।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
এক গ্রামে এক সময় এক কৌতুকপ্রিয় জমিদার ছিলেন। তিনি একদিন ঘোষণা দিলেন—“যে গরু সবচেয়ে বেশি দুধ দেবে, তাকে পুরস্কার দেওয়া হবে।” গ্রামের সবাই উৎসাহিত। কিন্তু শর্ত শুনে সবাই হতবাক—গরুটিকে একইসঙ্গে দুই মাঠে চড়াতে হবে, দুই রকম খাবার খাওয়াতে হবে, আর একসঙ্গে দুই দিক থেকে দুধ দোহন করতে হবে!
এক কৃষক সাহস করে বললেন, “মালিক, এতে গরু তো বাঁচবে না!”
জমিদার হেসে বললেন, “আমি তো বলিনি গরু বাঁচাতে হবে, আমি চাই ফল!”
আজকের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার বাস্তবতা যেন সেই জমিদারের ঘোষণারই আধুনিক সংস্করণ। শিক্ষার্থীরা এখন একসঙ্গে দুই শ্রেণির পড়া সামলাতে বাধ্য—একদিকে ষষ্ঠ শ্রেণির নতুন পাঠ্যক্রম, অন্যদিকে পঞ্চম শ্রেণির ‘বাসি’ বৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি। প্রশ্ন হলো—এটা কি শিক্ষার উন্নয়ন, নাকি ফলের নামে শিশুদের ওপর চাপের নির্মম প্রয়োগ?
বর্তমান পরিস্থিতিতে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠা লাখো শিক্ষার্থী এমন এক দোটানায় পড়েছে, যেখানে তাদের একইসঙ্গে দুই ভিন্ন পাঠ্যধারার সঙ্গে তাল মিলাতে হচ্ছে। পঞ্চম শ্রেণির পাঠ্যক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতি যেমন আলাদা, তেমনি ষষ্ঠ শ্রেণির পাঠও সম্পূর্ণ নতুন কাঠামোর। ফলে শিক্ষার্থীদের জন্য এটি শুধু পড়ার চাপ নয়, বরং মানসিক বিভ্রান্তিরও কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের একটি মৌলিক ধারণা হলো—শিশুর শেখার প্রক্রিয়া ধারাবাহিক ও স্তরভিত্তিক হতে হবে। কিন্তু এখানে সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে গিয়ে তৈরি হয়েছে এক ধরনের “শিক্ষাগত দ্বৈততা”। একদিকে নতুন পাঠ বুঝতে হবে, অন্যদিকে পুরনো পাঠ মনে রাখতে হবে—এ যেন একই সঙ্গে সামনে হাঁটা আর পেছনে তাকিয়ে দৌড়ানোর মতো এক অদ্ভুত পরিস্থিতি।
ঢাকার এক অভিভাবক বলছিলেন, “আমার ছেলে রাতে ঘুমাতে যেতে ভয় পায়। বলে—মা, কাল আবার দুই ক্লাসের পড়া পড়তে হবে।” এই কথার মধ্যে যে আতঙ্ক, তা শুধু একটি পরিবারের নয়; এটি হাজারো পরিবারের বাস্তবতা।
একজন মধ্যবিত্ত বাবা বললেন, “আমরা তো চাই বাচ্চা ভালো করুক। কিন্তু এইভাবে চাপ দিয়ে কি ভালো করা সম্ভব? ওর হাসিটাই তো হারিয়ে যাচ্ছে।”
অন্যদিকে এক নিম্নবিত্ত অভিভাবক বললেন, “আমার মেয়ে স্কুল থেকে এসে আর পড়তে চায় না। বলে মাথা ধরে। আমি কী করব? পড়াশোনা না করলেও সমস্যা, আর করলে আরও সমস্যা।”
এই বক্তব্যগুলো থেকে স্পষ্ট—বৃত্তি পরীক্ষার এই কাঠামো শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, পুরো পরিবারকে মানসিক চাপে ফেলছে।
একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক জানালেন, “আমরা নিজেরাও দ্বিধায় আছি। একদিকে সিলেবাস শেষ করতে হবে, অন্যদিকে বৃত্তির প্রস্তুতি দিতে হবে। কোনটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সেটাই বুঝতে পারছি না।”
আরেকজন শিক্ষক বললেন, “সব ছাত্র তো সমান নয়। যারা একটু দুর্বল, তারা এই চাপে একেবারে ভেঙে পড়ছে।”
শিক্ষকদের এই অসহায়ত্ব প্রমাণ করে—নীতিনির্ধারণের স্তরে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
অনেক শিক্ষাবিদ এই পরিস্থিতিকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তাদের মতে, শিক্ষা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থীর সামগ্রিক বিকাশ, কেবলমাত্র পরীক্ষার ফল নয়।
একজন শিক্ষাবিদ বলেন, “একটি শিশু যদি শেখার আনন্দ হারিয়ে ফেলে, তাহলে সে যত ভালো নম্বরই পাক, সেটি প্রকৃত শিক্ষা নয়।”
আরেকজনের ভাষায়, “এটি আসলে ‘পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা’র চরম উদাহরণ, যেখানে শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্য পুরোপুরি উপেক্ষিত।”
নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে—এই পরীক্ষা ‘অপশনাল’। অর্থাৎ, কেউ চাইলে দিতে পারে, না চাইলে নয়। কিন্তু বাস্তবতা কি এত সহজ?
সমাজে প্রতিযোগিতার যে চাপ, তা শিশুদের ওপর অদৃশ্যভাবে কাজ করে। এক অভিভাবক বললেন, “আমার মেয়ে যদি পরীক্ষা না দেয়, আর তার সহপাঠীরা দেয়—তাহলে সে নিজেকে পিছিয়ে পড়া ভাববে।”
অর্থাৎ, ‘অপশনাল’ শব্দটি কাগজে-কলমে যতটা সহজ, বাস্তবে তা ততটাই জটিল। এটি এক ধরনের সামাজিক বাধ্যবাধকতায় পরিণত হয়, যেখানে না অংশ নেওয়াও এক ধরনের মানসিক চাপ তৈরি করে।
এই পরিস্থিতি আমাদের শিক্ষা নীতির একটি বড় দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে আসে—সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধারাবাহিকতার অভাব।
এক বছর পরীক্ষা বন্ধ, পরের বছর চালু, আবার আইনি জটিলতায় স্থগিত—এই ওঠানামা শিক্ষার্থীদের জন্য অনিশ্চয়তা তৈরি করে। শিক্ষা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া; এখানে হঠাৎ পরিবর্তন শিশুদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
প্রশ্ন হলো—আমরা কি শিক্ষাকে একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থা হিসেবে দেখছি, নাকি তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের পরীক্ষাগার হিসেবে ব্যবহার করছি?
বৃত্তি পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য ছিল মেধাবী শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দেওয়া। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এটি একটি প্রতিযোগিতামূলক চাপের উৎসে পরিণত হয়েছে।
একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বলছিলেন, “আমাদের সময়েও বৃত্তি ছিল, কিন্তু এত চাপ ছিল না। এখন মনে হয় ছোটদের ওপর অনেক বেশি প্রত্যাশা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।”
শিশুদের শৈশবের একটি বড় অংশ এখন পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যয় হচ্ছে। খেলাধুলা, সৃজনশীলতা, সামাজিক যোগাযোগ—সবকিছুই ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কিছু বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে—
© গত বছরের বৃত্তি পরীক্ষাটি বাতিল করে বার্ষিক পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে বৃত্তি দেওয়া।
© ভবিষ্যতে বৃত্তি পরীক্ষার একটি স্থিতিশীল ও পূর্বনির্ধারিত কাঠামো তৈরি করা।
© শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া
শিক্ষকদের মতামত নিয়ে নীতিনির্ধারণ করা।
শিক্ষা ব্যবস্থায় যেকোনো পরিবর্তন আনার আগে তার প্রভাব শিশুদের ওপর কী হবে, তা গভীরভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
একদিন সেই জমিদার আবার নতুন ঘোষণা দিলেন—“এবার যে গরু সবচেয়ে দ্রুত দৌড়াবে, তাকেই পুরস্কার!”
গ্রামের লোকেরা বলল, “কিন্তু গরু তো দৌড়ানোর জন্য নয়!”
জমিদার হেসে বললেন, “তাতে কী? আমি তো নিয়ম বানাই!”
কয়েকদিন পর দেখা গেল, গরুগুলো দৌড়াতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, দুধও কমে গেছে। তখন এক বৃদ্ধ কৃষক চুপচাপ বললেন, “গরুকে গরুর মতো থাকতে দিলে সে দুধ দেয়, আর তাকে ঘোড়া বানাতে গেলে সে কিছুই দিতে পারে না।”
আমাদের শিশুদের ক্ষেত্রেও কি আমরা একই ভুল করছি না? তাদের স্বাভাবিক শেখার প্রক্রিয়াকে জটিল করে, তাদের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ দিয়ে আমরা কি সত্যিই মেধা বিকাশ করছি, নাকি ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে দিচ্ছি?
শিক্ষা যদি আনন্দ হারায়, তাহলে তা কেবল একটি বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। আর বোঝা বইতে বইতে একসময় শিশুরা হাঁপিয়ে ওঠে—ঠিক সেই গরুর মতো, যে একসঙ্গে দুই মাঠে দৌড়াতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত দাঁড়াতেই পারে না।
লেখক: শিক্ষক ও গবেষক।
শিক্ষাবার্তা /এ/৩০/০৩/২০২৬
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
