের কম। তহবিলের একটি বড় অংশ রোগীর ভর্তি খাতে বিশেষত মানসিক হাসপাতালগুলোতে যায়। বিশ্বব্যাপী গড়ে মানসিক স্বাস্থ্য কর্মীর সংখ্যা প্রতি ১ লাখে মাত্র ৯ জন, তবে এক্ষেত্রে চরম বৈসাদৃশ্য রয়েছে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে; এখানকার দেশগুলোতে প্রতি ১ লাখে মাত্র একজন থেকে উচ্চ আয়সম্পন্ন দেশে প্রতি ১ লাখে ৭২ এর বেশি।

মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, পাঠ্যপুস্তকে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করলে শিশুরা আগে থেকে এ সম্পর্কে ধারণা নিতে পারবে এবং মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব বুঝবে। একই সঙ্গে নিজেকে প্রস্তুত করারও সময় পাবে। ফলে দেশে মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা যেমন কমবে তেমনিভাবে রাষ্ট্রকে এর বোঝা কম নিতে হবে।

খসড়া নীতিতে আরো বলা হয়, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার তুলনায় মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সংখ্যা দেশে খুবই কম। ২০১৬ সালে প্রতি ১ লাখে জনসংখ্যার জন্য মানসিক স্বাস্থ্য কর্মীর সংখ্যা ছিল মাত্র ১ দশমিক ১৭ শতাংশ। আর বেশিরভাগ মানসিক স্বাস্থ্য পেশাদাররা বৃহত্তর শহরগুলোতে অবস্থিত টারশিয়ারি কেয়ার সেটআপে কাজ করেন। এতে আরো বলা হয়, দেশের ৫০টি মানসিক রোগ সেবাদানকারী বহির্বিভাগে কমিউনিটিতে ফলো-আপ সেবার পর্যাপ্ত সুযোগ নেই। মানসিক স্বাস্থ্যে ‘দিবাযত্ন’ চিকিৎসা-সুবিধা এখনো এদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য নীতি-২০১৯ খসড়ায় চ‚ড়ান্ত করে মানিসক স্বাস্থ্যের জন্য কার্যকর নেতৃত্ব ও সুশাসনকে শক্তিশালী করা, স্বাস্থ্যসেবার সকল স্তরে (প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও তৃতীয়) মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে এমন ব্যক্তিদের জন্য সমন্বিত সেবা সহজলভ্য করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবার পরিসর বৃদ্ধি করাসহ ১৫টি উদ্দেশ্য নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে কাজ করার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ স্বাস্থ্য নীতি-২০১১, জাতীয় গ্রামীণ উন্নয়ন নীতি-২০০১, বাংলাদেশ জাতীয় সুরক্ষা কৌশল-২০১৪, বাংলাদেশ: দারিদ্র নিরসন কৌশলপত্র,২০১১ এবং সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে টেকসই উন্নয়ন-২০১৫- এ বিষয়গুলো মানসিক স্বাস্থ্য নীতিতে অর্ন্তভুক্ত করা হয়েছে। তবে প্রস্তাবিত এ নীতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ব্যাপক মানসিক স্বাস্থ্য কর্ম-পরিকল্পনা ২০১৩-২০২০ এর অংশ; যা ৬৬তম বিশ্ব স্বাস্থ্য সমাবেশ দ্বারা গৃহীত হয়েছিল। নীতিমালার মূলনীতি হিসেবে বলা হয়েছে, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে কোনো বৈষম্য করা হবে না এবং তারা মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং আবাসনের সমান সুযোগ পাবেন। লিঙ্গ সমতা নিশ্চিত করা হবে। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা মোকাবেলায় জাতীয় স্বাস্থ্য বাজেটের ন্যায়সঙ্গত অংশ বরাদ্দ থাকবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. জাহিদ মালেক সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, দেশকে এগিয়ে নিতে মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু শারীরিকভাবে সুস্থ থাকলে একজন মানুষকে সুস্থ বলা যাবে না। শারীরিক ও মানসিক উভয়ভাবে সুস্থ মানুষকেই প্রকৃত অর্থে সুস্থ বলা যাবে। মানসিক স্বাস্থ্য আমাদের দেশে বহুকাল যাবৎ খুবই অবহেলিত ছিল। তবে এখন এই বিষয়ে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। এর পেছনে একজনের অবদানও আছে। প্রধানমন্ত্রী কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। তিনি বর্তমানে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করেন। আমরা একটি নীতি তৈরি করতে যাচ্ছি। যেসব প্রতিষ্ঠান মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করে সেগুলোর উন্নয়ন, সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা হবে। মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসকও বাড়ানো হবে।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.