সেলিনা হোসেন :
বইমেলা একটি জাতির মননচর্চার অসাধারণ দিক। মননশীল-সৃজনশীল চর্চা যে জাতি করবে না, তার সামনে দিগন্ত প্রসারিত হয় না। বিশ্ব জুড়ে সব দেশের মানুষই নিজের প্রগতিশীল ধারাকে যেমন জানতে চায়, তেমন অন্য দেশের সময়ের মানুষ কী লিখছে সেটা জানতেও আগ্রহী হয়। এভাবে পরস্পরের সম্পৃক্ততার জায়গা খোঁজা মানুষের সহজাত বিষয়। একে অন্যের অধিকার আদায়ের স্বপ্নকে সঞ্চারিত করে বিশ্ব জুড়ে। অধিকারের ন্যায়সংগত দাবিকে সমর্থন দিতে উদ্গ্রীব হয়ে ওঠে। পারস্পরিক সম্পর্ক মজবুত হয়। এক দেশের জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক চেতনাবোধের বিষয়টি উপলব্ধি করে বন্ধুত্বের হাত বাড়ায়।
বইমেলা-সাংস্কৃতিক মিলনমেলা এসব জায়গাকে ছুঁয়ে বেড়ে যায়। এটি মানবচিন্তার অসাধারণ দিক। বাংলাদেশের অমর একুশে গ্রন্থমেলা এদিক থেকে একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশ মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে এক দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী দেশমাত্র নয়। মাতৃভাষার জন্য জীবন দেওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপনের প্রথম উদাহরণ। পরের উদাহরণ তৈরি করেছে আসামের শিলচর এলাকার বাঙালিরা। ভাষার মর্যাদার অধিকার ক্ষুণ্ন হলে কোনো জাতিই তা মেনে নেওয়াকে অন্যায় মনে করে। এই অন্যায় প্রতিরোধ করতে জীবনদানেও পিছিয়ে যায় না কেউ। বাংলাদেশ ও আসামের শিলচর এলাকা এর উদারহরণ।
বাংলা একাডেমিতে ৩৪ বছর চাকরি করে অমর একুশে গ্রন্থমেলা আমি দেখেছি খুব কাছে থেকে (প্রতিদিন, প্রতিটি সময়ে)। এর চরিত্র শুধু বই প্রকাশ ও বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বইমেলা ভাষা আন্দোলনের শহিদের রক্তে প্রতিষ্ঠিত বাংলা একাডেমি কর্তৃক আয়োজিত এবং একুশে ফেব্রুয়ারির উপলক্ষ্য হলেও মাস জুড়ে বইমেলার আবেদন জাতীয় মননের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বাংলা একাডেমির মতো মাসব্যাপী বইমেলা কোথাও হয় না। আমরা খোঁজ করে দেখেছি, হয় না। বাংলাদেশের মানুষ ভাষার জন্য জীবনদানের সূচনা করে তার গতি বাড়িয়ে স্বাধীনতার জন্য উদ্বুদ্ধ হয়েছিল। এখন পর্যন্ত সবার কণ্ঠে উচ্চারিত হয় ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ।
ভাষার মর্যাদার দাবি থেকে স্বাধীনতা পর্যন্ত এগিয়ে আসা বাঙালির জীবনের একটি প্রমাণিত সত্য। সেজন্য আস্তে আস্তে বইমেলার মেয়াদ রেড়েছে। মানুষ সচেতন হয়েছে। নির্ধারণ করেছে যে বই তার দিগন্ত। এখন প্রবীণ-নবীন সবার মুখে শোনা যায় ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ। এই মেলাকে আস্তে আস্তে বড়ো হতে দেখেছি। আশির দশকে মেলার বড়ো পরিবর্তন হয়। ১৯৮৪ সালে বইমেলার আনুষ্ঠানিক নাম রাখা হয় ‘অমর একুশে বইমেলা’। তথ্যপ্রযুক্তির এই সময়েও বলতে চাই বইয়ের বিকল্প নেই। বড়ো করে শ্বাস নিলে একুশের চেতনায় প্লাবিত হয়ে থাকা মেলা প্রাঙ্গণ জাতির ঐতিহ্যের সমৃদ্ধ জায়গা। বিভিন্ন সময়ে ভারতের তিনটি প্রদেশের বইমেলায় আমন্ত্রিত হয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছি। ১৯৯৬ সালে প্রথম যাই দিল্লিতে। ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ দিন ধরে চলেছিল এই মেলা। এটি ছিল দিল্লির দ্বাদশ বিশ্ব বইমেলা।
মেলার থিম ছিল ‘সার্ক দেশসমূহ’। সার্ক দেশসমূহের সাত জন লেখক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। বইমেলার আয়োজন করেছিল ‘ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া’। মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল দিল্লির প্রগতি ময়দানে। পরে যে বইমেলা আমাকে টেনেছে, সেটি হলো ‘আগরতলা বইমেলা’।
২০০০ সালে অনুষ্ঠিত হয় অষ্টাদশ আগরতলা বইমেলা। ঐ বইমেলায় উপস্থিত থাকার জন্য আমি নিমন্ত্রণ পেয়েছিলাম। বইমেলা আয়োজিত হয়েছিল ‘রবীন্দ্র শতবার্ষিকী ভবন’ প্রাঙ্গণে। বইমেলার উদ্বোধক ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী কবি অনিল সরকার।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
