বইমেলা বনাম ‘সৌজন্য কপি’ কালচার

সঞ্জয় মুখার্জী :

‘বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না’- ছোটবেলায় সৈয়দ মুজতবা আলীর এই উক্তিটি পড়ার সময় কেবলই মনে হতো বই কিনে দেউলিয়া হওয়া তো এমনিতেই সম্ভব নয়। এটা আবার ঘটা করে বলার কি আছে! কিন্তু লেখালেখি করার সুবাদে এখন বুঝতে পারি আক্ষরিক অর্থে সম্ভব না হলেও বাঙালি পাঠকের মনোজগতের কোথায় যেন বই কিনে দেউলিয়া হয়ে যাবার এক অজানা আশঙ্কা সর্বদা বিরাজ করে। আর বইমেলা এলেই তা যেন আরও প্রকট হয়ে ওঠে। মেলায় গিয়ে খানাপিনা আর হৈ হুল্লোড় করে হাজার টাকা বিল উঠাতে গায়ে না বাঁধলেও, বই কেনার সময় শ’খানেক টাকাও যেন শূলের মতো বিঁধে। আর তাই বইমেলায় গিয়ে বই কিনে দেউলিয়া হবার ঝুঁকি থেকে বাঁচতে স্বয়ং লেখকের কাছেই ‘সৌজন্য কপি ’নামক এক ‘বিভ্রান্তিকর’ জিনিস আবদার করার এক অসৌজন্য কালচার আমাদের দেশে গড়ে উঠেছে।

‘সৌজন্য কপি’-কে কেন ‘বিভ্রান্তিকর’ বললাম সে কথাটি বলি। সৌজন্য শব্দটির অর্থ হল ভদ্রতা বা শিষ্টাচার। বইয়ের ক্ষেত্রে সৌজন্য কপি’র অর্থ হল, যে বইটি ভদ্রতা করে দেয়া হয় তা। কাউকে ভদ্রতা করে কোনো বইয়ের কপি দেয়া হয় প্রধানত তিনটি ক্ষেত্রে। এক, প্রকাশক লেখককে ভদ্রতা করে কয়েক কপি বই দিয়ে থাকলে (এটাই প্রকৃত সৌজন্য)। দুই, কোনো লেখক তার নিজের প্রকাশিত বই প্রিয়জন বা শ্রদ্ধেয় কাউকে দিয়ে থাকলে (এটাকে উপহারও বলা যায়)।

তিন, স্কুল কলেজে কোন নতুন গাইড বইয়ের প্রচারণার জন্যে প্রকাশনী থেকে শিক্ষকদের ফ্রি-তে কয়েক কপি বই দেয়া হয় যাতে করে তারা শিক্ষার্থীদের সে বইটি কিনতে বলে দেন এবং শিক্ষার্থীরা সেটি কেনে (এটি মূলত প্রকাশনী সংস্থার বিজ্ঞাপনের এক ধরণের কৌশল)। আমাদের দেশে মানুষ ‘সৌজন্য কপি’ শব্দটি শেখে স্কুল কলেজে শিক্ষকদের কাছে সেই সব গাইড বইয়ের গায়ে সেটে দেয়া ‘সৌজন্য কপি’ সিল দেখে। শিক্ষকরা এই বইগুলো বিনামূল্যে পেয়ে যায় দেখে অবচেতনভাবেই শিক্ষার্থীদের মনে বিনামূল্যে বই লাভের বাসনা তৈরি হয়ে যায়। আর বড় হবার পর আশেপাশে কোনো পরিচিত লেখক পাওয়া গেলে মনের ভেতরকার সেই সুপ্ত বাসনা জাগ্রত হয়ে ওঠে আর প্রেক্ষাপট বিবেচনা না করে অবচেতনভাবেই লেখকের কাছে একখানা বই ‘সৌজন্য কপি’ হিসেবে পাওয়ার আবদার ভেতর থেকে চলে আসে।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, একটি বইয়ের ক্ষেত্রে উপরের তিন ক্যাটাগরির কোনোটিতেই যদি একজন ব্যক্তি সৌজন্যকপি প্রাপ্তির জন্য উপযুক্ত না হয়ে থাকেন উপরন্তু লেখকের কাছ থেকে নিজেই সৌজন্য কপি আবদার করে থাকেন তবে সেটি তার জ্ঞানের দৈন্যতা প্রকাশ করার পাশাপাশি লেখককে অসৌজন্য করাও হয়ে ওঠে। এবার আসি কেন লেখকের কাছে এভাবে বই চাওয়াকে অসৌজন্যতা বললাম সে প্রসঙ্গে। প্রথমত, সৌজন্য চেয়ে নেবার বিষয় নয়। কারো সাথে আপনার সৌজন্য পাওয়ার মতো সম্পর্ক হলে আপনি এমনিতেই তার কাছ থেকে সৌজন্য পাবেন। সেটি বস্তুগত বা অবস্তুগত যেমন সৌজন্যই হোক না কেন। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের অধিকাংশ লেখকেরই বই লেখা এবং প্রকাশ করা হয় মূলত ফেব্রুয়ারির অমর একুশে বইমেলাকে কেন্দ্র করে। বাঙালি কালচারে একুশের এই বইমেলা এখন একাধারে ঐতিহ্য ও উৎসব। তবে বই প্রকাশের সাথে যারা জড়িত অর্থাৎ লেখক এবং প্রকাশকদের কাছে বইমেলা মানে আরও একটু বেশি কিছু। তাদের কাছে এটি নবান্নের উৎসবের মতো।

সারা বছর ধরে লেখক ও প্রকাশকগণ এই সময়টির জন্যই অপেক্ষা করে থাকেন তাদের মননশীলতা এবং সৃজনশীলতাকে পাঠকের সামনে তুলে ধরতে। পাশাপাশি এটি অনেকের রুটি রুজির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। একটি বই তৈরিতে লেখকের যেমন বুদ্ধিবৃত্তিক বিনিয়োগ থাকে, তেমনি প্রকাশকের থাকে আর্থিক বিনিয়োগ। আমরা আমাদের পরিচিত কোনো দোকানির কাছে গিয়ে যেমন জামা, জুতা, গয়না, কসমেটিকস এসবের সৌজন্য কপি চাইতে পারি না, তেমনি বইও যে একটি পণ্য এবং এরও যে উৎপাদন ও বিপণন খরচ রয়েছে সেটিও আমাদের মাথায় রাখা উচিৎ। আমাদের দেশের পাঠকদের মধ্যে এই সচেতনতাটুকু আসা প্রয়োজন।

কারণ পাঠক মাত্রই শিক্ষিত সমাজের প্রতিনিধি। আসুন ফেব্রুয়ারির বইমেলার মাস থেকেই আমরা আমাদের সৌজন্য কপি আবদার করার অসৌজন্যমূলক কালচার থেকে বের হয়ে আসি। আমাদের পরিচিত কেউ বই লিখেছে জানলে সৌজন্য কপি আবদার না করে আমরা তার সাথে তার বই সম্পর্কে আলোচনা করি, তাকে আরো লিখতে উৎসাহিত করি এবং সম্ভব হলে তার বই কিনি।

এতে করে আমরা যেমন নিজেকে একজন সুবিবেচক পাঠক হিসেবে প্রমাণ করতে পারবো, তেমনি লেখকেরাও লেখালেখিতে আরও বেশি অনুপ্রাণিত হয়ে আমাদের ভাষাকে আরও সমৃদ্ধ করে তুলতে সচেষ্ট হবেন।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.